ভাষার ব্যবহারঃ সৃজনশীলতা বনাম অশ্লীলতা
ভাষার ব্যবহারঃ সৃজনশীলতা বনাম অশ্লীলতা
কাজী ফারহান হায়দার
ভাষার ব্যবহার নিয়ে আলোচনার আগে আমাদের জানতে হবে ভাষা কি ?. – ভাষা হচ্ছে, মনের ভাব প্রকাশক বাক্যের সমষ্টিকে ভাষা বলে।
ব্যাকরণগত দিক থেকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় মানুষ তার মনের ভাব অন্যের কাছে প্রকাশ করার জন্য কন্ঠধ্বনি এবং হাত, পা, চোখ ইত্যাদি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে ইঙ্গিত ব্যবহার করে থাকে। তবে কন্ঠের সাহায্যে একজন সুস্থ মানুষ তার মনের ভাব সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে থাকে, যা ইশারা ঈঙ্গিতের মাধ্যমে সঠিক ভাবে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। কন্ঠধ্বনির সাহায্যে মানুষ তার মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে ; কন্ঠধ্বনি বলতে মুখ গহ্বর, কন্ঠ, নাসিকা ইত্যাদির সাহায্যে উচারিত বোধগম্য ধ্বনি বা ধ্বনির সমষ্টিকে বোঝায়। ধ্বনি হচ্ছে ভাষার মূল উপাদান, ধ্বনির মাধ্যেমেই ভাষার সৃষ্টি হয়, ধ্বনি সৃষ্টি হয় বাগযন্ত্রের দ্বারা। বাগযন্ত্রের দ্বারা উচ্চারিত অর্থবোধক ধ্বনিই মানুষের মনের ভাব প্রকাশ করে থাকে, যাকে আমরা ভাষা বলি।
দেশ, কাল, পরিবেশের উপর ভাষার পার্থক্য ও পরিবর্তন লক্ষ করা যায়, ফলে অঞ্চল ভেদে ভাষার ব্যবহার ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। বর্তমানে পৃথিবীতে সাড়ে তিন হাজার থকে পাঁচ হাজার প্রচলিত ভাষা রয়েছে, প্রত্যেক অঞ্চলে আবার নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষাও রয়েছে। মানুষ প্রথমে তার আঞ্চলিক ভাষা রপ্ত করে এবং আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে, জনপদ অনুসারে বাক্যের গঠন আলাদা হয় এবং ভাষাও আলাদা হয়। পৃথিবীর প্রধান ভাষার মধ্যে রয়েছে- চীনা, ইংরেজী, হিন্দি, বাংলা, আরবি, রুশ, জার্মানি, ফরাসি, কোরিয়ান, উর্দু, স্পানিশ ইত্যাদি ভাষা। জনসংখ্যার হিসেবে বাংলা পৃথিবীর ৬ষ্ঠ তম বৃহত্তম ভাষার স্থান দখল করেছে এবং এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা। ১৯৬৯ সালে “গুপী গাইন বাঘা বাইন” ছবির গানে বাংলাদেশের কথা উঠে এসেছে, “মোরা বাংলাদেশ থেকে এলাম’’ বিখ্যাত চলচিত্রকার সত্যজিৎ রায় তার ছবিতে এই গানটি পরিবেশন করেছেন।
বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের নাম অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িত, বাংলা ভাষা সমৃদ্ধির পিছনে কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। বাংলা ভাষা ভাষিদের জন্য পৃথক দেশের স্বপ্ন বোধ করি অনেকেই দেখেছে তা গানে ও কবিতাই ফুটে উঠেছে।
পৃথিবীর সব ভাষায় দুটি ধাঁরা বিদ্যমান, একটি কথ্য ভাষা ও অন্যটি লেখার ভাষা। বাংলা ভাষায় এক্ষেত্রে একাধিক রীতি প্রচলিত আছে। বর্তমানে আঞ্চলিক ভাষার পাশাপাশি সাধু ও চলিত ভাষা বহুল প্রচলিত। সাধু ভাষা শুধু মাত্র দাপ্তরিক কাজ, সাহিত্য রচনা, যোগাযোগ ও জ্ঞানচর্চার প্রয়োজনে প্রচলিত হলেও বর্তমানে চলিত ভাষার প্রচলন বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে।
পাশাপাশি অন্য ভাষার শব্দ ও বাংলা ভাষায় যুক্ত হয়ে বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে, যেমন আরবি থেকে ধর্মীয় শব্দ- তসবি, জাকাত, হারাম, হালাল ইত্যাদ। অনান্য শব্দ যেমন- আদালত, কলম, উজির, ইদ, এজলাস ইত্যাদি।
ফারসি থেকে- নামায, ফেরেশতা, বেহেশত, রোজা, দোকান, দৌলত, মেথর, আমদানি, রপ্তানি ইত্যাদি।
ইংরেজী থেকে- ইউনিভার্সিটি, ইউনিয়ন, কলেজ, পেনসিল ইত্যাদি। এছাড়া পর্তুগীজ, ফরাসি, গুজরাটি, পাঞ্জাবি, তুর্কি, চীনা, বার্মিজ, জাপানি বিভিন্ন দেশের বা জনগোষ্ঠীর শব্দ বাংলা ভাষায় যুক্ত হয়ে বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে যা বর্তমানে বাংলা ভাষার শব্দ ভান্ডারে যুক্ত হয়েছে।
বাঙালি জনগোষ্ঠীর ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা বিশ্ব দরবারে আজ স্বীকৃত। বাংলাদেশ ছাড়া ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ত্রিপুরা, আসাম, বিহার, ঝাড়খন্ড, উড়িষ্যা সহ অন্যান্য প্রদেশেও বাংলা ভাষাভাষী মানুষ রয়েছে। ধ্রুপদি ভাষা সংস্কৃত ও পালির সঙ্গে বাংলা ভাষার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। প্রত্যেক অঞ্চলের মানুষের কাছে তার আঞ্চলিক ভাষায় প্রথম মাতৃভাষা। এরপর কথ্য, লেখ্য ভাষা প্রধান মাতৃভাষা হিসেবে বিবেচিত। বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন চর্যাপদ। চর্যাপদ বাংলা ভাষায় রচিত গান ও দোহা গ্রন্থে সংকলিত চব্বিশ জন পদকর্তা কর্তৃক রচিত পদাবলী। প্রচীন বাংলায় রচিত পদগুলি যেমন সাহিত্য মূল্য রয়েছে তেমনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আদি নিদর্শন হিসেবে সমাদৃত। বাংলা ভাষায় ব্যবহারের উৎকর্ষতা বৃদ্ধিতে যুগে যুগে কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, কলাকুশলী, নাট্য ব্যক্তিত্ব, নাট্য নির্মাতা, ধর্মীয় শিক্ষাগুরুরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, তাদের হাত ধরে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সৃজনশীল ভাবে মানুষের কাছে উপস্থাপিত হয়েছে এবং বাংলা ভাষা এ অঞ্চলের মানুষের প্রাণের ভাষা হিসেবে গ্রোথিত হয়েছে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সৃজনশীল উৎকর্ষ সাধনে একজন প্রখ্যাত বাঙ্গালী লোক সাহিত্য গবেষক ডঃ দীনেশ চন্দ্র সেন কথ্যভাষা ও সাহিত্য রচনা করে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। এছাড়াও তিনি মৈয়মনসিংহ গীতিকা সংগ্রহের মাধ্যমে বাংলা লোকসাহিত্য কে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছেন।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আরেকজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব ডঃ মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ চর্যাপদকে আদি বাংলা ভাষা হিসেবে প্রমাণ করেন এবং গৌরী বা মাগধী প্রাকৃত থেকে বাংলা ভাষার উৎপত্তি হয়েছে বলে মত দেন। তিনি বাংলা ভাষার ইতিহাস এবং আঞ্চলিক ভাষার উপর বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান রচনা করেন। বাংলা ভাষা আন্দোলনে তার ভূমিকা অনস্বীকার্য। তিনি ১৯৪৭ সালে আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি এই বিখ্যাত উক্তির মাধ্যমে বাংলা কেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদের ভিত্তি স্থাপন করেন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অন্যতম প্রবাদ পুরুষ হল ডঃ আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ। তিনি মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মুসলমান কবিদের প্রায় দুইহাজার এর বেশি মূল্যবান পুথি সংগ্রহ করেন। আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদই প্রথম বলেন বাংলা বাঙালির জাতীয় ভাষা।
বাংলা ভাষার উৎকর্ষতা দীর্ঘ সময় ধরে স্বকীয় মহিমায় টিকেছিলো ভাষা আন্দোলনের পূর্বভাগ পর্যন্ত। ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষায় মাতৃভাষা বাংলাকে ঘিরে সংঘঠিত রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলা বাংলাদেশের মানুষের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলন চুড়ান্ত রূপ লাভ করে। ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত সহো আরো নাম না জানা অনেক শহীদের রক্তের বিনিময়ে বাংলা অর্জন করে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি। যা আজ আন্তর্জান্তিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে।
বাংলা ভাষার সৃজনশীল কাজের পাশাপাশি অশ্লীলতা শুরু হয় উনিশ শতকে। উনিশ শতকে লোকজ সংস্কৃতি গ্রামীন কথ্যভাষায় যাত্রাপালা গানের মাধ্যমে অশ্লীলতা শুরু হয়। বাংলা শব্দচয়নে অশ্লীল বিবরনীযুক্ত হতে থাকে। এই সময়ে বাংলা সাহিত্যে অশ্লীলতা নিবারন সমিতি গঠিত হয়। বিশ শতকের শুরুতে কল্লোলযুগের লেখকরা অশ্লীলতা সূচনা করেন সাহিত্যে। বুদ্ধদেব বসুর “রাতভোর বৃষ্টি” অশ্লীলতার অভিযোগে নিষিদ্ধ হয়েছিলো। এছাড়াও সমরেশ বসুর লেখা “প্রজাপতি” বাংলা সাহিত্যে অশ্লীলতার অভিযোগে আইনি মামলার মুখামুখি হয়েছিলো। বাংলাভাষা ও সাহিত্যে সৃজনশীলতার বিকাশও ঘটে প্রাচিনযুগের পরে । মধ্যযুগে শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন কাব্য, মনসামঙ্গল এ সময়ের সৃজনশীলতার ধারক হিসেবে বিবেচিত।
আধুনিক ধারায় বাংলা সাহিত্যে প্রথম কাব্য ও নাটক কৃষ্ণকুমারী রচনা কারেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। এছাড়াও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাংলা ছোট গল্প এবং কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা ও গদ্যের নতুন ধাঁরা রচনা করে সৃজনশীলতার উৎকর্ষ ঘটান। সৃজনশীল প্রয়াসের কারণে বাংলা সাহিত্য আধুনিক যুগে দেশপ্রেম , মানবতাবাদের এক নতুন উচ্চতায় উঠে।
বিশ শতকের শুরুতে কলকাতার শিক্ষিত সমাজ কথ্য ভাষাকে লেখা্র আদর্শ রীতি হিসেবে চলিত ভাষার রীতি চালু করেন যা বিশ শতকের মাঝামাঝি সাধু রীতির জায়গা দখল করে নেয়। ১৯৭১ সালে ১৬ই ডিসেম্বর মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর কলকাতা কেন্দ্রিক যে প্রমিত রীতির বাংলা ভাষা চর্চা হতো সেটি আস্তে আস্তে ঢাকা কেন্দ্রিক হতে শুরু করে এবং সাথে সাথে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশ লাভ করে। সৃজনশীল উৎকর্ষ সাধনের ফলে মানুষের মুখের ভাষা শব্দচয়নে আধুনিকতার ছোয়ার পাশাপাশি নতুন ভাষার সূচনা ঘটে যা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে, এরই ধারাবাহিকতা স্বাধীন বাংলাদেশে কবি সুফিয়া কামাল, আল- মাহমুদ , শামসুর রহমানের মতো কবিদের লেখা জনপ্রিয় হয়ে উঠে যা বাংলা ভাষার উৎকর্ষ সাধনে গুরত্বপূর্ন ভূমিকা রেখেছে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমা ও নাটকের মাধ্যমে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে নতুন জাগরণ রচিত হয়। ৮০ এর দশক পর্যন্ত বাংলাদেশে সৃজনশীল ধারায় কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, নাটক রচিত হয় যা পশ্চিমবঙ্গ কেন্দ্রিক সাহিত্য চর্চা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
৮০ এর দশকে বাংলা সাহিত্য চর্চা কবিতা, প্রবন্ধ , ছোট গল্পের পাশাপাশি অনুবাদ সাহিত্য ও শিশু সাহিত্য রচনা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়, সেই সাথে গল্প, ছোট গল্প কেন্দ্রিক নাট্য চর্চা শুরু হয় এবং আলোড়ন তোলে যা বাংলাদেশের গন্ডি পেরিয়ে বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে ভারত সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে । ৮০ দশক থেকে বাংলা সিনেমায় বাংলা উপন্যাস, গল্পের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছিল যা বাংলাদেশে বাংলা ভাষার উৎকর্ষ সাধন ও ভাষার মাধুর্যতায় ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে । সিনেমার পাশাপাশি বাংলা গান, কবিতা বাংলা ভাষার মাধুর্যতাকে সারা বিশ্বের বাংলাভাষী মানুষদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের দেশের বাংলা নাটক দেশে-বিদেশে সমাদৃত হয়েছিল শুধুমাত্র বাংলা ভাষার সঠিক উপস্থাপনার কারণে, প্রমিত বাংলা ভাষার নতুন একটা ধারা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল। আমাদের কবি , সাহিত্যিক, শিল্পী, চলচ্চিত্রকার, নাট্যশিল্পী, গানের জগতের মানুষ অনেক বেশি সৃজনশীল ভাবে বাংলা ভাষাকে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছিল। এই সময় রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে “বহুব্রীহি”, “অয়োময়” এর মত নাটক ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। পাশাপাশি আমাদের চলচ্চিত্র নতুন ধারা রচিত হয় মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক এবং গল্প, উপন্যাস কেন্দ্রিক চলচ্চিত্র নির্মাণের মাধ্যমে। এ সময় “ছুটির ঘন্টা”, “জীবন থেকে নেওয়া”, “তিতাস একটি নদীর নাম” এর মত চলচ্চিত্র তৈরি হয় যা ভাষার মাধুর্যতার ও উৎকর্ষতার জন্য জনপ্রিয়তা লাভ করে। ৮০ এবং ৯০ দশকের মধ্যে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অশ্লীলতার অনুপ্রবেশ ঘটেছে যা আমাদের সাহিত্য চর্চায় নতুন ধারার সূচনা করে। এ সময় অশ্লীলতার জন্য হুমায়ূন আজাদের “নারী” এবং তসলিমা নাসরিনের “লজ্জা” সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ হয়।
১৯৯০ দশকের মাঝামাঝি চলচ্চিত্রে অশ্লীলতার অনুপ্রবেশ ঘটে যার ফলে বাংলা চলচ্চিত্রের শব্দচয়ন ও বাক্য গঠনে অনেক পরিবর্তন সাধিত হয়। বাংলা ভাষার শুদ্ধ উচ্চারণ, শব্দ চয়নের মাধ্যমে ভাষার বিকৃতির কারণে বাংলাদেশের মানুষ সিনেমা হল থেকে বিমুখ হওয়া শুরু করে। এ সময় কিছু সৃজনশীল পরিচালক বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিভিন্ন গল্প ও উপন্যাসের উপর ভিত্তি করে চলচ্চিত্র নির্মাণ করার ফলে চলচ্চিত্রাঙ্গনে কিছুটা আশার সঞ্চার হয়। এ সময় প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের কিছু চলচ্চিত্র জনপ্রিয়তা লাভ করে যার মধ্যে অন্যতম “শ্রাবণ মেঘের দিন”।
২০০০ সালের পর থেকে বাংলাদেশের মানুষ ভাষার বিকৃতি ও অশ্লীলতার কারণে সিনেমা বিমুখ হয়ে যায় তখনো বাংলা নাটক তার স্বকীয়তা বজায় রাখতে সক্ষম হয়। বাংলা নাটকের শব্দচয়ন ভাষার ব্যবহারের কারণে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। ২০০৮ পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অনলাইন প্লাটফর্ম ইউটিউব এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায় যার ফলে বাংলা নাটকের ছন্দপতন ঘটে বাংলা নাটকের ছন্দপতনের মূল কারণ বিদেশি গল্পের অনুকরণে নাটক, মেগা সিরিয়াল করা যেখানে ভাষার বিকৃতি, সাংস্কৃতিক বিকৃতি দৃশ্যমান ছিল যার ফলে বাংলা নাটকের জনপ্রিয়তাও দিন দিন কমতে শুরু করে। দেশের নাট্য নির্মাতারা ও বিদেশী ভাষার অনুকরণে বিদেশি গল্পের আদলে ভাষার বিকৃতির মাধ্যমে নাটক বানানোর ফলে বাংলা নাটক দিন দিন নিঃশেষ হতে শুরু করে।
পাশাপাশি রাজনৈতিক দৈন্যদশার কারণে মিডিয়া হাউজ গুলো সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের চেয়ে রাজনৈতিক বক্তৃতা, টকশো, রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ প্রচারে মনোযোগী হওয়া শুরু করে যার ফলে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের উপর মানুষের আকর্ষণ বেড়ে যায়। সে সুযোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইউটিউবে প্রথম অশ্লীল শব্দ চয়ন ও ভাষার সমন্বয়ে স্বল্প দৈর্ঘ্যের নাটক এবং গল্প প্রচার হওয়া শুরু হয় যা নীতিহীন ভাবে চলতে থাকে, যা আমাদের ভাষার বিকৃতি এবং অশ্লীলতার সূচনা করে। ফেসবুক ব্যবহারের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে ফেসবুক ব্যবহার অশ্লীল শব্দ চয়নের মাধ্যমে ভাষার বিকৃতি করে অশ্লীল গল্প ও কাহিনী প্রচার হওয়া শুরু হয়, যা বর্তমানে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ হাইকোর্ট রিট পিটিশন নং- ৯১৬/২০০৮ সালে ইভটিজিং কে যৌন হয়রানি হিসেবে অভিহিত করেছে এবং এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় আইনি নির্দেশনা প্রদান করেন। সব ধরনের অশ্লীল বাক্য প্রেরণ, শব্দ চয়ন,অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি, অশ্লীল ভাষায় কথা বলা কে যৌন হয়রানি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা প্রদান করেন। এর ফলে দীর্ঘ সময় অশ্লীলতা মুক্ত থাকে এদেশের নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলে। ২০২০ পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বহুবিধ ব্যবহার শুরুর ফলে আমাদের তরুণ প্রজন্ম এতে আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া এখন ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।
২০২০ – ২০২৫ এ সময়ের মধ্যে আমাদের দেশে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ব্যাপক প্রসারতা লাভ করেছে । বিশেষ করে ফেসবুকে ভিডিও দেওয়া, রিলস বানানো ,ব্যবসায়িক কাজে, সামাজিক ,রাজনীতি, অর্থনৈতিক ,সাংস্কৃতিক, প্রতিটি বিষয় স্থান করে নিয়েছে সামাজিক মাধ্যম। সামাজিক মাধ্যমে কিশোর ও তরুণদের অংশগ্রহণ বেড়েছে, অনলাইন এক্টিভিস্টিদের সংখ্যা বেড়েছে, অনলাইন প্লাটফর্ম ব্যবহার করতে গিয়ে আমাদের ভাষার বিকৃতি, কুরুচিপূর্ণ, কুৎসিত, নারীর প্রতি অবমাননাকর বিষয়গুলো দৃশ্যমান হয়েছে এবং মানুষ বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছে।
প্রথমতঃ ফেসবুক ব্যবহার করে অসত্য সংবাদের ছড়াছড়ি দেখা যাচ্ছে, ফেসবুকে কুরুচিপূর্ণ লেখা, অসত্য তথ্য, গুজব ছড়ানোর কাজে ব্যবহার হচ্ছে, ফেসবুকে কুরুচিপূর্ণ লেখা যেমন সাংস্কৃতিক কর্মী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, নারী নেতৃত্ব, সরকারের পদস্থ লোকজনের নামে লেখা হচ্ছে তেমনি সমাজের প্রতিটি বিষয়ে অসংলগ্ন,মানহানিকর , নারীর প্রতি অবমাননাকর বিষয় লেখা হচ্ছে। শুধু তাই না কোন বিষয়ে কেউ কথা বললে বা লিখলে তৎক্ষণাৎ তাকে নিয়ে অশোভন ভাষায় অশ্লীল ও কুৎসিত মন্তব্য জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। বিশেষত নারীদের নিয়ে যেসব মন্তব্য করা হচ্ছে তা হয়রানির মধ্যে পড়ে। হয়রানিকে যদি আমরা চার ভাগে ভাগ করি মৌখিক, মানসিক, শারীরিক, যৌন হয়রানি তাহলে প্রায় প্রত্যেকটা ঘটনাইয় নারীরা শুধু অনলাইন প্লাটফর্মে তিন ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছে। হাইকোর্ট যেখানে ইভটিজিং কে যৌন হয়রানি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ।
দ্বিতীয়তঃ ফেসবুক এবং ইউটিউবে বিভিন্ন কনটেন্ট ভিডিও বানানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। অবাধ তথ্য প্রবাহের এই যুগে কাউকে বিরত রাখা যায় না কিন্তু অবাধ স্বাধীনতার নামে ভাষার বিকৃতি ও অশ্লীলতা রোধ করার জন্য সামাজিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ জরুরী। ফেসবুকে রিলস তৈরির নামে আমাদের কিশোর তরুণরা কুরুচিপূর্ণ ভাষায়, অশ্লীল অঙ্গীভঙ্গির মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয় উপস্থাপন করছে যা আমাদের শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ফেসবুকে ভালো মানের রিলস হচ্ছে না যে তা নয় তবে সে সংখ্যা খুবই কম। আমাদের তরুণরা তাদের নিজেদের পরিচিতি এবং জনপ্রিয়তার জন্য ভাষার বিকৃতিও অশ্লীলতার দিকে ঝুঁকে পড়েছে ।
সবচেয়ে চিন্তার বিষয় আমাদের তরুণ সমাজের যারা রাজনীতি, সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিচরণ করেছে তাদের কেউ কেউ কুরুচিপূর্ণ ভাষা ও আক্রমণাত্মক অঙ্গভঙ্গিতে কথা বলে সৃজনশীল সামাজিক রাজনৈতিক অবস্থানকে নষ্ট করে তুলছে। অপরদিকে দীর্ঘদিন ধরে ইউটিউবে কুরুচিপূর্ণ সংলাপ, অশ্লীল শব্দ চয়নের মাধ্যমে নাটিকা, কন্টেন্ট তৈরি করা হচ্ছে যা সমাজে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতার সাথে মিলে না এরকম অসংখ্য স্বল্পদৈর্ঘ্যের নাটিকা উপস্থাপিত হচ্ছে এসব প্লাটফর্মে। এ বিষয়ে সরকারি সংশ্লিষ্ট দফতরের কোন নজরদারি পরিলক্ষিত হচ্ছে না, অনলাইন প্লাটফর্ম ব্যবহার করে অশ্লীলতা ছড়ানোর যে প্রতিযোগিতা এখন শুরু হয়েছে তা এখনই বন্ধ করা সময়ের দাবি।
তৃতীয়তঃ AI Tools ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচুর কুরুচিপূর্ণ ও অশালীন ভিডিও ছড়ানো হচ্ছে , এসব অশালীন, কুরুচিপূর্ণ ভিডিও কারা তৈরি করে ছড়াচ্ছে সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর দেয়ার প্রয়োজন। যেখানে অশ্লীল শব্দচয়ন ও ভাষা ব্যবহারের কারণে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত বই নিষিদ্ধ ও বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে সেখানে এ ধরনের ভাষা বিকৃতি করে অশ্লীল ভিডিও ছড়ানো ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণ করা জরুরী হয়ে পড়েছে। নতুবা আমাদের শিশু-কিশোররা মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে এবং তারা দিকনির্দেশনাহীন হয়ে পথ ভ্রান্ত হবে। আমাদের শিশু-কিশোরদের ভবিষ্যৎ চরিত্র গঠনের জন্য সৃজনশীল উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
চতুর্থতঃ ইদানিং দেখা যাচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শিশুদেরকে বিভিন্ন রিলস, ইউটিউব কন্টেন্ট, ফেসবুকে বিভিন্ন ক্যাটাগরি যেমন পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক কুরুচিপূর্ণ ,অশালীন শব্দ চয়নের মাধ্যমে বাক্য গঠন করে ভিডিও ছড়ানো হচ্ছে যা আমাদের শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। পাশাপাশি AI Tools ব্যবহার করে সেসব কুরুচিপূর্ণ ভিডিও ছড়ানো হচ্ছে,এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তর গুলোর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
পঞ্চমতঃ বিগত বছর গুলোতে আমাদের নারী সমাজকে নিয়ে বিদ্রুপাত্মক মন্তব্য ঘুরপাক খাচ্ছে অনলাইন প্লাটফর্ম গুলোতে। বিশেষত কোন কর্মজীবী নারী কোন বিষয়ে কথা বললে অশ্লীল মন্তব্যের মাধ্যমে তাকে মানসিকভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। আমাদের যেসব নারীরা রাজনীতিতে আছে তাদেরকেও বিভিন্নভাবে অসম্মান করে অনলাইনে প্রচারণা চালানো হচ্ছে ।
অনলাইন প্লাটফর্ম গুলো যাতে ভাষার ব্যবহারের ক্ষেত্রে শালীনতা বজায় রাখে এবং সৃজনশীল লেখনি, নাটিকা তৈরি, রিলস বানানোর ক্ষেত্রে মনোযোগী হয় সেই প্রত্যাশা করি। আমরা যদি প্রত্যেকেই সচেতন থাকি তাহলে ভাষার বিকৃতি রোধ করা সম্ভব এবং সৃজনশীলতার মাধ্যমে অশ্লীলতাকে পরাভূত করা সম্ভব হবে।




