আচার্য পি. সি. রায়ের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী উদযাপনে প্রস্তুত পাইকগাছা
এম জালাল উদ্দীন:পাইকগাছা(খুলনা)
জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী, প্রখ্যাত বাঙালি রসায়নবিদ, শিক্ষাবিদ, দার্শনিক, বিজ্ঞান লেখক ও দেশীয় শিল্পায়নের অন্যতম পথিকৃৎ আচার্য স্যার প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী আগামী ২ আগস্ট ২০২৬। এ উপলক্ষে খুলনা জেলা প্রশাসন ও পাইকগাছা উপজেলা প্রশাসন ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার রাড়ুলী-কাটিপাড়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। তিনি ভুবনমোহিনী দেবী ও স্থানীয় জমিদার হরিশচন্দ্র রায়ের পুত্র। বনেদি পরিবারের সন্তান হলেও ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, তীক্ষ্ণবুদ্ধি ও প্রত্যুৎপন্নমতি।
আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় ‘পি. সি. রায়’ নামেই সমধিক পরিচিত। তিনি ছিলেন একজন প্রখ্যাত রসায়নবিদ, শিক্ষক, দার্শনিক, কবি ও বিজ্ঞান লেখক। দেশীয় শিল্প বিকাশে তাঁর অসামান্য অবদানের কারণে তাঁকে ভারতীয় শিল্পায়নের অন্যতম অগ্রদূত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি ভারতের প্রথম ও অন্যতম বৃহৎ রাসায়নিক ও ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস’-এর প্রতিষ্ঠাতা।
উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার উদ্দেশ্যে তিনি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অধ্যয়ন করেন এবং একাধিক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৮৮৮ সালে দেশে ফিরে তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। দীর্ঘ প্রায় ২৪ বছর তিনি ওই প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনা করেন। অধ্যাপনার পাশাপাশি রসায়ন বিষয়ে নতুন নতুন গবেষণায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন।
নিজ বাসভবনে দেশীয় ভেষজ উপাদান নিয়ে গবেষণার মধ্য দিয়ে তিনি গবেষণাকর্ম শুরু করেন। তাঁর নিজস্ব গবেষণাগার থেকেই পরবর্তীকালে ‘বেঙ্গল কেমিক্যাল’-এর যাত্রা শুরু হয়। ১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠানটি কলকাতার মানিকতলায় প্রায় ৪৫ একর জমিতে স্থানান্তর করা হয় এবং এর নামকরণ করা হয় ‘বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস লিমিটেড’। পরবর্তীকালে প্রতিষ্ঠানটি ভারতীয় উপমহাদেশের শিল্পায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১৮৯৫ সালে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় ‘মারকিউরাস নাইট্রাইট’ আবিষ্কার করে বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানী মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। এটি তাঁর অন্যতম প্রধান বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার হিসেবে বিবেচিত। গবেষণাজীবনে তিনি একাধিক যৌগিক লবণ ও থায়োএস্টার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা ও আবিষ্কার করেন।
গভীর দেশপ্রেম ও স্বদেশপ্রীতি তাঁকে ইউরোপ থেকে দেশে ফিরিয়ে এনেছিল। দেশে ফিরে তিনি শিক্ষা, বিজ্ঞানচর্চা ও দেশীয় শিল্পের উন্নয়নে নিজেকে উৎসর্গ করেন। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর ছিল গভীর অনুরাগ। তিনি শিক্ষার্থীদের সহজভাবে বোঝানোর জন্য বাংলায় পাঠদান করতেন এবং তাঁর অসাধারণ বাচনভঙ্গি ও ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে সহজেই ছাত্রদের মন জয় করতেন।
আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় ছিলেন উদার, অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী চেতনার অধিকারী। বিজ্ঞান, শিক্ষা, শিল্প ও সমাজ উন্নয়নে তাঁর অসামান্য অবদান আজও মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। কিংবদন্তি এই বিজ্ঞানী ও মনীষীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মান জানাচ্ছেন তাঁর জন্মভূমির মানুষ।
এদিকে, আগামী ২ আগস্ট আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপন উপলক্ষে খুলনা জেলা প্রশাসন ও পাইকগাছা উপজেলা প্রশাসন ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের পাশাপাশি তাঁর জীবন, কর্ম ও বিজ্ঞানচর্চার ওপর আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।
পাইকগাছা উপজেলা পরিষদের প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী বলেন, “আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের সার্বিক প্রস্তুতি ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। আমরা আশা করছি, সকলের সহযোগিতায় মনীষীর জন্মবার্ষিকী সফল ও সার্থকভাবে উদযাপিত হবে।





