ভাঙা রাস্তা, বাঁশের সাঁকো আর অপেক্ষার প্রহর
জুয়েল ইসলাম, তারাগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধিঃ
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলা-র হাড়িয়ারকুঠি ইউনিয়ন-এর ডাক্তারপাড়া, আদাহিন্না, খলেয়া, উজিয়ালসহ প্রায় ১০টি গ্রামের গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ সড়ক দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বেহাল অবস্থায় পড়ে আছে। সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত, ভাঙন ও জলাবদ্ধতার কারণে এসব এলাকার হাজারো মানুষ প্রতিদিন চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি ও প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রমের অভাবে সড়কগুলো বর্তমানে প্রায় চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রামীণ সড়কে পিচ ও ইটের আস্তরণ উঠে গিয়ে অসংখ্য গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও কোথাও রাস্তার মাঝখান ভেঙে খালের মতো গভীর খাদ তৈরি হয়েছে। ফলে স্বাভাবিক যানবাহন চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত এবং রোগীদের জরুরি চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, বর্ষা মৌসুম এলেই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তার গর্তগুলো পানিতে তলিয়ে যায় এবং সৃষ্টি হয় কাদা ও জলাবদ্ধতা। এতে ভ্যান, অটোরিকশা, মোটরসাইকেলসহ ছোট যানবাহনের চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। অনেক সময় পথচারীরাও নিরাপদে চলাচল করতে পারেন না। জরুরি রোগী হাসপাতালে নেওয়া, শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে যাওয়া এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কাজকর্ম ব্যাহত হয়।
সবচেয়ে নাজুক অবস্থা দেখা গেছে ডাক্তারপাড়া গ্রামে। সেখানে রাস্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ভেঙে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত বিচ্ছিন্ন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সরকারি কোনো উদ্যোগ না থাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা নিজ উদ্যোগে বাঁশ দিয়ে একটি অস্থায়ী সাঁকো নির্মাণ করেছেন। সেই ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকো দিয়েই প্রতিদিন নারী, শিশু, বৃদ্ধ, শিক্ষার্থী ও রোগীরা চলাচল করছেন। সামান্য অসাবধানতাতেই দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকলেও বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না থাকায় মানুষ বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়েই যাতায়াত করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা জসিম উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “রাস্তার অবস্থা এতটাই খারাপ যে আমরা নিজেরাই টাকা ও শ্রম দিয়ে বাঁশের সাঁকো তৈরি করেছি। দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বিষয়টি জানানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। আমরা যেন অবহেলিত হয়ে পড়েছি।”
ডাক্তারপাড়ার আরেক বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, “রাতে অসুস্থ রোগী নিয়ে বের হওয়া খুবই কষ্টকর। অনেক সময় অ্যাম্বুলেন্স বা অন্য যানবাহন আসতে চায় না। বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাতেও ভয় লাগে।”
স্থানীয় স্কুলশিক্ষক শফিকুল ইসলাম বলেন, “সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তা চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা কাদা মাড়িয়ে স্কুলে আসে। অনেক সময় পিছলে পড়ে আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে। শিক্ষা কার্যক্রমেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।”
কৃষকরাও সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। স্থানীয় কৃষকরা জানান, উৎপাদিত ধান, ভুট্টা, আলুসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য বাজারে পৌঁছাতে অতিরিক্ত সময় ও খরচ হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবহন সংকটের কারণে ন্যায্য মূল্য থেকেও বঞ্চিত হতে হচ্ছে।
এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত সময়ের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলোর সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ করা না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। তারা সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে কুমারেশ রায় বলেন, “ইউনিয়নের কয়েকটি সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিষয়টি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হবে।”
স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিনের অবহেলায় ক্ষতিগ্রস্ত এসব সড়ক দ্রুত সংস্কার করা না হলে জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হবে। তাই জনস্বার্থে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।





