৫০ শয্যার হাসপাতাল, সেবার সংকট ও ময়লার সাম্রাজ্য
জুয়েল ইসলাম, তারাগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি:
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কাগজে-কলমে ৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রয়োজনীয় বেড সংকট, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, অব্যবস্থাপনা এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার কারণে হাসপাতালটি নিয়ে স্থানীয় জনগণের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ বিরাজ করছে। অভিযোগ উঠেছে, উপজেলার একমাত্র সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটি বর্তমানে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশিত চিকিৎসাসেবা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা, রোগী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিতে এসে প্রতিনিয়ত নানা ধরনের ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। নামমাত্র ৫০ শয্যার হাসপাতাল হলেও বাস্তবে সেখানে ৩০টি বেডও সঠিকভাবে ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে রোগীদের অনেক সময় মেঝেতে কিংবা পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ছাড়া চিকিৎসা নিতে বাধ্য হতে হচ্ছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের ভেতরে ও আশপাশের পরিবেশ অত্যন্ত নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর। হাসপাতালের একটি অন্ধকার অংশ এবং ড্রেনের পাশে দীর্ঘদিন ধরে জমে রয়েছে কালো, দুর্গন্ধযুক্ত পানি। ওই পানির ওপর ভাসতে দেখা গেছে প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট, ওষুধের খোসা, ব্যবহৃত চিকিৎসা সামগ্রীসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য। এসব বর্জ্য দীর্ঘদিন অপসারণ না করায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে হাসপাতালজুড়ে।
এছাড়া হাসপাতাল চত্বরে থাকা ড্রেনগুলো অনেকাংশেই ময়লা-আবর্জনায় ভরাট হয়ে গেছে। হাসপাতালের বাগান ও আশপাশের এলাকায় জমে থাকা প্লাস্টিক, পলিথিন, ওয়ান-টাইম কাপ এবং অন্যান্য বর্জ্য পরিবেশকে আরও নোংরা করে তুলেছে। পরিচ্ছন্নতার অভাবে হাসপাতালের পুরো এলাকা এখন মশা ও রোগবাহী কীটপতঙ্গের নিরাপদ আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের মতে, হাসপাতালের এই পরিবেশ ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য সংক্রামক রোগ বিস্তারের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। রোগমুক্তির আশায় হাসপাতালে আসা মানুষ বরং নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছেন। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে জমে থাকা পানি ও অপরিষ্কার ড্রেনের কারণে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা কয়েকজন রোগী ও স্বজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সরকার স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে। কিন্তু তারাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বর্তমান অবস্থা দেখে মনে হয় না এখানে নিয়মিত তদারকি হয়। হাসপাতালের ভেতরে প্রবেশ করলেই দুর্গন্ধে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।”
আরেকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “হাসপাতালে মানুষ আসে সুস্থ হওয়ার জন্য। কিন্তু এখানকার পরিবেশ এমন যে, সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে যেতে পারে। একটি সরকারি হাসপাতালের পরিবেশ কখনোই এমন হওয়া উচিত নয়।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তারাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হামদ্দুলা বলেন, “হাসপাতাল চত্বরে কোথাও ময়লা-আবর্জনা জমে থাকলে তা দ্রুত পরিষ্কারের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।”
এ বিষয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে তারাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোনাববর হোসেন বলেন, “সরকারি হাসপাতালের পরিবেশ অবশ্যই পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত হতে হবে। পরিদর্শনের সময় যদি এ ধরনের ময়লা-আবর্জনা বা অব্যবস্থাপনা চোখে পড়ে, তাহলে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা বলছেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স শুধু চিকিৎসাসেবার কেন্দ্র নয়, এটি হাজারো মানুষের আস্থার জায়গা। তাই হাসপাতালের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা এবং রোগীদের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। তারা দ্রুত হাসপাতাল চত্বর পরিষ্কার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচলকরণ এবং নিয়মিত তদারকির দাবি জানিয়েছেন।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, প্রশাসনের দেওয়া আশ্বাস কেবল কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দ্রুত বাস্তবায়িত হবে। কারণ একটি পরিচ্ছন্ন হাসপাতাল শুধু উন্নত স্বাস্থ্যসেবার প্রতীক নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষার অন্যতম পূর্বশর্ত। বর্তমানে তারাগঞ্জবাসী সেই পরিবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছে।




