সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পপার্কে শত কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের মহোৎসব
ওয়াসিম সেখ, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি:
সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পপার্কে নির্মিত শত কোটি টাকার সড়ক ব্যবহারের আগেই কার্পেটিং উঠে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে গাছ লাগানো, বালু ভরাট, গেট নির্মাণসহ বিভিন্ন কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পে নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ না করে আংশিক কাজ দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। শিল্পপার্কের অভ্যন্তরে লেকের দুই পাশে গাছ লাগানোর কথা থাকলেও বাস্তবে এক পাশেই গাছ লাগানো হয়েছে। অপর পাশে কোনো কাজ না করেই বিল উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। একইভাবে লেকের দুই পাশে বালু দিয়ে ভরাট করার কথা থাকলেও সেখানে এখনো বড় বড় গর্ত রয়ে গেছে। প্লটগুলোতেও বালু ভরাট সম্পন্ন হয়নি।
স্থানীয়রা জানান, শিল্পপার্কে নির্মিত সড়কগুলোতে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে। কোথাও ভাঙা ইটের খোয়া, কোথাও নিম্নমানের পাথর ব্যবহার করা হয়েছে। গ্যাস লাইনের কাজেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া এখনো পানি সংযোগ স্থাপন করা হয়নি।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, টেন্ডারের শর্ত লঙ্ঘন করে সড়ক নির্মাণে নির্ধারিত ৫০ মিলিমিটার খোয়ার পরিবর্তে বড় আকারের ইটের খোয়া ব্যবহার করা হয়েছে। ৭৫ মিলিমিটার কার্পেটিংয়ের স্থলে অনেক জায়গায় মাত্র ৬০ থেকে ৬৫ মিলিমিটার পুরুত্ব পাওয়া গেছে। খোয়া ও বালুর মিশ্রণেও অনিয়ম করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এমনকি কাজ শেষ হওয়ার এক বছরের মধ্যেই সড়কের কার্পেটিং উঠে যাওয়ায় প্রকল্পের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে বিসিক চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম বলেন, রাস্তা উঠে যাচ্ছে এ বিষয়ে আমার জানা নেই। তবে দুদক ও বিসিক দুই পক্ষই তদন্ত করছে। তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
অভিযোগ রয়েছে, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রভাবশালী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আরাফাত কনস্ট্রাকশন দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমানের কাজ করলেও বিসিক কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেয়নি। বরং বিসিকের প্রকৌশল ও প্রকল্প বাস্তবায়ন বিভাগের পরিচালক আব্দুল মতিন এবং প্রকল্প পরিচালক জাফর বায়জিদের যোগসাজশে প্রতিষ্ঠানটিকে ২০২৪ সালের জুনে প্রায় ২০০ কোটি টাকার বিল পরিশোধ করা হয়।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে আরাফাত কনস্ট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী দাবি করেন, তারা নিয়ম মেনেই কাজ করেছেন। বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
২০২৫ সালের ১৬ আগস্ট শিল্পপার্ক এলাকা পরিদর্শনে যান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পরিদর্শনের সময় সড়ক ও ড্রেন নির্মাণে ব্যবহৃত উপকরণ ও পুরুত্ব নিয়ে প্রশ্ন করা হলেও কোনো স্পষ্ট মন্তব্য করা হয়নি। এমনকি পরিদর্শনের সময় কোনো মাপজোকও নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।
এদিকে, তথ্য অধিকার আইনে ২০২৫ সালের ২৮ জুলাই তথ্য চেয়ে আবেদন করা হলে বিসিক শিল্প নগরীর ব্যবস্থাপক মাহবুবুল তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি দাবি করেন, চাওয়া তথ্য ব্যবসায়িক গোপনীয়তার মধ্যে পড়ে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে ড্রেন ও সড়ক নির্মাণে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রায় ২০ কোটি টাকা জরিমানা করা হলেও তা এখনো আদায় করা হয়নি।
উল্লেখ্য, যমুনা সেতুর পশ্চিম পাশে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলী, পশ্চিম মোহনপুর, বনবাড়িয়া, বেলটিয়া ও মোরগ্রাম মৌজার প্রায় ৪০০ একর জমিতে বিসিক শিল্পপার্ক বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। একাধিকবার সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে প্রকল্পটির ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৭১৯ কোটি ২১ লাখ টাকা। এখানে ৮২৯টি প্লটে অন্তত ৫৭০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ঘটনায় দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।





