জমি সংক্রান্ত বিরোধের নির্মম মূল্য: অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীকে জড়ানো হলো হত্যা মামলায়, এবার প্রতিবন্ধী বাবার খাট থেকে টেনে নামানোর অভিযোগ
পিরোজপুর প্রতিনিধি:
মাত্র ১ একর ২১ শতাংশ পৈত্রিক সম্পত্তি। কিন্তু সেই জমিকে ঘিরে গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চলা বিরোধে একটি পরিবারের অভিযোগ—তারা হারিয়েছে জমির দখল, সন্তানের লেখাপড়া, নিরাপত্তা আর স্বাভাবিক জীবন।
পিরোজপুরের ইন্দুরকানী উপজেলার পাড়েরহাট ইউনিয়নের হোগলাবুনিয়া গ্রামের প্রতিবন্ধী শহিদুল হাওলাদার এখন শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে দিন কাটান। পরিবারের দাবি, গত ৩০ জুলাই সকালে বিরোধপূর্ণ জমিকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের লোকজন তাকে খাট থেকে টেনে নামিয়ে মারধর করে। হামলায় আহত হন তার স্ত্রী মঞ্জু বেগমও। পরে স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে পিরোজপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে যান।
এদিকে এ ঘটনায় ভুক্তভোগী মঞ্জু বেগম সম্প্রতি ইন্দুরকানী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। মঙ্গলবার ইন্দুরকানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহব্বত খান উভয় পক্ষের পৃথক জিডি দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
অভিযোগকারী মঞ্জু বেগম বলেন, ” আমাগো সকাল ৮.০০ টার সময় মারছে, অনেক গালাগাল করছে,খাট থেকে টেনে নামাইয়া নিচে হালাইয়্যা (ফেলে) দাহান (দা) ধরছে আমারে জবাই দেওয়ার হুমকি দেছে । মোর স্বামী প্রতিবন্ধী, হার্ট অ্যাটাক করছে। ঘর দুয়ার ভাইঙ্গা হালাইছে পিছন দিয়া।
প্রতিবন্ধী শহিদুল হাওলাদারের দাবি, ” আমার স্ত্রী ও আমাকে মারছে, আমাগো সব কাগজ পত্র আছে তাগো নেই।”
পরিবারটির অভিযোগ, তাদের ২০ জনেরও বেশি ওয়ারিশের নামে এসএ, আরএস ও বিএস রেকর্ডভুক্ত ১ একর ২১ শতাংশ জমি ২০১২ সালে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দখল করা হয়। সেই সময় অভিযোগ জানিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি বলে দাবি তাদের।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য হাফিজুর রহমান বলেন, ২০১২ সালে স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা এবং পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর যুদ্ধাপরাধ মামলার রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী মোস্তফা হাওলাদার রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে জমিটি দখল করেন এবং সেখানে থাকা গাছপালা বিক্রি করে দেন। তিনি দাবি করেন, তাদের পরিবার বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় সে সময় থানায় অভিযোগ দিতে গেলেও তা গ্রহণ করা হয়নি; বরং তাদের ভয়ভীতি দেখানো হয়।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, ২০১৩ সালে মোস্তফা হাওলাদার দুর্বৃত্তদের হামলায় আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়ার পর তার ভাই কুদ্দুস হাওলাদার, রুস্তম হাওলাদার, ছেলে শরিফুল ইসলাম, হাফিজুল ইসলাম ও স্ত্রী হাসিনা বেগম জমির দখল বজায় রাখার উদ্দেশ্যে শহিদুল ইসলামের ছেলে সোলাইমান হাওলাদার এবং তার ভাই আব্দুর রহিম হাওলাদারকে হত্যা মামলায় আসামি করেন।
তবে তাদের দাবি অনুযায়ী এই পরিবারের সবচেয়ে বড় ক্ষতি ঘটেছিল ২০১৩ সালে। শহিদুল হাওলাদারের ছেলে সোলাইমান হাওলাদার তখন স্থানীয় রাজলক্ষ্মী স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। জমি বিরোধের জেরে তাকে একটি হত্যা মামলায় আসামি করা হয়। দীর্ঘদিন কারাভোগের কারণে তার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। সেই মামলাটি এখনও বিচারাধীন।
সোলাইমান বলেন, “যখন আমার হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, তখন আমাকে আদালত আর কারাগারের পথ চিনতে হয়েছে। মামলার কারণে আর স্কুলে ফিরতে পারিনি এবং অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষাও দিতে পারিনি। একটি জমি সংক্রান্ত বিরোধ আমাদের পুরো পরিবারকে নিঃস্ব করে দিয়েছে।”
শহিদুল হাওলাদারের ভাগনে হাফিজুর রহমানের দাবি, বছরের পর বছর ধরে তারা জমির দখল ফিরে পাওয়ার জন্য বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেছেন। সরকার পরিবর্তনের পরও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কাছে আবেদন করেও কার্যকর কোনো প্রতিকার পাননি বলে অভিযোগ তাদের।
অভিযুক্ত আব্দুল কুদ্দুস হাওলাদার অবশ্য সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, জমিটি তাদের পূর্বপুরুষের নামে সিএস রেকর্ডভুক্ত এবং পরবর্তী রেকর্ডে ভুলবশত অন্যদের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তিনি বলেন, তারা কোনো জমি দখল বা হামলার সঙ্গে জড়িত নন। তার ভাই মোস্তফা হাওলাদার আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন কিন্তু নিজেকে বিএনপির ওয়ার্ড কমিটির সাধারণ সম্পাদক দাবি করেন তিনি।
বিষয়ে ইন্দুরকানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহব্বত খান বলেন, “ দুপক্ষের দুটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। বেশীরভাগ অভিযোগগুলো দেওয়ানী প্রকৃতির, কিছু বিষয় ফৌজদারি প্রকৃতির। আমরা ফৌজদারি বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছি। যার বিরুদ্ধে যতটুকু প্রয়োগ করা যায়,ততটুকু প্রয়োগ করা হবে।”





