সাড়ে ১২ কোটি টাকার বাজার ৬ বছরেও জমেনি বেচাকেনা, সন্ধ্যা নামলেই মাদকসেবীদের আড্ডা
ওয়াসিম সেখ, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি:
সাড়ে ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ, আধুনিক অবকাঠামো, পরিকল্পিত দোকান বিন্যাস, পশু জবাইখানা, মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণের পৃথক স্থান, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা-সবই আছে। নেই শুধু প্রাণচাঞ্চল্য। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার প্রায় পাঁচ বছর এবং উদ্বোধনের চার বছর পেরিয়ে গেলেও পুরোপুরি চালু হয়নি সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার ফজলুল হক সড়কে নির্মিত ‘আলহাজ মোহাম্মদ নাসিম পৌর কাঁচাবাজার’, যা বর্তমানে সিরাজগঞ্জ পৌর কাঁচাবাজার নামে পরিচিত।
দীর্ঘদিন ধরে কার্যত অচল পড়ে থাকা বাজারটিতে প্রায় ২০০টি দোকান থাকলেও হাতে গোনা কয়েকটি স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছে। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত দোতলা ভবনটি প্রত্যাশিত জনসেবা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। উল্টো দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় নষ্ট হচ্ছে ভবনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও অবকাঠামো।
শুধু তাই নয়, জনসমাগমহীন ও নির্জন এই ভবনের বিভিন্ন কোণ এবং ফাঁকা জায়গা সন্ধ্যার পর মাদকসেবীদের আড্ডাস্থলে পরিণত হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের। এতে একদিকে যেমন সরকারি অর্থের বিনিয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, অন্যদিকে বাজারটি ঘিরে বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতা।
সিরাজগঞ্জ পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, শহরের মূল বাজারের ওপর চাপ কমানো এবং মাছ, মাংস, মুরগি, সবজি ও ফলমূলের ব্যবসা একটি পরিকল্পিত স্থানে স্থানান্তরের উদ্দেশ্যে বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় ১২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়।
২০১৯ সালের ২১ মে নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ২০২১ সালের ৩০ জুন দুই তলা ভবনের কাজ শেষ হয়। ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে চারতলা ভিত্তির ওপর। নিচতলায় রয়েছে ১১৬টি ভিটা এবং দ্বিতীয় তলায় ৭৮টি দোকান।
বাজারটিতে আধুনিক পশু জবাইখানা, মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ধোয়ার জায়গা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মাংস বিক্রির ব্যবস্থা, বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, শৌচাগার, কার্যালয় ও গাড়ি পার্কিংয়ের মতো সুবিধাও রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ একটি আধুনিক ও পরিকল্পিত কাঁচাবাজার চালুর জন্য যে অবকাঠামোগত সুবিধা প্রয়োজন, তার প্রায় সবই রয়েছে। কিন্তু ক্রেতা-বিক্রেতার সমাগম না থাকায় সেই অবকাঠামোই এখন অনেকটা বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পৌরসভা সূত্রে আরও জানা যায়, ভিটাপ্রতি ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা এবং দোকানপ্রতি ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানত নিয়ে ব্যবসায়ীদের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। ভিটাপ্রতি মাসিক ভাড়া ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা এবং দোকানের ভাড়া ৮০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
২০২২ সালের ২১ মার্চ বাজারটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। এরপর আরও দুই দফা বাজারটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে তা সচল হয়নি। ব্যবসায়ীদের যুক্তি, নতুন বাজারে ক্রেতা না থাকায় দোকান খুললে লোকসান গুনতে হবে। ফলে বরাদ্দ নেওয়ার পরও অধিকাংশ ব্যবসায়ী সেখানে নিয়মিত ব্যবসা শুরু করেননি।
বর্তমানে বাজার বণিক সমিতির কোনো কমিটি না থাকায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে সমন্বিতভাবে বাজার চালুর উদ্যোগও দৃশ্যমান নয়। তবে কয়েকজন ব্যবসায়ীর দাবি, পৌর কর্তৃপক্ষ কঠোর ও কার্যকর উদ্যোগ নিলে বাজারটি চালু করা সম্ভব।
বাজার ভবনের সিঁড়ির নিচে অস্থায়ীভাবে দোকান পরিচালনা করছেন মো. শফিকুল ইসলাম স্বপন। তিনি বলেন, টাকা দিয়ে দোকান বরাদ্দ নেওয়ার পরও বাধ্য হয়ে সিঁড়ির নিচে অস্থায়ীভাবে ব্যবসা করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, বড় আশা করে দোকান নিয়েছিলাম। কিন্তু বাজার সচল না হওয়ায় চরম বিপদে আছি। ক্রেতা খুবই কম। সারাদিনে তেমন বেচাকেনা হয় না।
পৌর কাঁচাবাজারের আড়তদার মো. শরিফুল ইসলাম শরীফ বলেন, বাজারটি চালু না হওয়ায় ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় বাজারের মূল্যবান যন্ত্রপাতিও নষ্ট হচ্ছে।
তিনি অভিযোগ করেন, রাত হলেই এখানে মাদকসেবীদের আড্ডা বসে। বাজারটি অনেকটা মাদকসেবীদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে। দ্রুত বাজারটি চালু করা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দিনের বেলায় ভবনটি অনেকটা ফাঁকা পড়ে থাকলেও সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। ভবনের ভেতরের বিভিন্ন কোণ ও নির্জন স্থানে বহিরাগতদের আনাগোনা বাড়ে। এতে আশপাশের ব্যবসায়ী ও পথচারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে।
বাজারটি দীর্ঘদিনেও কেন সচল হয়নি-এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ পৌরসভার সচিব রফিকুল ইসলামের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তার কাছে কোনো নির্দেশনা নেই।
তবে সিরাজগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উন্নয়ন ও মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা) এবং পৌর প্রশাসক শাহাদাত হুসেইন বলেন, বাজার ভবনটি দ্রুত চালুর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, আমরা খুব দ্রুত এই ভবনটি চালু করার প্রক্রিয়া শুরু করেছি। আগামী এক মাসের মধ্যেই ভবনটি চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মাদকসেবীদের আড্ডার বিষয়ে তিনি বলেন, ভবনটি যাতে মাদকসেবীরা ব্যবহার করতে না পারে, সে জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝে মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়।
একটি আধুনিক কাঁচাবাজার নির্মাণের পেছনে ব্যয় হয়েছে ১২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। লক্ষ্য ছিল শহরের যানজট কমানো, বাজার ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক করা এবং ব্যবসায়ীদের জন্য পরিকল্পিত পরিবেশ তৈরি করা। কিন্তু নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও সেই লক্ষ্য বাস্তবায়িত হয়নি।
বরং দীর্ঘদিনের অচলাবস্থায় একদিকে যেমন ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়ছেন, অন্যদিকে অব্যবহৃত অবস্থায় নষ্ট হচ্ছে সরকারি অর্থে নির্মিত স্থাপনা ও যন্ত্রপাতি। পাশাপাশি ভবনটি ব্যবহার করছে মাদকসেবীরা-এমন অভিযোগও উঠছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের দাবি, শুধু আরেক দফা উদ্বোধন নয়, এবার কার্যকর পরিকল্পনা নিয়ে বাজারটি চালু করতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক এই বাজারটি যদি দ্রুত সচল করা না যায়, তাহলে জনসেবার উদ্দেশ্যে নির্মিত স্থাপনাটি শেষ পর্যন্ত একটি ব্যর্থ প্রকল্পের দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়াবে-এমন আশঙ্কাই এখন স্থানীয়দের।





