জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণ ও আন্তঃসংযোগ নিশ্চিত করতে হবে: পানি সম্পদমন্ত্রী
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:
চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের পাশাপাশি প্রকল্প-পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণ, খাল-নালা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার আন্তঃসংযোগ এবং সিটি কর্পোরেশনের কার্যকর সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মোঃ শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি এমপি।
মঙ্গলবার বিকালে টাইগারপাসস্থ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে করণীয় নির্ধারণে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
পানি সম্পদমন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন যে উদ্যোগ নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তাদের একসঙ্গে আলোচনায় বসার সুযোগ তৈরি করেছেন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জলাবদ্ধতা নিরসনের মতো একটি জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় থাকা প্রয়োজন। এ উদ্যোগের জন্য তিনি মেয়রকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানান।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে যে প্রকল্প চলমান রয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না, প্রকল্প শেষ হওয়ার পর সেটি কীভাবে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে, পানি কীভাবে প্রবাহিত হবে এবং ছোট-বড় খাল, ড্রেন ও অন্যান্য জলপ্রবাহের মধ্যে কীভাবে কার্যকর সংযোগ থাকবে—এসব বিষয়ও পরিকল্পনার শুরুতেই বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন ছিল।
মন্ত্রী বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন সংস্থা জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করছে। কিন্তু সিটি কর্পোরেশনকে শুরু থেকেই সমন্বিতভাবে প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন ছিল। কারণ প্রকল্প বাস্তবায়নের পর খাল, ড্রেন ও পানি নিষ্কাশন অবকাঠামোর নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, রক্ষণাবেক্ষণ ও দখলমুক্ত রাখার দায়িত্ব কার—তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ না থাকলে বিপুল অর্থ ব্যয় করেও কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
তিনি আরও বলেন, কোথাও একটি ড্রেন বা খালের কাজ শেষ হয়েছে, আবার অন্য জায়গায় কাজ চলমান রয়েছে। কোথাও খাল ভরাট হয়ে যাচ্ছে, কোথাও দখল হচ্ছে। এসব বিষয় সমন্বিতভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতে হবে।
পানি সম্পদমন্ত্রী বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের চলমান কাজগুলো শেষ পর্যায়ে রয়েছে। কয়েকটি খালের কাজ এবং সংশ্লিষ্ট রেগুলেটরের কাজ সম্পন্ন হলে পানি প্রবাহের সক্ষমতা আরও বাড়বে। তবে এসব খাল ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার সঙ্গে মহানগরীর ছোট ছোট খাল, নালা ও সংযোগ খালগুলোর আন্তঃসংযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। একটি অংশের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা আরেকটি অংশের সঙ্গে সংযুক্ত না থাকলে কোথাও পানি আটকে থেকে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে পারে।
তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে এখন একটি সমন্বিত রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে এ কাজে কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে। প্রয়োজন হলে সিটি কর্পোরেশনের জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দ, জনবল ও প্রয়োজনীয় সক্ষমতার ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ প্রকল্প শেষ হওয়ার পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না হলে কয়েক বছর পর আবার একই সমস্যা দেখা দিতে পারে।
মন্ত্রী বলেন, সিটি কর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে ভবিষ্যৎ রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার একটি কার্যকর কাঠামো তৈরি করতে হবে। জলাবদ্ধতা নিরসনে সবাই যদি সতর্ক ও দায়িত্বশীলভাবে কাজ করে, তাহলে চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, আগের পরিকল্পনায় সমন্বিত ব্যবস্থাপনার ঘাটতি থাকায় এখন বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় করে কাজ করতে হচ্ছে। তবে অতীতের সীমাবদ্ধতা নিয়ে পড়ে না থেকে বর্তমানে যে অবকাঠামো তৈরি হয়েছে, সেটিকে কার্যকর ও টেকসই করার দিকে নজর দিতে হবে। ভবিষ্যতে যাতে একটি প্রতিষ্ঠানের কাজ অন্য প্রতিষ্ঠানের কাজের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন না থাকে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে একক কোনো সংস্থার পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়। এ জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, সিডিএ, সেনাবাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব সেবা সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। পারস্পরিক সমন্বয় ও সহযোগিতার মাধ্যমে চলমান প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে পারলে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি সম্ভব।
তিনি বলেন, আমি ২০২৪ সালের নভেম্বরের দিকে মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করি। তখন নগরীর অনেক এলাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে যেত। মেয়র রেজাউলের বহদ্দরহাটের মতো এলাকায় মানুষের স্বাভাবিক চলাচলও ব্যাহত হতো। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন এলাকায় খাল-নালা পরিষ্কার, সংস্কার ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করা হয়েছে। এর ফলে ২০২৫ সাল থেকে বহদ্দারহাটসহ অনেক এলাকায় আগের মতো পানি ওঠেনি। অথচ এ বছর বৃষ্টির পরিমাণ ছিল অত্যন্ত বেশি।
মেয়র বলেন, চট্টগ্রামে এ বছর একদিনে ৪১২ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর আগে ২০০৭ সালে একদিনে ৪০৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছিল। ওই সময় পাহাড়ধসসহ বিভিন্ন ঘটনায় বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। এ বছর বিপুল পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই নগরীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অতিবৃষ্টির পাশাপাশি পাহাড়ি ঢল ও পাহাড় কাটার কারণে সৃষ্ট মাটি-বালু খাল ও নালা ভরাট হয়ে যাওয়াও জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ। এসব বিষয়কে সমন্বিতভাবে বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে যেতে হবে।
মেয়র বলেন, নগরীর প্রায় ৪০টি খাল নিয়ে সিটি কর্পোরেশনের একটি ডিপিপি রয়েছে। পাশাপাশি সেনাবাহিনীর বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের আওতায়ও বেশ কিছু খালের সংস্কার ও পুনঃখননের কাজ চলছে। যেসব খাল সেনাবাহিনীর প্রকল্পের আওতায় রয়েছে, সেগুলো তারা করবে এবং অন্যান্য খালের কাজ সিটি কর্পোরেশন করবে। এসব কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন করা গেলে জলাবদ্ধতা নিরসনে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে বলে আমরা আশা করছি।
তিনি বলেন, হিজড়া খালসহ কয়েকটি খালের কিছু কাজ এখনো বাকি রয়েছে। বৈশাখ মাসে চট্টগ্রামে যে পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে, তা ছিল অস্বাভাবিক। এত অল্প সময়ে এত বেশি বৃষ্টি হবে—এটা অনেকেরই ধারণার বাইরে ছিল। ফলে প্রবর্তক মোড়ে সেসময় সেনাবাহিনীর প্রকল্পে জন্য বাঁধ থাকায় কিছু এলাকায় হঠাৎ করে পানি জমেছিল। তবে এটিকে পুরো বছরের জলাবদ্ধতার চিত্র হিসেবে দেখলে চলবে না। গত বছরের তুলনায় অনেক এলাকায় পানি জমার সময় ও স্থায়িত্ব কমেছে—এটিও আমাদের অগ্রগতির অংশ।
সেনাবাহিনীর চলমান প্রকল্পের প্রশংসা করে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প বাস্তবায়নে সেনাবাহিনী যেভাবে খাল ও জলাধারের জায়গা উদ্ধার, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং বিভিন্ন অবকাঠামোগত কাজ করছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক জায়গায় রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার কারণে উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন ছিল। কিন্তু তারা ধৈর্য ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করেছে। এ জন্য সংশ্লিষ্টদের আমি আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাই।
তিনি বলেন, চলমান প্রকল্পের কাজগুলো বাস্তবায়নের আগে এবং পরে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের পর্যবেক্ষণ ও মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রকৌশলীরাও বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করে তাদের পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের এসব কারিগরি পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা হলে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আরও দ্রুত পাওয়া সম্ভব।
মেয়র বলেন, জলাবদ্ধতা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; এটি পুরো নগরীর সমস্যা। তাই এর সমাধানও হতে হবে সম্মিলিত উদ্যোগে। সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয়, নিয়মিত তথ্য আদান-প্রদান এবং মাঠপর্যায়ে যৌথভাবে কাজ করার মাধ্যমে আমরা একটি জলাবদ্ধতামুক্ত ও বাসযোগ্য চট্টগ্রাম গড়ে তুলতে চাই।
চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ এমপি বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে বড় খাল সংস্কার ও সুইসগেট নির্মাণের পাশাপাশি ছোট নালা ও খালগুলোর সঙ্গে কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ বড় খালগুলো সংস্কার করলেও পানি যদি ছোট নালা থেকে খালে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব হবে না।
তিনি বলেন, চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে সরেজমিনে আমার সংসদীয় এলাকার বিভিন্ন জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকা পরিদর্শন করেছি। এ সময় কোথায় কী ধরনের সমস্যা রয়েছে, তা চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন এলাকার নালা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও আবার রাস্তার নিচ দিয়ে পানি পারাপারের জন্য প্রয়োজনীয় ক্রস ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় পানি এক পাশ থেকে অন্য পাশে যেতে পারছে না।
এরশাদ উল্লাহ এমপি বলেন, চট্টগ্রাম-৮, ৯, ১০ ও ১১ সংসদীয় এলাকার সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে মেয়র যে কমিটিগুলো গঠন করেছেন, সেসব কমিটির সুপারিশ নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যদের সঙ্গে বসে সমন্বিতভাবে করণীয় নির্ধারণ করা প্রয়োজন। শুধু বড় খাল পরিষ্কার, সংস্কার বা সুইসগেট নির্মাণ করলেই জলাবদ্ধতা নিরসন হবে না; ছোট নালা থেকে বড় খাল এবং সেখান থেকে নদী পর্যন্ত পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরীতে জলাবদ্ধতার পানি মূলত বিভিন্ন উৎস থেকে আসে। জোয়ারের পানি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বৃষ্টির পানি এবং নগরবাসীর দৈনন্দিন ব্যবহারের পানি নিষ্কাশনেরও ব্যবস্থা করতে হবে। এসব পানি যদি নালা-নর্দমায় গিয়ে আটকে থাকে, তাহলে বড় খাল সংস্কার করেও কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না।
সংসদ সদস্য বলেন, বর্ষা মৌসুম শেষ হওয়ার পর আগামী বর্ষার আগেই যেসব খাল ও নালা এখনও পরিষ্কার করা হয়নি, সেগুলো চিহ্নিত করে পরিষ্কার করতে হবে। যেসব এলাকায় নালা নতুন করে নির্মাণ বা সংস্কার প্রয়োজন, সেসব কাজও বর্ষার আগেই সম্পন্ন করা দরকার।
তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম-৮ আসনের ৩, ৪ ও ৫ নম্বর ওয়ার্ডসহ জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকাগুলো মেয়র নিজেও একাধিকবার সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন। এসব এলাকার ছোট নালাগুলোকে বড় নালা ও খালের সঙ্গে সংযুক্ত করার পাশাপাশি যেসব স্থানে ক্রস ড্রেনেজ প্রয়োজন, সেগুলোও দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
এরশাদ উল্লাহ এমপি বলেন, বিভিন্ন খালের প্রস্থ ও সীমানা নিয়ে বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোনো রেকর্ডের পার্থক্য রয়েছে। কোথাও খালের আগের জায়গা সংকুচিত হয়ে গেছে। খালের প্রকৃত জায়গা চিহ্নিত করে প্রয়োজন অনুযায়ী দখলমুক্ত ও পুনরুদ্ধার করা না হলে ভবিষ্যতে আবারও জলাবদ্ধতার সমস্যা তৈরি হবে। তাই আগামী বর্ষা মৌসুমের আগেই সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে কাজ শুরু করার আহ্বান জানান তিনি।
চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে বিচ্ছিন্নভাবে কোনো একটি খাল বা নালা সংস্কার করলে হবে না; পুরো পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। খাল সংস্কারের পাশাপাশি নালাগুলো সচল রাখা এবং ছোট খালগুলোর সঙ্গে বড় খালের কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে তিনি দেখেছেন, চট্টগ্রাম ১০ আসনে ৪টি খালের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এসব খালকে কীভাবে আরও কার্যকর করা যায় এবং মহেশখালের সঙ্গে কীভাবে যথাযথভাবে সংযুক্ত করা যায়, সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। মহেশখাল দীর্ঘ ও প্রশস্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপ্রবাহ ব্যবস্থা হলেও এর সক্ষমতা ও অবকাঠামোকে এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
সাঈদ আল নোমান এমপি বলেন, নালা সংস্কার না করে শুধু খাল সংস্কার করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। আবার খাল সংস্কার করেও নালাগুলো সচল না রাখলে পানি খালে পৌঁছাবে না। তাই খাল, নালা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং পানি নিষ্কাশনের সংযোগগুলোকে একসঙ্গে বিবেচনা করে পরিকল্পনা করতে হবে। এটি একটি সমন্বিত বা হলিস্টিক বিষয়।
তিনি বলেন, প্রতিটি সংসদীয় এলাকার জলাবদ্ধতা সমস্যা চিহ্নিত ও সমাধানের জন্য মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন যে কমিটিগুলো গঠন করেছেন, সেগুলোকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো প্রয়োজন। প্রতিটি সংসদীয় এলাকার জন্য দুই-তিনজন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সমন্বয়ে একটি দায়িত্বশীল টিম নির্ধারণ করা যেতে পারে, যারা সংশ্লিষ্ট এলাকার খাল ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে এবং সংসদ সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে।
সাঈদ আল নোমান এমপি বলেন, স্লুইসগেট ও পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো নিয়ে বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড, চট্টগ্রাম ওয়াসা, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট চারটি প্রধান সংস্থাকে নিয়ে একটি সমন্বিত বৈঠক করা যেতে পারে। সেখানে কোন স্লুইসগেট কোথায়, এর মালিকানা কার, এর সক্ষমতা কতটুকু এবং কোথায় কী ধরনের সমস্যা রয়েছে—এসব বিষয় চিহ্নিত করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে অনেকগুলো প্রকল্প ও অবকাঠামো ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে। এখন এগুলোকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে এসে কার্যকরভাবে পরিচালনা করা জরুরি। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও নির্দিষ্ট দায়িত্ব বণ্টন নিশ্চিত করা গেলে বিদ্যমান অবকাঠামোগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জলাবদ্ধতা সমস্যাও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
সভায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএর চলমান প্রকল্পের আওতায় ৩৬টি খালের সংস্কার ও পুনরুদ্ধারের কাজ করা হচ্ছে। এসব কাজ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বিপুলসংখ্যক স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৫ হাজার ৭০০টি বৈধ ও অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করা হয়েছে। এখনো কয়েকটি স্থাপনা অপসারণ বাকি রয়েছে, যেগুলোও অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং।
তিনি বলেন, চট্টগ্রামের পাহাড়, খাল ও প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের ওপর দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো ও স্থাপনা গড়ে ওঠার কারণে নগরীর স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে খালগুলো পুনরুদ্ধার ও সংস্কারের যে কাজ করা হচ্ছে, তা সহজ কোনো কাজ নয়। সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ এবং মাঠপর্যায়ে কঠোরভাবে কাজ করার কারণেই এসব কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
সিডিএ চেয়ারম্যান বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে বিভিন্ন খালের সংস্কার ও প্রশস্তকরণের কাজ এগিয়ে যাচ্ছে।তবে শুধু প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেই হবে না; কাজ শেষ হওয়ার পর এসব খাল নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
তিনি বলেন, সম্প্রতি জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও প্রকল্পের ধারাবাহিকতা ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা হয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসনের চলমান কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে আরও কয়েকটি প্রকল্প গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে। এর মধ্যে একটি পৃথক রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্প থাকা জরুরি। কারণ সংস্কার ও পুনরুদ্ধারের পর যদি খালগুলো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা না হয় এবং পুনরায় দখল, ময়লা-আবর্জনা ও ভরাট বন্ধ করা না যায়, তাহলে ইতোমধ্যে করা বিপুল কাজ ও বিনিয়োগের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না।
বেলায়েত হোসেন বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসন একটি চলমান প্রক্রিয়া। একবার খাল পরিষ্কার বা সংস্কার করেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। খালের প্রবাহ, ধারণক্ষমতা, সংযোগ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। একই সঙ্গে খাল দখল ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ ঠেকাতে কার্যকর নজরদারি রাখতে হবে।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে সমন্বয় আরও বাড়াতে হবে। সিডিএ, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, চট্টগ্রাম ওয়াসাসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। তাহলেই চলমান প্রকল্পগুলোর সুফল দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা সম্ভব হবে।
সভায় আরো বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম মো. জানে আলম, অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার নুসরাত সুলতানা, অতিরিক্ত পুুলিশ কমিশনার হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূইয়া, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের পরিচালক কর্ণেল তারিকসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা। মতবিনিময় সভায় চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান বিভিন্ন প্রকল্পের অগ্রগতি, খাল ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা, পানি নিষ্কাশনের প্রতিবন্ধকতা, খাল দখল ও ভরাট, রেগুলেটর ব্যবস্থাপনা এবং প্রকল্প-পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিরা তাদের নিজ নিজ কার্যক্রম ও সমস্যার কথা তুলে ধরেন।





