নলডাঙ্গা ইব্রাহিম বিদ্যালয়ে অনিয়ম চরমে: বাইরের প্রশ্নে পরীক্ষা, প্রধান শিক্ষককে লাঞ্ছিত ও সভাপতির মনোনয়ন নিয়ে ধোঁয়াশা
মোঃ হামিদুজ্জামান জলিল, স্টাফ রিপোর্টার:
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার নলডাঙ্গা ইব্রাহিম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অনিয়ম, দুর্নীতি, একনায়কতন্ত্র এবং প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার এক নজিরবিহীন চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট নির্দেশনা ও প্রজ্ঞাপনকে সম্পূর্ণ বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিদ্যালয়টিতে নিজ শিক্ষকদের দিয়ে প্রশ্নপত্র তৈরি না করিয়ে সম্পূর্ণ গোপনে বাইরে থেকে প্রশ্ন এনে পরীক্ষা নেওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। এর চেয়েও বড় চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, প্রধান শিক্ষকের অনৈতিক নির্দেশ রক্ষায় ইংরেজি শিক্ষিকা নিজেই প্রকাশ্য জালিয়াতির কথা ফাঁস করে দিয়েছেন। পাশাপাশি প্রধান শিক্ষকের উগ্র ও স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ, প্রতিবাদী শিক্ষকদের সাথে হাতাহাতি ও প্রধান শিক্ষককে লাঞ্ছিতের মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে। সবচেয়ে বড় বিস্ময়ের বিষয় হলো, যে ব্যক্তি এই অনিয়ম ও দুর্নীতির সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছেন, সেই ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আব্বাস আলীর নিয়োগ ও অবস্থান নিয়েও তৈরি হয়েছে গভীর রহস্য ও ধোঁয়াশা। শিক্ষা আইনের তোয়াক্কা না করে ভুঁইফোড় কমিটি আর বন্ধুত্বের জোরে চলা এই অনিয়মের রাজত্বে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা পরিবেশ এখন ধ্বংসের মুখে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিজ বিদ্যালয়ের বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকদের মাধ্যমে গোপনীয়তা রক্ষা করে মানসম্মত প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করতে হবে। অথচ নলডাঙ্গা ইব্রাহিম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক স্বপন কুমার বিশ্বাস দীর্ঘদিন ধরে এই নিয়মকে ধূলিস্যাৎ করে আসছেন। তিনি কারও কোনো পরামর্শ বা নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে নিজের খেয়ালখুশিমতো সম্পূর্ণ গোপনে বাইরে থেকে প্রশ্ন এনে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নিচ্ছেন। বিদ্যালয়টির ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষিকা নাসিমা ফেরদৌস অকপটে স্বীকার করে বলেছেন, এই প্রশ্ন তিনি নিজে তৈরি করেননি; প্রধান শিক্ষক কোথা থেকে যেন প্রশ্নগুলো এনে পরীক্ষা নিয়েছেন তা তিনি জানেন না। উল্টো প্রধান শিক্ষক তাকে শিখিয়ে দিয়েছিলেন যে, সাংবাদিক বা কেউ যদি প্রশ্নপত্রের বিষয়ে যোগাযোগ করে, তবে যেন বলতে হবে প্রশ্নটি তিনিই নিজে তৈরি করেছেন। প্রশ্নপত্র ফাঁসের আশঙ্কা এবং শিক্ষার মান প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার চরম ঝুঁকির মধ্য দিয়ে এই জালিয়াতির পন্থায় পরীক্ষা নেওয়ায় অভিভাবক ও স্থানীয় মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে প্রধান শিক্ষক স্বপন কুমার বিশ্বাসের একক সিদ্ধান্তে বিদ্যালয় পরিচালনার কারণে প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে চাপা অসন্তোষ বিরাজ করছিল। তিনি কোনো নিয়মকানুনের ধার ধারেন না এবং বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ কোনো আর্থিক বা প্রশাসনিক বিষয়ের জন্যই শিক্ষকদের কাছে কোনো ধরনের জবাবদিহিতা করেন না। শিক্ষক ও স্টাফদের মতামত বা পরামর্শকে সবসময় অবমূল্যায়ন করে তিনি একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে আসছেন। তার এই স্বৈরতান্ত্রিক ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের প্রতিবাদ করায় সম্প্রতি সাধারণ শিক্ষকদের সাথে প্রধান শিক্ষকের তীব্র বাকবিতণ্ডা বাধে। পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হলে ক্ষুব্ধ শিক্ষকদের সাথে প্রধান শিক্ষকের হাতাহাতি এবং তাকে লাঞ্ছিত করার মতো অপ্রীতিকর ও অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে, যা বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পরিবেশকে চরমভাবে কলুষিত করেছে।
প্রতিষ্ঠানের এই ভঙ্গুর অবস্থার পেছনে ম্যানেজিং কমিটির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিদ্যালয়টির পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি আব্বাস আলীর মনোনয়ন ও তার বর্তমান অবস্থান নিয়ে এলাকায় শুরু হয়েছে নানা গুঞ্জন ও সমালোচনার ঝড়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সভাপতি আব্বাস আলী ঝিনাইদহ থাকেন না; তিনি খুলনার একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় (এনজিও) ফুলটাইম চাকরি করেন এবং সপরিবারে খুলনায় অবস্থান করেন। ঝিনাইদহের একটি মফস্বল এলাকার ইউনিয়ন পর্যায়ে অবস্থিত একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি কীভাবে একজন খুলনা প্রবাসী ও নিয়মিত কর্মজীবী ব্যক্তি হন, তা নিয়ে হতবাক স্থানীয় সচেতন মহল। অনুসন্ধানে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে যে, সভাপতি আব্বাস আলী ও প্রধান শিক্ষক স্বপন কুমার বিশ্বাস সম্পর্কে অত্যন্ত ঘনিষ্ট বন্ধু। এই বন্ধুত্বের সুযোগ নিয়ে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যাবতীয় নিয়ম-নীতি ও ম্যানেজিং কমিটি গঠনের নীতিমালাকে পাশ কাটিয়ে আব্বাস আলীকে সভাপতি বানিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মূলত ম্যানেজিং কমিটির এই দুর্বল ও বিতর্কিত অবস্থানের সুযোগ নিয়েই প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ে নিজের খুশিমতো রাজত্ব চালিয়ে যাচ্ছেন।
এদিকে দায়িত্বশীল পদে থেকে এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি প্রধান শিক্ষক স্বপন কুমার বিশ্বাস। উল্টো তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে চরম উগ্র, অসৌজন্যমূলক ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেন। একজন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানের মুখ থেকে এ ধরনের আক্রমণাত্মক ও অপেশাদার ভাষা বের হওয়ায় স্থানীয় সাংবাদিকদের মাঝেও তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়েছে।
বিদ্যালয়ে চলমান এই ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা, বাইরের প্রশ্ন দিয়ে পরীক্ষা নেওয়ার অনিয়ম, শিক্ষিকাকে দিয়ে মিথ্যা বলানোর জালিয়াতি এবং সভাপতির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর নলডাঙ্গা ইব্রাহিম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আব্বাস আলীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি দায়সারাগোছের মন্তব্য করে বলেন, সাংবাদিকরা এসেছেন, বিষয়টি তদন্ত করে দেখেন। আমরা কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নই। প্রধান শিক্ষক যদি আইন অমান্য করে থাকেন, তবে আমি তার বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করব। তবে খুলনায় বসে ঝিনাইদহের একটি স্কুলের সভাপতি হয়ে কীভাবে তিনি এই দায় এড়াতে পারেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এলাকাবাসী।
অন্যদিকে এ বিষয়ে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার লুৎফর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। তিনি দ্রুত সশরীরে বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করে ঘটনার সত্যতা যাচাইপূর্বক কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাকে পদদলित করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অরাজকতা, অনিয়ম এবং বন্ধুত্বের জোরে ভুঁইফোড় কমিটি টিকিয়ে রাখার অপচেষ্টার বিরুদ্ধে অবিলম্বে নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্তপূর্বক কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার জোরালো দাবি জানিয়েছেন এলাকার সচেতন মহল, ক্ষুব্ধ শিক্ষকসমাজ ও উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা।





