সাতক্ষীরায় ৬১২ মন্ডপে দূর্গাপূজা উপলক্ষে ৩৬৭ মেট্রিকটন চাল বিতরণ
মোঃ খলিলুর রহমান, সাতক্ষীরা ::
সনাতন হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা আর পূজা উপলক্ষে সাতক্ষীরা জেলা জুড়ে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ।
সার্বিক নিরাপত্তার নিশ্চিত করতে সিসি ক্যামেরা ও নজরদারী বাড়ানোর পাশাপাশি কয়েক স্তর বিশিষ্ট নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা হয়েছে বলে জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে, উৎসব মূখর পরিবেশে দূর্গাপূজা উদযাপনের লক্ষ্যে সরকারের পক্ষ থেকে জেলায় ৩৬৭ দশমিক ২ মেট্রিকটন চাল বিতরণ করা হয়েছে।
জেলা ত্রাণ ও পুর্নবাসন কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দীন জানান, জেলার ৬১২টি পূজামন্ডপে মোট ৩৬৭ দশমিক ২ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। এরমধ্যে প্রতিটি পূজামন্ডপের জন্য ছয়শ’ কেজি করে চাল বরাদ্দ করা হয়েছে।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এবার সাতক্ষীরার সাতটি উপজেলায় ৬১২টি মন্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় ১১১টি, তালায় ২০২টি, কলারোয়ায় ৪৬টি, দেবহাটায় ২১টি, আশাশুনিতে ১০৬টি, কালীগঞ্জে ৫৫টি এবং শ্যামনগরে ৭১টি পূজামন্ডপ রয়েছে।
জেলায় এবার ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি প্রতিমা নির্মাণে ব্যতিক্রমী উপকরণ, পৌরাণিক কাহিনির দৃশ্যায়ন এবং আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর মন্ডপসজ্জায় থাকছে নানা চমক। কোথাও মুক্তা, কোথাও মুগডাল, কোথাও পাট, কোথাও তিল, আবার কোথাও কর্ণফুলী টানেলের আদলে তৈরি প্রতিমা দর্শনের আয়োজন করা হয়েছে।
জেলার নান্দনিক প্রতিমাগুলোর মধ্যে রয়েছে আশাশুনি উপজেলার বড়দল ইউনিয়নের বুড়িয়া সার্বজনীন দুর্গামন্দিরে প্রায় ৩৫ হাজার মুক্তার কারুকাজে সাজানো ১৩টি প্রতিমা। শিল্পী প্রকাশ মন্ডল ও তাঁর সহযোগীদের কয়েক মাসের পরিশ্রমে তৈরি হয়েছে এই নান্দনিক সাজ। এতে ব্যয় হয়েছে চারলাখ টাকার বেশি। মুক্তার ব্যবহার প্রতিমাগুলোকে দিয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। রয়েছে বিশেষ আলোক সজ্জা।
একই উপজেলার বুধহাটা কাছারিপাড়া পূজামন্ডপে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ কেজি মুগডাল দিয়ে তৈরি করা হয়েছে দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের প্রতিমা। প্রতিটি মুগডাল যত্নসহকারে বসিয়ে দেবদেবীর অবয়ব ফুটিয়ে তুলতে শিল্পীদের প্রায় ১৫ দিন সময় লেগেছে। প্রচলিত উপকরণের বাইরে গিয়ে খাদ্যশস্য দিয়ে প্রতিমা তৈরির এ উদ্যোগ স্থানীয়দের মধ্যে কৌতূহল সৃষ্টি করেছে।
জেলার পাটকেলঘাটা পূজামন্ডপে বাংলার ঐতিহ্য তুলে ধরতে পাট ও পাটজাত উপকরণ ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেখানে পাটের আঁশ দিয়ে মন্ডপসজ্জায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বাংলার সোনালি আঁশের ঐতিহ্য। পাশাপাশি প্রতিমার সাজে ব্যবহার করা হচ্ছে রেশমি সুতা ও অন্যান্য উপকরণ।
কলারোয়ার মুরারীকাটি পালপাড়ার মন্ডপে ১৬টি প্রতিমা সাদা তিল দিয়ে সাজানো হয়েছে। প্রায় ২৫ কেজি তিল ব্যবহার করে চারজন শিল্পী ১৫ দিনে এ কাজ সম্পন্ন করেছেন। একই এলাকায় অন্য একটি মন্ডপে চুমকি দিয়ে প্রতিমার পোশাক ও অলংকারে আনা হয়েছে ঝলমলে নকশা। সেখানেও প্রায় ১২ কেজি চুমকি ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
কালীগঞ্জ উপজেলার অমিয়ান বাথুয়াডাঙ্গা সার্বজনীন দুর্গাপূজা মন্ডপে ককশিট বা সৌর ফোমশিট দিয়ে তৈরি প্রতিমার পাশাপাশি থাকছে ভাসমান সেতু ও বিশেষ আলোকসজ্জা। অষ্টমী, নবমী ও দশমীর রাতে ডিজিটাল আলোক প্রদর্শনীর পরিকল্পনাও রয়েছে। এ পুরো আয়োজনের বাজেট প্রায় দশলাখ টাকা।
শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের আড়পাঙ্গাশিয়া রাসমন্দির প্রাঙ্গণে কর্ণফুলী টানেলের আদলে তৈরি করা হয়েছে একটি পথ। সেপথ দিয়ে দর্শনার্থীরা প্রতিমা দর্শন করতে পারবেন। প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে এমন অভিজ্ঞতা দিতে আয়োজকেরা বিশেষভাবে প্রস্তুতি নিয়েছেন। একই উপজেলার দক্ষিণ বড়কুপট নদীরপাড় দুর্গামন্দিরে নির্মাণ করা হয়েছে প্রায় ২৫ ফুট উচ্চতার বিশাল দুর্গাপ্রতিমা। মাটি ও ফাইবারের সমন্বয়ে তৈরি প্রতিমার পাশাপাশি পৌরাণিক কাহিনি নির্ভর দৃশ্যপটে তুলে ধরা হয়েছে।
এছাড়া, সাতক্ষীরা শহরের কেন্দ্রীয় মন্দির ‘মায়ের বাড়ি’তে শতাধিক প্রতিমার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে পৌরাণিক যুগের বিভিন্ন দেব-দেবীর লীলা ও কাহিনি। দেবদেবীর নানা রূপ ও পৌরাণিক ঘটনাবলির শৈল্পিক উপস্থাপনায় মন্দির প্রাঙ্গণে তৈরি হয়েছে ভিন্নধর্মী আবহ।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বিশ্বনাথ ঘোষ বলেন, এবার সাতক্ষীরায় ৬১২টি মন্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তিনি সব মন্ডপের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পবিত্রতা ও শৃঙ্খলা বজায় রেখে দুর্গাপূজা উদযাপনের অনুরোধ জানান। উৎসব আয়োজনে সর্বাত্মক সহযোগিতার জন্য তিনি জেলা প্রশাসন ও পুলিশের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার আবু সালেহ মো. আশরাফুল আলম জানান, দুর্গাপূজা নির্বিঘ্নে করতে পুলিশের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। নিরাপত্তার নিশ্চিত করতে সিসি ক্যামেরা ও নজরদারী বাড়ানোর পাশাপাশি কয়েক স্তর বিশিষ্ট নিরাপত্তাবলায় গড়ে তোলা হয়েছে। জেলা পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের উপস্থিতির পাশাপাশি যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকছে। উৎসব শান্তিপূর্ণ রাখতে তিনি সবার সহযোগিতা কামনা করেন।





