শিক্ষাঙ্গন

দুই নারী শিক্ষিকার সনদের তথ্য বিকৃতির অভিযোগ, প্রশাসনের নোটিশেও হাজির হননি মাদ্রাসা সুপার

 

জাহিদুল ইসলাম (জাহিদ) স্টাফ রিপোর্টার।

জয়পুরহাট সদর উপজেলার পুরানাপৈল হাতিগাড়া ডি.এস.এম. দাখিল মাদ্রাসায় দুই নারী শিক্ষিকার এনটিআরসিএর নিবন্ধন সনদের তথ্য পরিবর্তন করে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে মাদ্রাসার সুপার মো. হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, একজন শিক্ষিকার নিবন্ধন নম্বর ও রোল নম্বরের অঙ্ক পরিবর্তন করা হয়েছে। অন্যজনের নামের বানানও পরিবর্তন করে পাঠানো হয়েছে। এতে চাকরিসংক্রান্ত জটিলতা ও অনিশ্চয়তায় পড়েছেন দুই শিক্ষিকা। প্রতিকার চেয়ে জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন তাঁরা।

অভিযোগ আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সুপারকে সরাসরি উপস্থিত হয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য নোটিশ করলেও তিনি হাজির হননি বলে দাবি ভুক্তভোগীদের। এদিকে মাদ্রাসার কম্পিউটারে সংরক্ষিত ফরওয়ার্ডিং ফাইল সরিয়ে ফেলার অভিযোগ, দায়িত্বশীলদের বক্তব্য দিতে অনীহা এবং তথ্য জানতে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে অসদাচরণের ঘটনাও সামনে এসেছে। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির নথি ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন মাদ্রাসার সুপার মো. হাবিবুর রহমান। নথিপত্র ও ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইংরেজি বিষয়ের সহকারী শিক্ষক সাথী পারভীনের মূল এনটিআরসিএ নিবন্ধন সনদের রেজিস্ট্রেশন নম্বর ১৩২০১৬০০৮৭৫৫। কিন্তু মাদ্রাসা থেকে পাঠানো ফরওয়ার্ডিংয়ে নম্বরটির শেষের ৫৫ বাদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। একই সঙ্গে তাঁর মূল রোল নম্বর ৩০২০০৫৩১-এর পরিবর্তে ৩০২৪০৫৩১ উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে জীববিজ্ঞান বিষয়ের সহকারী শিক্ষক মায়িশা ফারজানার নাম পরিবর্তন করে ফরওয়ার্ডিংয়ে ‘শায়িশা ফারজানা’ লেখা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।

ভুক্তভোগীদের দাবি, ২০২৬ সালের ২২ জানুয়ারি সুপারের পাঠানো ফরওয়ার্ডিংয়ে এসব অসংগতি পাওয়া যায়। তাঁদের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ চাকরিসংক্রান্ত নথি পাঠানোর আগে তাঁদের অবগত করা হয়নি। এমনকি চূড়ান্ত ফরওয়ার্ডিং যাচাই করার সুযোগও দেওয়া হয়নি। বিষয়টি জানার পর তাঁরা সংশোধনের দাবি জানালেও তা যথাযথভাবে আমলে নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তাঁদের।

সাথী পারভীনের অভিযোগ, তাঁর মূল সনদের তথ্যের সঙ্গে ফরওয়ার্ডিংয়ের তথ্যের অসংগতি রয়েছে। বিষয়টি জানার পরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাঁর দাবি, ভুলগুলো নিছক অসাবধানতা নয়; বরং জেনে-বুঝে তাঁদের ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে করা হয়ে থাকতে পারে।

অন্য ভুক্তভোগী মায়িশা ফারজানাও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, মাদ্রাসার ১৫ জন শিক্ষকের মধ্যে শুধু তাঁদের দুজনের নাম, রোল ও রেজিস্ট্রেশন নম্বরে অসংগতি দেখা গেছে। অথচ ফরওয়ার্ডিং পাঠানোর আগে তাঁদের কিছুই জানানো হয়নি।

প্রতিকার না পেয়ে দুই শিক্ষিকা জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। তাঁদের দাবি, অভিযোগের পর সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ সুপারকে সরাসরি উপস্থিত হয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য নোটিশ পাঠায়। তবে নোটিশ পাওয়ার পরও তিনি উপস্থিত হননি বলে অভিযোগ করেছেন তাঁরা।

এদিকে ফরওয়ার্ডিংয়ের সংশোধিত কপি জমা দেওয়ার তারিখ ও নথির তারিখ নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, ২৬ অক্টোবর তাঁরা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) বরাবর সংশোধিত ফরওয়ার্ডিংয়ের কপি জমা দেন এবং ২৯ অক্টোবর সেটি সাবমিট করেন। কিন্তু তাঁদের অভিযোগ, সুপার হাবিবুর রহমান সংশোধিত কপিতে ১২ অক্টোবর তারিখ উল্লেখ করে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে পাঠিয়েছেন। এতে নথির প্রকৃত জমাদানের সময় ও উল্লেখিত তারিখের মধ্যে অসংগতি তৈরি হয়েছে বলে তাঁদের দাবি। বিষয়টি নথি যাচাই করে তদন্তের দাবি রাখে।

অন্যদিকে, মাদ্রাসার কম্পিউটারে সংরক্ষিত ফরওয়ার্ডিংয়ের ফাইল খুঁজে পাওয়ার পর কয়েক দিনের মধ্যে সেটি আর পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষিকারা। তাঁদের প্রশ্ন, গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কাজে ব্যবহৃত নথির ফাইল কম্পিউটার থেকে কীভাবে সরানো হলো এবং এর দায় কার?

মাদ্রাসার আইসিটি শিক্ষক নুর আলম এ বিষয়ে ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে তিনি জানিয়েছেন, ফাইল ডিলিট করা হয়নি এবং ফরওয়ার্ডিং বাইরের কোনো দোকান থেকে তৈরি করা হয়েছে। যদিও ভুক্তভোগীদের দাবি, তাঁদের কাছে থাকা প্রায় এক মাস আগের ভিডিওতে ফরওয়ার্ডিংটি মাদ্রাসার কম্পিউটারে প্রস্তুত ও সংরক্ষণের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। ফলে ফাইলটি কোথায় তৈরি, কোথায় সংরক্ষিত এবং পরবর্তী সময়ে কী হয়েছে, তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

নথি পরিবর্তনের অভিযোগের বাইরেও মাদ্রাসার সহকারী মৌলভি শিহাব উদ্দিন, নিরাপত্তাকর্মী আরিফুল ইসলাম ও শারীরিক শিক্ষা শিক্ষক হাম্মাদ আলীর বিরুদ্ধে অনাকাঙ্ক্ষিত যোগাযোগ, অশালীন বার্তা ও অসদাচরণের অভিযোগ তুলেছেন দুই নারী শিক্ষিকা।

তাঁদের অভিযোগ, সহকারী মৌলভি শিহাব উদ্দিন ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করে তাঁদের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন। ব্যক্তিগত ফেসবুক মেসেঞ্জারে অপ্রাসঙ্গিক ছবি পাঠানোর অভিযোগও করেছেন তাঁরা। নিরাপত্তাকর্মী আরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধেও একাধিক অপ্রয়োজনীয় বার্তা পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে শারীরিক শিক্ষা শিক্ষক হাম্মাদ আলীর বিরুদ্ধে ফরওয়ার্ডিং সংশোধন ও পাঠানোর বিষয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করার অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।

এ বিষয়ে নিরাপত্তাকর্মী আরিফুল ইসলাম নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন বলে জানা গেছে। তাঁর সঙ্গে সাংবাদিকদের ফোনালাপেও বিষয়টি উঠে এসেছে।

মাদ্রাসার অবসরপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক রুহুল আমিন কাছেমি বলেন, সুপারের এমন সিদ্ধান্ত মোটেও কাম্য নয়। ফরওয়ার্ডিং প্রস্তুত এবং পাঠানোর আগে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বিষয়টি জানানো ও তাঁদের দিয়ে তথ্য যাচাই করানো উচিত ছিল। শিক্ষকদের নিজেদের তথ্য দেখার সুযোগ দেওয়া হলে এ ধরনের ভুল আগেই শনাক্ত করা সম্ভব হতো।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে সাংবাদিকরা সরাসরি মাদ্রাসায় গেলে সুপার মো. হাবিবুর রহমান প্রথমে কার্যালয় থেকে বেরিয়ে যান। প্রায় ৪০ মিনিট পর ফিরে এলেও সাংবাদিকদের প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেননি। তিনি জানান, এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য থাকলে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানাবেন। সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি যা ইচ্ছা লিখতে পারেন বলেও মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ সময় সহকারী মৌলভি শিহাব উদ্দিনের সঙ্গে সাংবাদিকদের কথোপকথনের একপর্যায়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। সাংবাদিকদের অভিযোগ, তিনি তাঁদের ওপর চড়াও হন এবং একজন সাংবাদিকের মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে ভিডিও ধারণের বিষয়টি দেখতে চান। এ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়।

পরবর্তীতে সুপার হাবিবুর রহমানের কাছে সংশোধিত ফরওয়ার্ডিংয়ে আগের তারিখ উল্লেখ করার অভিযোগের বিষয়ে ফোনে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, এ বিষয়ে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা সব জানেন। তবে অভিযোগের নির্দিষ্ট বিষয়গুলোতে তাঁর কাছ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

জেলা শিক্ষা অফিসের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিষয়টি নিয়ে সুপারের ভুলের বিষয়টি উঠে এসেছে। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) আযিযুল হাকিমের বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযোগ, নোটিশ এবং নথি সংশোধনের বিষয়গুলো যাচাই করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয় রয়েছে। তবে তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল ও দায় নির্ধারণের বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ১৫ জন শিক্ষকের মধ্যে দুই নারী শিক্ষিকার নাম, রোল ও নিবন্ধন নম্বরে কেন এমন অসংগতি দেখা গেল? সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের না জানিয়ে ফরওয়ার্ডিং পাঠানোর কারণ কী? প্রশাসনের নোটিশের পরও সুপার উপস্থিত না হওয়ার কারণ কী? আর মাদ্রাসার কম্পিউটারে সংরক্ষিত গুরুত্বপূর্ণ নথির ফাইল সরানোর অভিযোগেরই বা ব্যাখ্যা কী?

একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের চাকরিসংক্রান্ত সনদের তথ্য কোনো সাধারণ নথি নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তাঁদের পেশাগত পরিচয়, চাকরির নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ। সেখানে তথ্য পরিবর্তন, নথি ব্যবস্থাপনায় অসংগতি এবং অভিযোগের পর যথাযথ জবাবদিহি না থাকার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখার দাবি রাখে।

এ বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করে মূল সনদ, পাঠানো ফরওয়ার্ডিং, সংশোধিত কপি, জমাদানের তারিখ এবং কম্পিউটারে সংরক্ষিত ফাইলের তথ্য যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে দুই নারী শিক্ষিকার অভিযোগে উত্থাপিত অনাকাঙ্ক্ষিত যোগাযোগ ও অর্থ দাবির বিষয়গুলোও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।

অভিযোগের বিষয়ে মাদ্রাসার সুপার মো. হাবিবুর রহমান, সহকারী মৌলভি শিহাব উদ্দিন এবং শিক্ষক হাম্মাদ আলীর বক্তব্য জানতে চেষ্টা করা হলেও তাঁদের বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

Uncategorized শিক্ষাঙ্গন

নাজিরপুরে শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যজোটের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত

পিরোজপুর প্রতিনিধি :বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটি অন্যতম সদস্য, বাংলাদেশ শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যজোটের বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়ক ও কেন্দ্রীয় কমিটির প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যক্ষ
Uncategorized শিক্ষাঙ্গন সারাদেশ

পিরোজপুর ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের মতবিনিময়

পিরোজপুর প্রতিনিধি: ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যায়ের উপাচার্যের পিরোজপুরে আগমন উপলক্ষে সংবর্ধনা, আলোচনা ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।শনিবার (৩০ নভেম্বর) সকালে পিরোজপুর