সারাদেশ

সাতক্ষীরায় সরকারি বই কেজি দরে বিক্রি

মোঃ খলিলুর রহমান, সাতক্ষীরা ::

শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বিতরণের জন্য সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে ছাপানো পাঠ্যবই এবার কেজি দরে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলায়। মাধ্যমিক ও মাদরাসা পর্যায়ের বিপুল পরিমাণ নতুন বই মাত্র ৮ থেকে ১৪ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
গত বৃহস্পতিবার কলারোয়া উপজেলা পরিষদের কোয়ার্টারের সামনে থেকে দুটি ট্রাকে বিপুল পরিমাণ বই তোলা হচ্ছে। কয়েকজন শ্রমিক গুদামের ভেতর থেকে নতুন ও গাইড করা বই ট্রাকে তুলছিলেন। পাশে বসে বইয়ের হিসাব রাখছিলেন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের উচ্চমান সহকারী সমীরন।
অভিযোগের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বই ট্রাকে তোলার সময় সেগুলো ওজন করা হচ্ছিল না। ফলে ঠিক কত কেজি বই বিক্রি হয়েছে এবং সরকারি রাজস্ব হিসেবে কত টাকা আদায় হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বই কিনতে আসা ঢাকার রানা এন্টারপ্রাইজের মালিক রানা জানান, তিনি ইতোমধ্যে ৫০ হাজার টাকা অগ্রিম দিয়েছেন। লোড শেষ হওয়ার পর বাকি টাকা পরিশোধ করবেন। তার দাবি, কলারোয়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের সঙ্গে ১৪ টাকা কেজি দরে বই কেনার চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার পর তিনি বই নিতে এসেছেন। এ সময় তিনি শিক্ষা অফিসের দেওয়া একটি চিঠিও দেখান।
চিঠিতে নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা উপকরণের সমুদয় টাকা পরিশোধের কথা উল্লেখ থাকলেও ঘটনাস্থলে বই ওজন না করেই ট্রাকে তোলার দৃশ্য নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবছর শিক্ষার্থীর প্রকৃত সংখ্যার তুলনায় অতিরিক্ত বইয়ের চাহিদা দেখিয়ে বই সংগ্রহ করা হয়। বছরের শুরুতে অনেক শিক্ষার্থী বই না পেলেও পরবর্তীতে সেই অতিরিক্ত বই গুদামে পড়ে থাকে। পরে বছরের মাঝামাঝি সময়ে সেগুলো কেজি দরে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সচেতন মহলের প্রশ্ন—শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ করা বই যদি সত্যিই অতিরিক্ত হয়ে থাকে, তাহলে শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই কেন তা শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হলো না? আর বই নষ্ট হওয়ার অজুহাতে নতুন বই কেজি দরে বিক্রির সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক—সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অভিযোগ উঠেছে, অতিরিক্ত বইয়ের চাহিদা তৈরি থেকে শুরু করে পরবর্তীতে নামমাত্র মূল্যে বই বিক্রি পর্যন্ত কোনো অসাধু চক্র বা সিন্ডিকেট কাজ করছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে বের করা জরুরি।
বই বিক্রির বিষয়টি স্বীকার করে কলারোয়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জয়নাল আবেদিন বলেন, “বই নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। এ কারণে ১৮ টাকা কেজি দরে বই বিক্রি করা হয়েছে।”
তবে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার বক্তব্যে বিষয়টি নিয়ে তৈরি হয়েছে আরও বড় প্রশ্ন। সাতক্ষীরা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আলমগীর কবির বলেন, “এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। তবে সরকারি বই এভাবে বিক্রি করার বিধান নেই। বিক্রি করে থাকলে তদন্তপূর্বক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
একদিকে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পক্ষ থেকে বই বিক্রির বিষয়টি স্বীকার করা হচ্ছে, অন্যদিকে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বলছেন তিনি বিষয়টি জানেন না এবং সরকারি বই এভাবে বিক্রির বিধান নেই। ফলে বই বিক্রির অনুমোদন, নিলাম প্রক্রিয়া, মূল্য নির্ধারণ এবং সরকারি কোষাগারে অর্থ জমা দেওয়ার বিষয়গুলো এখন তদন্তের আওতায় আসা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কলারোয়া উপজেলায় একটি পৌরসভা ও ১২টি ইউনিয়নে মোট ৫০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং ৩১টি মাদরাসা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে মোট শিক্ষার্থী ১৭ হাজার ৬৮৫ জন।
সরকারি অর্থে ছাপানো বিনামূল্যের নতুন বই কীভাবে গুদাম থেকে কেজি দরে বিক্রির পর্যায়ে গেল—এ প্রশ্নের সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

সারাদেশ

মৌলভীবাজার জেলা ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক হলেন সাব্বির আহমেদ সামাদ

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: মৌলভীবাজার জেলা ছাত্রলীগের নতুন কমিটিতে প্রচার সম্পাদক পদে দায়িত্ব পেয়েছেন জেলার একনিষ্ঠ ও ত্যাগী ছাত্রনেতা সাব্বির আহমেদ সামাদ।
সারাদেশ

বদলে যাচ্ছে র‌্যাব: পরিবর্তন হচ্ছে নাম, লোগো ও পোশাক

নতুন রূপে আসছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। এ বাহিনীর নাম, লোগো ও পোশাক পরিবর্তনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়,