আলুর মাঠে পানি, কৃষকের চোখে দুশ্চিন্তা
জুয়েল ইসলাম, তারাগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি:
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলায় অসময়ে হওয়া ভারী বর্ষণে বিস্তীর্ণ আলুর ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের আলু চাষিরা বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কায় পড়েছেন। ইতোমধ্যেই অনেক জমিতে পানি জমে আলুর গাছ নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। কৃষকদের আশঙ্কা, জমিতে যদি আরও দুই থেকে তিন দিন পানি জমে থাকে, তবে আলু পচে গিয়ে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন তারা।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে উপজেলার নিচু এলাকার অনেক জমিতে পানি জমে গেছে। বিশেষ করে কুর্শা, আলমপুর, ইকরচালি ও হাড়িয়ারকুটি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের আলুর ক্ষেত পানিতে তলিয়ে রয়েছে। জমিতে পানি জমে থাকায় আলুর গাছ হলুদ হয়ে যাচ্ছে এবং অনেক ক্ষেতেই গাছ মরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
কুর্শা ইউনিয়নের রহিমাপুর চাকলা গ্রামের আলু চাষি তাপস রায় বলেন, “এবার এক একরের বেশি জমিতে আলু চাষ করেছি। হঠাৎ টানা বৃষ্টিতে পুরো জমি পানির নিচে চলে গেছে। এখন যদি দুই–তিন দিনের মধ্যে পানি না নামে, তাহলে আলু পচে যাবে। এত খরচ করে চাষ করেছি, সবই লোকসান হয়ে যাবে।”
একই ধরনের আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন আলমপুর ইউনিয়নের অনেক কৃষক। তারা বলেন, গত বছর আলুর দাম কম থাকায় বড় ধরনের লোকসান গুনতে হয়েছিল। চলতি মৌসুমে ফলন তুলনামূলক ভালো হলেও বাজারে আলুর দাম উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় অনেক কম হওয়ায় তারা আগে থেকেই দুশ্চিন্তায় ছিলেন। এর মধ্যে হঠাৎ বৃষ্টিতে ক্ষেত পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সেই দুশ্চিন্তা আরও বেড়ে গেছে।
ইকরচালি ইউনিয়নের চরকডাঙ্গা গ্রামের কৃষক লাল মিয়া বলেন, “প্রতি কেজি আলু উৎপাদন করতে খরচ পড়ে প্রায় ১৪ থেকে ১৬ টাকা। কিন্তু বাজারে এখন আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৭ থেকে ৮ টাকায়। তার ওপর আবার বৃষ্টিতে জমি ডুবে গেছে। এখন যদি আলু নষ্ট হয়, তাহলে আমাদের আর কিছুই থাকবে না।”

সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, অনেক ক্ষেতেই আলুর গাছ পানির নিচে ডুবে আছে। কোথাও কোথাও জমিতে হাঁটুসমান পানি জমে রয়েছে। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় অনেক কৃষক জমি থেকে পানি বের করতে হিমশিম খাচ্ছেন। কেউ কেউ নালা কেটে পানি সরানোর চেষ্টা করছেন, আবার অনেকেই বৃষ্টির পানি দ্রুত নেমে যাওয়ার অপেক্ষায় আছেন।
নারায়নজন গ্রামের কৃষক মুকুল কবির বলেন,
“এবার তিন বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছি। হঠাৎ বৃষ্টিতে পুরো জমি ডুবে গেছে। জমে থাকা পানি কীভাবে বের করবো সেটাই এখন বড় চিন্তা। যদি দুই–তিন দিন পানি থাকে, তাহলে আলু পচে যাবে। তখন সব পরিশ্রমই বৃথা যাবে।”
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, প্রতি বছরই তারা উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় কম দামে আলু বিক্রি করতে বাধ্য হন। পর্যাপ্ত হিমাগার না থাকায় অনেক সময় বাধ্য হয়ে মাঠ থেকেই কম দামে আলু বিক্রি করতে হয়। ফলে কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, গত বছর তারাগঞ্জ উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে মোট ৪ হাজার ৫৩০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ করা হয়েছিল। ওই মৌসুমে প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার ৯৫ মেট্রিক টন আলু উৎপাদিত হয়। কিন্তু উপজেলায় বিদ্যমান হিমাগারগুলোর মোট ধারণক্ষমতা মাত্র ১৬ হাজার টন হওয়ায় বিপুল পরিমাণ আলু সংরক্ষণের বাইরে থেকে যায়। ফলে কৃষকেরা বাধ্য হয়ে কম দামে আলু বিক্রি করেন।
কৃষি বিভাগ জানায়, গত বছরের লোকসানের কারণে চলতি মৌসুমে অনেক কৃষক আলুর আবাদ কমিয়ে দিয়েছেন। ফলে এবার উপজেলার মোট আবাদি জমি কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৪৬৩ হেক্টরে। তবুও বাজারদর উৎপাদন ব্যয়ের নিচে থাকায় কৃষকেরা নতুন করে সংকটে পড়েছেন।
আলমপুর ইউনিয়নের কৃষক মিলন মিয়া বলেন,
“বারবার লোকসান খেতে খেতে অনেক কৃষক এখন আলুর আবাদ ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন। যদি ন্যায্যমূল্য না পাই, তাহলে ভবিষ্যতে আর আলু চাষ করা সম্ভব হবে না।”

এদিকে কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আলুর ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারি উদ্যোগ বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত হিমাগার নির্মাণ এবং আলুভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত খাদ্যশিল্প গড়ে তোলা গেলে কৃষকেরা উৎপাদিত ফসল সংরক্ষণ ও বাজারজাত করতে পারবেন।
তারাগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ধীবা রানী রায় বলেন,
“আলু সংরক্ষণের জন্য হিমাগারের ধারণক্ষমতা বাড়ানো এবং আলুভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলা জরুরি। এতে কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং ভবিষ্যতে এমন সংকট কিছুটা হলেও কমবে।”
বর্তমান পরিস্থিতিতে কৃষকেরা আলুর ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণ, সরকারি পর্যায়ে সরাসরি আলু ক্রয়ব্যবস্থা চালু এবং নতুন হিমাগার নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, এ ধরনের পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে অনেক কৃষক আলুর আবাদ থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হবেন, যা দেশের আলু উৎপাদনের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।




