জাতীয় সারাদেশ

তারাগঞ্জে পাট প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ: কৃষক বঞ্চিত, সুবিধা ভোগী ঘনিষ্ঠজন

জুয়েল ইসলাম, তারাগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি:
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলায় পাট চাষিদের জন্য আয়োজিত প্রশিক্ষণ কর্মশালা ও সরকারি পাটবীজ বিতরণ কার্যক্রমে ব্যাপক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি এবং অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় কৃষক, জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহলের দাবি, সরকারের কৃষি উন্নয়ন কর্মসূচির সুবিধা প্রকৃত চাষিদের কাছে পৌঁছানোর পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পছন্দের ব্যক্তি, আত্মীয়স্বজন ও অপ্রাসঙ্গিক ব্যক্তিদের মধ্যে বণ্টন করা হয়েছে। ফলে উপজেলার প্রকৃত পাট চাষিরা বঞ্চিত হচ্ছেন সরকারি সহায়তা থেকে।
উপজেলা পাট কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি উন্নত জাতের পাট উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কৃষকদের আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতন করতে ৬০ জন চাষিকে নিয়ে একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করা হয়। কিন্তু প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের তালিকা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে পাট চাষের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত অধিকাংশ কৃষকের নাম তালিকায় স্থান পায়নি। বরং সেখানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠজন, আত্মীয়স্বজন ও এমন অনেক ব্যক্তিকে, যাদের পাট চাষের সঙ্গে কোনো সম্পর্কই নেই।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কৃষক জানান, বছরের পর বছর পাট চাষ করেও তারা কখনো কোনো প্রশিক্ষণের সুযোগ পাননি। অথচ যারা পাট চাষ করেন না, তারাই নিয়মিতভাবে সরকারি বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করছেন।
একজন ক্ষুব্ধ কৃষক বলেন,
“আমরা মাঠে পাট চাষ করে দিন-রাত পরিশ্রম করি। কিন্তু প্রশিক্ষণের খবরই পাই না। পরে শুনি তালিকায় এমন লোকের নাম আছে, যারা কখনো পাটের জমিতে যায়নি। আমরা করি পাটের চাষ, আর ট্রেনিং করে ভেড়ার খামারিরা।”
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মধ্যেও এ নিয়ে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এক ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য অভিযোগ করে বলেন,
“উপজেলা পাট কর্মকর্তাকে হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া এলাকার কৃষকেরা চেনেনই না। তিনি নিজের পরিচিত ও আত্মীয়স্বজন ছাড়া প্রকৃত কোনো চাষি তৈরি করেননি। আমরা জনপ্রতিনিধি হয়েও প্রকৃত কৃষকদের নাম সুপারিশ করে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারি না। সবকিছুই নির্ধারণ করা হয় ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ছিল উন্নত প্রযুক্তি ও আধুনিক পদ্ধতি সম্পর্কে পাট চাষিদের দক্ষ করে তোলা। কিন্তু অনিয়মের কারণে প্রকৃত কৃষকরা সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এতে সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শুধু প্রশিক্ষণ কার্যক্রমেই নয়, সরকারি পাটবীজ বিতরণেও অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। কৃষকদের দাবি, পাট বপনের উপযুক্ত সময় পেরিয়ে যাওয়ার অনেক পরে বীজ বিতরণ করা হয়েছে। ফলে ওই বীজ ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে আঁশ উৎপাদনের সুযোগ আর ছিল না।
একাধিক কৃষক জানান, মৌসুম শেষ হওয়ার পর হাতে পাওয়া বীজ দিয়ে এখন আর পাট উৎপাদন সম্ভব নয়। অনেকেই বাধ্য হয়ে সেই বীজ শাক হিসেবে খাওয়ার জন্য বপন করছেন। আবার কেউ কেউ প্যাকেটবন্দী অবস্থায় ঘরে সংরক্ষণ করে রেখেছেন।
স্থানীয় কৃষকদের মতে, সময়মতো বীজ সরবরাহ করা হলে উৎপাদন বাড়ত এবং সরকার ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সহজ হতো। কিন্তু প্রশাসনিক গাফিলতি ও দায়িত্বহীনতার কারণে কৃষকেরা প্রত্যাশিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে তারাগঞ্জ উপজেলা পাট কর্মকর্তা নোমানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। ফলে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
এদিকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোনাববর হোসেন। তিনি বলেন,
“পাট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ শুনেছি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
স্থানীয় কৃষক ও সচেতন মহল মনে করছেন, কৃষি খাতে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি সফল করতে হলে প্রকৃত উপকারভোগীদের নির্বাচন, প্রশিক্ষণ ও উপকরণ বিতরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কৃষকের উন্নয়ন সম্ভব হবে না। একই সঙ্গে তারা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভবিষ্যতে প্রকৃত কৃষকদের অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

সারাদেশ

মৌলভীবাজার জেলা ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক হলেন সাব্বির আহমেদ সামাদ

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: মৌলভীবাজার জেলা ছাত্রলীগের নতুন কমিটিতে প্রচার সম্পাদক পদে দায়িত্ব পেয়েছেন জেলার একনিষ্ঠ ও ত্যাগী ছাত্রনেতা সাব্বির আহমেদ সামাদ।
সারাদেশ

বদলে যাচ্ছে র‌্যাব: পরিবর্তন হচ্ছে নাম, লোগো ও পোশাক

নতুন রূপে আসছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। এ বাহিনীর নাম, লোগো ও পোশাক পরিবর্তনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়,