ফুলের অঞ্জলি নয়, প্রতিবাদের ভাষা ‘রক্তাঞ্জলি’
চট্টগ্রামে দুর্গাপূজার মণ্ডপে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে ব্যতিক্রমী আয়োজন
চট্টগ্রাম : দেবী দুর্গার চরণে ফুল দিয়ে অঞ্জলি নিবেদন—সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি ভক্তি ও আরাধনার চিরচেনা অনুষঙ্গ। তবে এবার সেই চিরাচরিত ভাবনাকে প্রতিবাদের ভাষায় রূপ দিচ্ছেন চট্টগ্রাম নগরের খলিফাপট্টির দুর্গাপূজার আয়োজকেরা। নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, নিপীড়ন এবং হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে তাঁদের এবারের পূজার প্রতিপাদ্য ‘রক্তাঞ্জলি’।
এই থিমে ফুলের অঞ্জলির পরিবর্তে নির্যাতনকারীদের রক্তের প্রতীকী ধারণা তুলে ধরা হচ্ছে। আয়োজকদের ভাষায়, এটি বাস্তব সহিংসতার আহ্বান নয়; বরং নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি।
সাম্প্রতিক সময়ে নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতার বিভিন্ন ঘটনায় উদ্বেগ ও ক্ষোভ বাড়ছে। ঘরে-বাইরে নারীর নিরাপত্তা, শিশুদের সুরক্ষা এবং নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন। এমন বাস্তবতায় পূজামণ্ডপকে শুধু ধর্মীয় আরাধনার স্থান হিসেবে নয়, সামাজিক বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার একটি মাধ্যম হিসেবেও তুলে ধরতে চাইছেন আয়োজকেরা।
খলিফাপট্টির পূজামণ্ডপে শিল্পের ভাষায় ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার নির্মম চিত্র। পাশাপাশি দেয়ালে দেয়ালে স্থান পাচ্ছে প্রতিবাদী স্লোগান, সংবাদপত্রে প্রকাশিত নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের খবর এবং নির্যাতনের শিকার শিশুদের ছবি। পুরো আয়োজনের মধ্য দিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
দেয়ালে দেয়ালে নির্যাতনের চিত্র, স্লোগানে প্রতিবাদ
মণ্ডপের প্রবেশপথের এক পাশে টাঙানো হয়েছে দৈনিক পত্রিকা। সেগুলোর ওপর আঁকা বিভিন্ন প্রতীকী চিত্রে তুলে ধরা হয়েছে নারী ও শিশুর প্রতি নৃশংসতার ঘটনা এবং এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের প্রতিকৃতি। অন্যদিকে, নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের যন্ত্রণাবিধুর মুখও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে চিত্রকর্মে।
প্রবেশপথের অন্য পাশে সাদা কাপড়ে লাল কালিতে আঁকা হয়েছে নানা ছবি। সঙ্গে রয়েছে প্রতিবাদী স্লোগান। ফাঁকে ফাঁকে স্থান পেয়েছে জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ধর্ষণ, নির্যাতন, নিপীড়ন ও হত্যাকাণ্ডের খবরের প্রতিচিত্র।
মণ্ডপের ভেতরে প্রবেশ করে ওপরে তাকালে চোখে পড়ে নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে প্রাণ হারানো শিশুদের ছবি। ছবিগুলোর সঙ্গে রয়েছে হৃদয়স্পর্শী নানা স্লোগান। এর মধ্যে রয়েছে—‘নূপুরের শব্দে যে ঘর ছিল মুখরিত, আজ কেন সেই ঘর ভীতিতে শঙ্কিত?’ আরেকটি স্লোগানে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, ‘আমার বোন, আমার শিশু থাকবে কেন ভয়ে?’
এসব চিত্র ও স্লোগানের মধ্য দিয়ে নারীর নিরাপত্তাহীনতা, শিশুদের ওপর সহিংসতা এবং বিচারহীনতার বিরুদ্ধে মানুষের বিবেককে নাড়া দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
দেবী দুর্গার শক্তিতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে জাগরণের আহ্বান
খলিফাপট্টি সার্বজনীন পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি সৈকত চৌধুরী বলেন, ফুল দিয়ে দেবীর পায়ে অঞ্জলি দেওয়ার প্রচলিত ভাবনার পরিবর্তে ‘রক্তাঞ্জলি’ থিমে অত্যাচারীদের রক্তের প্রতীকী ধারণা সামনে আনা হয়েছে। এর মাধ্যমে তাঁরা বোঝাতে চান, সমাজকে কলুষমুক্ত করতে হলে নারী ও শিশুর ওপর নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
আয়োজকদের মতে, দেবী দুর্গা অশুভ শক্তির বিনাশ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীক। সেই প্রতীকী শক্তিকে সামনে রেখে নারীদের প্রতি সহিংসতা বন্ধ, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার বার্তা দিতে চান তাঁরা। দেবী দুর্গা যেমন অসুরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীক, তেমনি সমাজের অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বানও রয়েছে এই আয়োজনে।
চট্টগ্রামে দুর্গাপূজার মণ্ডপে সামাজিক অন্যায় ও নির্যাতনের প্রতিবাদ তুলে ধরার নজির আগেও দেখা গেছে। ২০১৫ সালে নগরের পাথরঘাটার ঐতিহ্যবাহী পাঁচবাড়ি পূজামণ্ডপে সংখ্যালঘু ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হয়েছিল।
এবার খলিফাপট্টির ‘রক্তাঞ্জলি’ থিমেও ধর্মীয় আয়োজনের পাশাপাশি উঠে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বার্তা—নারী ও শিশুর জন্য নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলা এবং নির্যাতনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা।





