বিদায় নিলেন আলোচিত অধ্যক্ষ শওকত আলম – স্বস্তি ফিরেছে শিক্ষার্থীদের
প্রতিনিধি
জামালপুর
জামালপুরের ঐতিহ্যবাহী সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চায় দীর্ঘদিনের গৌরবময় ইতিহাস রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নানা অভিযোগ ও বিতর্কে বারবার আলোচনায় আসে কলেজ প্রশাসন।
ভর্তি ফি, আবাসিক হলের ফি বৃদ্ধি, এইচএসসি পরীক্ষায় ভুল প্রশ্নপত্র বিতরণ এবং শিক্ষার্থীদের দেওয়া কলেজের সম্পদ ব্যক্তিগত ব্যবহারের অভিযোগ – একের পর এক ঘটনায় প্রশ্নের মুখে পড়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা।
এসব ঘটনার পর শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তৈরি হয় উদ্বেগ ও অসন্তোষ। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যও রয়েছে। ফলে প্রতিটি ঘটনা নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ও যথাযথ প্রশাসনিক পদক্ষেপের দাবি ছিল দীর্ঘদিনের।
কলেজের নিজস্ব ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, প্রফেসর মো. শওকত আলম মীর ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক (পাস) ও সার্টিফিকেট কোর্সের ভর্তি ফি নিয়ে বাড়তি টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ছিল, আগের বছরের তুলনায় ভর্তি ব্যয় বেড়েছে এবং সেশন চার্জের খাতভিত্তিক ব্যাখ্যাও স্পষ্ট নয়। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে কলেজ কর্তৃপক্ষ জানায়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত ব্যয় বৃদ্ধি, সেশন সংক্রান্ত খরচ এবং কলেজের বেসরকারি কর্মচারীদের বেতনসহ বিভিন্ন ব্যয়ের কারণে ভর্তি ফি সমন্বয় করা হয়েছে।
এরপর আবাসিক হলের ফি বৃদ্ধি নিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রশাসনের বিরোধ প্রকাশ্যে আসে। ২৫ জুনের এক বৈঠকে বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিলের নামে অতিরিক্ত এক হাজার টাকা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে শিক্ষার্থীরা আপত্তি জানান।
এ সময় অধ্যক্ষ শিক্ষার্থীদের ‘শেয়াল’ বলে মন্তব্য করেছেন – এমন অভিযোগও ওঠে।
তবে অধ্যক্ষ শওকত আলম মীর এ অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আশ্বাস দেন। এরপর আসে আরও গুরুতর ঘটনা – ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় ভুল প্রশ্নপত্র বিতরণ। ৪ জুলাই বাংলা দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষায় নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের একটি কক্ষে ২০২৫ সালের সিলেবাসের প্রশ্নপত্র বিতরণ করা হয়। এতে প্রায় একশ পরীক্ষার্থী বিপাকে পড়েন।
ঘটনাটি তদন্ত করে ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড। তদন্তে কলেজ কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কথা উল্লেখ করে পরীক্ষা পরিচালনা কমিটি বাতিল এবং অধ্যক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।
অধ্যক্ষের বক্তব্য ছিল, প্রশ্নপত্রের বান্ডিলের বাইরে ২০২৬ সালের প্রশ্নপত্র লেখা থাকলেও ভেতরে ভুলবশত ২০২৫ সালের প্রশ্ন চলে আসে।
পরে বোর্ডের নির্দেশনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরীক্ষার্থীদের উত্তরপত্র আলাদাভাবে মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়।
সবশেষে ২৫ আগস্ট সামনে আসে কলেজের গণিত বিভাগের শিক্ষার্থীদের দেওয়া একটি মিনি ফ্রিজ বিভাগীয় প্রধানের বাসায় ব্যবহারের অভিযোগ। প্রায় এক বছর আগে শিক্ষার্থীরা ফ্রিজটি গণিত বিভাগকে উপহার দিয়েছিলেন বলে জানা যায়।
পরে বিভাগীয় প্রধানের বাসার ফ্রিজ নষ্ট হওয়ায় সেটি বাসায় নিয়ে ব্যবহার করা হয় – এমন অভিযোগ ওঠে।
বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হলে অধ্যক্ষ জানান, ফ্রিজটি বাসায় নেওয়ার বিষয়টি তাঁর আগে জানা ছিল না। তবে কলেজের সম্পদ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা ঠিক হয়নি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
একের পর এক এসব ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে – একটি ঐতিহ্যবাহী সরকারি কলেজের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে?
তবে অভিযোগ মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও প্রশাসনিক ব্যাখ্যাও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে অভিযোগগুলোও যেন তদন্তের বাইরে না থাকে, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা – অভিযোগ, বিতর্ক কিংবা প্রশাসনিক অনিয়ম নয়; সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ আবারও ফিরে যাক তার গৌরবময় শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার পরিবেশে।
স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দায়িত্বশীল প্রশাসনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ফিরে আসুক পূর্ণ আস্থা। অভিযোগের অধ্যায় পেরিয়ে এখন নতুন প্রত্যাশা – অভিশাপমুক্ত হোক সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ, স্বস্তি ফিরুক শিক্ষার্থীদের মাঝে।।




