রঙিন প্যাকেটে মানহীন সেমাই, বিপাকে ক্রেতারা
“রঙিন প্যাকেটে মানহীন সেমাই, বিপাকে ক্রেতারা”
জুয়েল ইসলাম, তারাগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি:
পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন বাজারে নিম্নমানের লাচ্ছা সেমাইয়ে সয়লাব হয়ে উঠেছে বাজার। আকর্ষণীয় ও চকচকে মোড়কে এসব সেমাই বিক্রি হলেও এর গুণগত মান, উৎপাদন প্রক্রিয়া ও নিরাপত্তা নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। অভিযোগ উঠেছে, অনেক ক্ষেত্রেই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি এসব সেমাই উচ্চমূল্যে বিক্রি করে প্রতারণার শিকার করা হচ্ছে সাধারণ ক্রেতাদের।
স্থানীয় বাজারগুলো ঘুরে দেখা যায়, তারাগঞ্জ বাজার, কুর্শা বাজার, হাড়িয়ারকুঠি বাজার ও ইকরচালী বাজারসহ উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে ঈদকে সামনে রেখে লাচ্ছা সেমাইয়ের বিপুল সরবরাহ দেখা গেছে। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহার করে রঙিন ও আকর্ষণীয় প্যাকেটে এসব সেমাই বিক্রি করা হচ্ছে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই প্যাকেটের গায়ে উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ কিংবা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের সঠিক তথ্য উল্লেখ নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাজারে বিক্রি হওয়া এসব সেমাইয়ের বড় একটি অংশ নীলফামারীর সৈয়দপুর ও কিশোরগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি গ্রাম এলাকায় ছোট ছোট কারখানায় তৈরি করা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব কারখানায় সেমাই তৈরি করা হয় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। অনেক জায়গায় খোলা আকাশের নিচে কিংবা অপরিষ্কার ঘরে সেমাই তৈরি করে শুকানো হচ্ছে, যেখানে ধুলাবালি, মাছি ও বিভিন্ন পোকামাকড়ের সংস্পর্শে আসছে খাদ্যপণ্যটি।
প্যাকেটের গায়ে অনেক ক্ষেত্রে ‘ঘি ও ডালডায় ভাজা’ লেখা থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ সেমাই ভাজা হচ্ছে নিম্নমানের পাম তেলে—এমন অভিযোগ করেছেন স্থানীয় ক্রেতারা। তাদের দাবি, এসব তেলে ভাজা সেমাই দেখতে সুন্দর হলেও স্বাদ ও গুণগত মানে অনেকটাই নিম্নমানের। এতে যেমন খাবারের স্বাদ নষ্ট হচ্ছে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করছে।
তারাগঞ্জ বাজারের কয়েকজন ক্রেতা জানান, ঈদকে সামনে রেখে তারা পরিবার-পরিজনের জন্য ভালো মানের সেমাই কিনতে চান। কিন্তু বাজারে কোনটি আসল আর কোনটি নিম্নমানের—তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক সময় নামী ব্র্যান্ডের মতো প্যাকেট ব্যবহার করে নিম্নমানের সেমাই বাজারে ছাড়ায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী।
আরও অভিযোগ রয়েছে, অনেক প্যাকেটের গায়ে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) এর সিলমোহর ব্যবহার করা হলেও সেগুলোর বেশিরভাগই নকল। এতে সাধারণ ক্রেতারা বিভ্রান্ত হচ্ছেন এবং নিম্নমানের পণ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি না থাকায় অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিচ্ছেন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
এ বিষয়ে তারাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. হামদুল্লাহ বলেন, “নিম্নমানের বা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি লাচ্ছা সেমাই খেলে মানুষের শরীরে নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। অনেক সময় সেমাই তৈরির সময় পাম অয়েল, কৃত্রিম রং এমনকি টেক্সটাইল ডাই (কাপড়ের রং) ব্যবহার করা হয়, যা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।”

তিনি আরও বলেন, “এ ধরনের উপাদান দিয়ে তৈরি খাদ্যপণ্য দীর্ঘদিন খেলে লিভার, কিডনি ও পরিপাকতন্ত্রে সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই ক্রেতাদের উচিত সচেতন হয়ে মানসম্মত ও অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের পণ্য কেনা।”
এদিকে সচেতন ভোক্তারা অভিযোগ করেছেন, বাজারে খাদ্যপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি আরও জোরদার করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ঈদকে কেন্দ্র করে যাতে নিম্নমানের খাদ্যপণ্য বাজারে প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ও নিয়মিত অভিযান চালানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয়রা মনে করছেন, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি থাকলে নিম্নমানের সেমাই উৎপাদন ও বিক্রি অনেকাংশেই কমে আসবে। একই সঙ্গে ক্রেতাদের সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি বলে মনে করছেন তারা।




