১২ নীলফামারী-১ আসনে খালেদা জিয়ার ভাগ্নের বদলে বিএনপির মনোনয়ন পেলেন জমিয়ত নেতা
হযরত আলী বেলাল,ডিমলা (নীলফামারী) প্রতিনিধি: আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১২ নীলফামারী-১ (ডোমার-ডিমলা) আসনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়েছেন বরেণ্য আলেম ও রাজনীতিবিদ মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী। তিনি বর্তমানে কওমি ধারার শীর্ষ রাজনৈতিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ-এর মহাসচিব এবং হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ-এর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জোটের শীর্ষ নেতৃত্ব তার হাতেই ধানের শীষের প্রতীক তুলে দিয়েছে। জমিয়তের প্রার্থীরা নিজেদের প্রতীক খেজুর গাছ মার্কায় নির্বাচন করবে। তবে এ আসনে লড়াই করতে চেয়েছিলেন তারেক রহমানের খালাতো ভাই ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ভাগ্নে ইঞ্জিনিয়ার শাহরিন ইসলাম চৌধুরী তুহিন।
তবে এ জানা যায়, আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সঙ্গে চার’টি আসনে সমঝোতা করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার (২৩ ডিসেম্বর) রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত একটি সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১২ নীলফামারী-১ আসনে জোট প্রার্থী হিসেবে মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দীর নাম ঘোষণা করেন।
সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দলের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত ও অপরিবর্তনীয়। দলের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা ছিল, ১২ নীলফামারী-১ (ডোমার-ডিমলা) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য, নীলফামারী জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি, এবং বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ভাগ্নে ইঞ্জিনিয়ার শাহরিন ইসলাম চৌধুরী তুহিনকে মনোনয়ন দেওয়া হবে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি নিজ এলাকায় বিভিন্ন উন্নয়ন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকায় অনেক নেতাকর্মী তাকে এই আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে মনোনয়ন না দেওয়ায় বিএনপির একটি অংশের নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা যায়।
রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গদের মতে, ১২ নীলফামারী-১ (ডোমার-ডিমলা) আসনটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হলেও জোটের ঐক্য এবং সংগঠিত প্রচারণা এ আসনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। স্থানীয়দের মতে, মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী একজন পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির জাতীয় নেতা।
তার মনোনয়ন প্রাপ্তির খবরে ১২ নীলফামারী-১ ডোমার-ডিমলায় রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। তার জীবন ও কর্মের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো জানার কৌতুহল অনেকেই। চলুন একনজরে তা- জেনে নেই।
১৫ নভেম্বর ১৯৬৮ সালে মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী নীলফামারী জেলা ডোমার উপজেলার সোনারায়ের এক সম্ভ্রান্ত ও ঐতিহ্যবাহী আলেম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা আলহাজ্ব মো. রশিদুল হাসান ছিলেন অত্র অঞ্চলের মানুষের শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি। পারিবারিক ঐতিহ্য ও আদর্শের পথ ধরেই তিনি শৈশব থেকে ইসলামী জ্ঞানচর্চা ও সমাজসেবায় মনোনিবেশ করেন।তার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা স্থানীয় পর্যায়ে সম্পন্ন হলেও উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ভারতের বিশ্ববিখ্যাত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় দারুল উলুম দেওবন্দ-এ গমন করেন। সেখানে অত্যন্ত মেধার পরিচয় দিয়ে তিনি ‘দাওরায়ে হাদিস’ (মাস্টার্স) সম্পন্ন করেন। দেওবন্দ থেকে ফেরার পর থেকেই তিনি দেশীয় শিক্ষা ও রাজনীতিতে নিজেকে যুক্ত করেন। মাওলানা আফেন্দী তার সাংগঠনিক দক্ষতার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। তিনি ইসলামী অঙ্গনের ছোট-বড় বিভিন্ন সংকটে নেতৃত্বের পরিচয় দিয়েছেন। জমিয়তের কাণ্ডারি: জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব হিসেবে তিনি দলটির সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করেছেন। বিশেষ করে বিরোধী জোটের রাজনীতিতে আলেমদের অবস্থান সুসংহত করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। হেফাজতে ইসলাম: হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর হিসেবে তিনি ইসলামের মর্যাদা রক্ষা ও নাস্তিক্যবাদ বিরোধী আন্দোলনে রাজপথে সক্রিয় থেকেছেন। রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরেও তিনি একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষানুরাগী। তিনি রাজধানী ঢাকার ইসলামবাগস্থ জামিয়া ইসলামিয়া ইসলামবাগ মাদ্রাসার মুহতামিম (প্রিন্সিপাল) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার পরিচালনায় এই প্রতিষ্ঠানটি দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দ্বীনি বিদ্যাপীঠ হিসেবে স্বীকৃত।
গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক কারণে তাকে বেশ কয়েকবার কারাবরণ করতে হয়েছে। বিশেষ করে ২০২১ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় তিনি দীর্ঘ সময় কারান্তরীণ ছিলেন। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তার রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা আরও বৃদ্ধি পায়।
মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী মনোনয়ন পাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানান, “আমি জনগণের অধিকার রক্ষা এবং ইনসাফ কায়েমের লক্ষ্যেই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি। বিজয়ী হলে ডোমার-ডিমলার মানুষের সেবা ও এলাকার অবকাঠামোগত উন্নয়নে নিজেকে বিলিয়ে দেব।”
উল্লেখ্য, ১২ নীলফামারী-১ (ডোমার-ডিমলা) আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন কেন্দ্রীয় কমিটির মজলিসে শুরা সদস্য ও জেলা জামায়াতের আমির অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুস সাত্তার। এছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন জেলা যুগ্ম সদস্য সচিব রাশেদুজ্জামান রাশেদ।





