সারাদেশ

নিরাপত্তা খাতে অগ্রাধিকার: উন্নত, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের অপরিহার্য ভিত্তি- টিপু

ডেস্ক রিপোর্ট :- একটি রাষ্ট্রের জাতীয় বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন-পরিকল্পনা, নীতিগত অগ্রাধিকার এবং জাতীয় দর্শনের প্রতিফলন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, অবকাঠামো, জ্বালানি ও শিল্পায়নের মতো খাত নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসব খাতের সফলতা অনেকাংশেই নির্ভর করে একটি মৌলিক বিষয়ের ওপর—নিরাপত্তা। কারণ নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে উন্নয়নের সুফল টেকসই হয় না।

অর্থনীতিতে একটি বহুল স্বীকৃত ধারণা হলো—যেখানে নিরাপত্তা ও আইনের শাসন শক্তিশালী, সেখানে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়, ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়। বিপরীতে অপরাধ, সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতা বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে, উৎপাদন ব্যাহত করে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

এই বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে নিরাপত্তা খাতকে গুরুত্ব দেওয়া একটি দূরদর্শী পদক্ষেপ। এটি কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষার উদ্যোগ নয়; বরং দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করার একটি কৌশলগত বিনিয়োগ।

আজকের বাংলাদেশে কিশোর গ্যাং, মাদক, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, সাইবার অপরাধ, অনলাইন প্রতারণা এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ ও আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা অপরিহার্য। এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা গেলে জনগণের নিরাপত্তাবোধ যেমন বাড়বে, তেমনি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও সুদৃঢ় হবে।

বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। সীমান্ত সুরক্ষা, জাতীয় সংকট, দুর্যোগ মোকাবিলা, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অবদান এবং বিভিন্ন জাতীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তাদের পেশাদারিত্ব দেশ-বিদেশে প্রশংসিত। একইভাবে বাংলাদেশ নৌবাহিনী দেশের সমুদ্রসীমা, সামুদ্রিক সম্পদ এবং নীল অর্থনীতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশ বিমান বাহিনী আকাশসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দুর্যোগকালীন উদ্ধার ও জরুরি সহায়তায়ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় বাংলাদেশ পুলিশ প্রতিদিন সাধারণ মানুষের সবচেয়ে কাছাকাছি থেকে কাজ করে। অপরাধ দমন, জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, তদন্ত এবং জনসেবায় পুলিশের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) চোরাচালান, অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং সীমান্ত অপরাধ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে। বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড উপকূলীয় নিরাপত্তা, সামুদ্রিক সম্পদ সংরক্ষণ এবং সমুদ্রপথে আইন প্রয়োগে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। সন্ত্রাসবাদ ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) এবং অন্যান্য বিশেষায়িত ইউনিট নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করছে। অন্যদিকে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী নির্বাচন, সরকারি স্থাপনা, গ্রামীণ নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন জাতীয় কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

তবে শুধু বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জিত হবে না। নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর আধুনিকায়ন, উন্নত প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি, সাইবার নিরাপত্তা, ফরেনসিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং সদস্যদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, জবাবদিহি, মানবাধিকার এবং জনগণের আস্থা বজায় রাখা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একটি দক্ষ ও জনবান্ধব নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকেও শক্তিশালী করে।

নিরাপত্তা খাতে ব্যয়কে কোনোভাবেই কেবল ব্যয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি এমন একটি বিনিয়োগ, যার সুফল অর্থনীতির প্রতিটি খাতে পৌঁছে যায়। নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হয়, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ে, পর্যটন বিকশিত হয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়।

রাষ্ট্রের নিরাপত্তা শুধু বাহিনীগুলোর একক দায়িত্ব নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকেরও নৈতিক দায়িত্ব। আইন মেনে চলা, সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা, অপরাধ সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা একটি দায়িত্বশীল নাগরিকের কর্তব্য।

পরিশেষে, উন্নত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং নিরাপত্তাকে একই সূত্রে দেখতে হবে। কারণ নিরাপত্তা ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না, আর উন্নয়ন ছাড়া নিরাপত্তাও দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তাই জাতীয় বাজেটে নিরাপত্তা খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া সময়োপযোগী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। একটি আধুনিক, দক্ষ, জবাবদিহিমূলক এবং প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে উঠলেই বাংলাদেশ আরও বিনিয়োগবান্ধব, স্থিতিশীল এবং সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে নিজের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে সক্ষম হবে.।

লেখক:- জিয়াউল চৌধুরী টিপু।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

সারাদেশ

মৌলভীবাজার জেলা ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক হলেন সাব্বির আহমেদ সামাদ

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: মৌলভীবাজার জেলা ছাত্রলীগের নতুন কমিটিতে প্রচার সম্পাদক পদে দায়িত্ব পেয়েছেন জেলার একনিষ্ঠ ও ত্যাগী ছাত্রনেতা সাব্বির আহমেদ সামাদ।
সারাদেশ

বদলে যাচ্ছে র‌্যাব: পরিবর্তন হচ্ছে নাম, লোগো ও পোশাক

নতুন রূপে আসছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। এ বাহিনীর নাম, লোগো ও পোশাক পরিবর্তনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়,