সীমাহীন অনিয়মের আখড়া সদরপুর সাব-রেজিস্ট্রার অফিস: জিম্মি সাধারণ মানুষ, অধরাই থেকে যায় অপরাধীরা
শিমুল তালুকদার, সদরপুর থেকে
ফরিদপুরের সদরপুর সাব-রেজিস্ট্রার অফিস যেন অনিয়ম ও দুর্নীতির এক চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে। সপ্তাহে তিন দিন (রবি, সোম ও মঙ্গলবার)—মাসে মোট ১২ দিন চলে দলিল নিবন্ধনের কাজ। অভিযোগ উঠেছে, এ কার্যালয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক অদৃশ্য সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন সাধারণ জমি ক্রেতা-বিক্রেতারা। অপরাধ আর জালিয়াতি ধরা পড়ার পরও অদৃশ্য ক্ষমতার জোরে ছাড় পেয়ে যাচ্ছেন প্রভাবশালীরা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সদরপুর কার্যালয়ে তালিকাভুক্ত ৪২ জন দলিল লেখক (মুহুরি) থাকলেও পুরো কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে ‘দলিল লেখক সমিতি’ নামের একটি অনিবন্ধিত ও অবৈধ সিন্ডিকেট। জমি রেজিস্ট্রি করতে হলে সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরেও এই সমিতিকে বাধ্যতামূলকভাবে অতিরিক্ত ১ শতাংশ টাকা চাঁদা দিতে হয়। অতিরিক্ত এই টাকা না দিলে কোনো দলিল লেখকই কাজ করতে রাজি হন না। ফলে চরম বিপাকে পড়ছেন সাধারণ সেবাগ্রহীতারা।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে সব ধরনের ফির তালিকা প্রকাশ্যে ঝুলিয়ে রাখার কথা থাকলেও সদরপুরে তা মানা হচ্ছে না। এর সুযোগ নিয়ে ভুয়া ফির বাহানায় আদায় করা হচ্ছে মোটা অঙ্কের অতিরিক্ত টাকা। শুধু তাই নয়, আইনের তোয়াক্কা না করে লাইসেন্সহীন ভুয়া লেখকদের দিয়ে দলিলের খসড়া ও মূল লেখা সম্পন্ন করা হচ্ছে; পরবর্তীতে মূল লাইসেন্সধারী শুধু স্বাক্ষর বসিয়ে তা জমা দিচ্ছেন। এমনকি অনেক লেখকের স্ত্রীর নামে স্ট্যাম্প ভেন্ডারের লাইসেন্স থাকলেও স্বামীরাই জালিয়াতি করে ভেন্ডারের স্বাক্ষর বসিয়ে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া দলিলের নকল তুলতে গেলে সরকারি নির্ধারিত ফির চেয়ে দুই থেকে তিন গুণ টাকা চাওয়া নিত্যদিনের ঘটনা।
সবচেয়ে ভয়াবহ জালিয়াতি চলছে জমির শ্রেণি পরিবর্তনে। বিপুল অঙ্কের উৎকোচের বিনিময়ে উর্বর বা মূল্যবান জমির শ্রেণি বদলে দিয়ে সরকারকে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। অতীতে পার্শ্ববর্তী থানায় জমি দেখিয়ে শ্রেণি পরিবর্তন করে দলিল করার পর আইজিআর (আইনগত কর্তৃপক্ষ) তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট মুহুরির লাইসেন্স বাতিল করেছিলেন। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তীতে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে সেই সাজাপ্রাপ্ত মুহুরিও বহাল তবিয়তে কাজ শুরু করেছেন।
অফিসের স্থানীয় ও ভুক্তভোগীরা জানান, এই সিন্ডিকেটের চালিকাশক্তি মূলত দুই প্রভাবশালী দলিল লেখক। জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার অপরাধে ইতিপূর্বে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হলেও অদৃশ্য শক্তির ইশারায় তা ধামাচাপা পড়ে যায়। এই চক্রটি দুর্নীতির মাধ্যমে একাধিক বিলাসবহুল বাড়িসহ অঢেল সম্পদের মালিক বনে গেছে।
স্থানীয়দের ক্ষোভ, সদরপুর সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে অপরাধ করলেও টাকার জোরে সবাই পার পেয়ে যায়। ফলে দিন দিন এ অফিসে অনিয়মই যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। সেবাপ্রার্থীরা অনতিবিলম্বে এ অবৈধ সিন্ডিকেট ভাঙা এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।



