নওগাঁয় সরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ, আদায়কৃত অর্থ জমা নিয়ে প্রশ্ন
স্টাফ রিপোর্টার নওগাঁঃ
নওগাঁর পোরশায় জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (নিপোর্ট)-এর আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (আরটিসি) মিলনায়তন আনুষ্ঠানিকভাবে চালু বা উদ্বোধন না হলেও বাণিজ্যিকভাবে ভাড়া দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গত এক বছর ধরে বিভিন্ন কোম্পানি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সভা, সেমিনার ও কর্মশালার জন্য মিলনায়তনটি ভাড়া দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। প্রতিদিনের জন্য নেওয়া হচ্ছে ৩ হাজার ৭৫০ টাকা। তবে আদায়কৃত অর্থ সরকারি রাজস্ব খাতে জমা হয়েছে কি না, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন।
স্থানীয় সূত্র ও সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, পোরশা উপজেলার সারাইগাছি-আড্ডা সড়কের সারাইগাছি মোড় থেকে প্রায় ৫০০ গজ দক্ষিণে নির্মাণ করা হয়েছে নিপোর্টের আধুনিক এই আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া কেন্দ্রটির নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০২৩ সালে। ভবন নির্মাণ সম্পন্ন হলেও এখনো কেন্দ্রটির পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়নি। এমনকি এর সীমানাপ্রাচীরের নির্মাণকাজও অসম্পূর্ণ রয়েছে।
এদিকে কেন্দ্রটির প্রশাসনিক কার্যক্রম দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা জান্নাতুল মাওয়া। তিনি চারঘাটে নিজ কর্মস্থলে থেকেই পোরশার কেন্দ্রটির প্রশাসনিক বিষয়গুলো দেখভাল করছেন বলে জানা গেছে।
মাঠপর্যায়ে কেন্দ্রটির দেখভালের জন্য সারাইগাছি গ্রামের খলিলুর রহমানকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে কেন্দ্রটির নিরাপত্তায় সরকারি খরচে সাতজন আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত প্রায় এক বছর ধরে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানির সভা, সেমিনার ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির জন্য কেন্দ্রটির মিলনায়তন ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। প্রতিদিনের ভাড়া হিসেবে নেওয়া হচ্ছে ৩ হাজার ৭৫০ টাকা।
তবে স্থানীয়ভাবে প্রশ্ন উঠেছে, কেন্দ্রটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ও পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরুর আগেই মিলনায়তনটি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের অনুমতি কে দিয়েছে এবং ভাড়া বাবদ সংগৃহীত অর্থ কোন খাতে জমা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, ভাড়া বাবদ সংগৃহীত অর্থ সরকারি কোষাগারে ট্রেজারি চালান বা সরকারি নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে জমা দেওয়ার পরিবর্তে নগদে সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয় বলেও জানা গেছে।
মিলনায়তন দেখভালের দায়িত্বে থাকা খলিলুর রহমান বলেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মৌখিক নির্দেশেই তিনি বিভিন্ন পক্ষের কাছে মিলনায়তন ভাড়া দিয়ে থাকেন। ভাড়া বাবদ নগদে পাওয়া টাকা বিকাশের মাধ্যমে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা জান্নাতুল মাওয়ার কাছে পাঠিয়ে দেন তিনি। তবে ওই টাকা পরবর্তীতে কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় করা হয়, সে বিষয়ে তার কোনো ধারণা নেই।
অভিযোগের বিষয়ে নিপোর্টের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা মোছাম্মদ জান্নাতুল মাওয়া মিলনায়তন ভাড়া দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তার দাবি, কেন্দ্রটি আংশিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মৌখিক পরামর্শ ও সম্মতিতেই মিলনায়তন ভাড়া দেওয়া হচ্ছে।
তবে ভাড়া বাবদ সংগৃহীত অর্থ সরকারি রাজস্ব খাতে জমা দেওয়া হয় কি না, এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি পরে তথ্য জানাবেন বলে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরবর্তীতে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
পোরশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাকিবুল ইসলাম বলেন, কোনো প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের আগেই কীভাবে সেটি ভাড়া দেওয়া হচ্ছে, বিষয়টি তার কাছে বোধগম্য নয়।
তিনি বলেন, সরকারি কোনো স্থাপনা বা মিলনায়তন বাণিজ্যিক কিংবা অন্য কোনো কাজে ভাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বিধিমালা রয়েছে। কিন্তু পোরশার এই মিলনায়তন ভাড়া দেওয়ার বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনকে কোনো তথ্য জানানো হয়নি। ভাড়া বাবদ আদায় করা অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে কি না, সে বিষয়েও তিনি অবগত নন।
সরকারি অর্থ ও সম্পদের ব্যবহারের ক্ষেত্রে যথাযথ অনুমোদন, হিসাব সংরক্ষণ এবং রাজস্ব জমার নিয়ম মানা হয়েছে কি না। এখন সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা ও অর্থের হিসাব বের করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।





