মায়ের দেওয়া ৫০০ টাকায় শুরু, ফুল চাষেও সফল রাজবাড়ীর তরুণ উদ্যোক্তা উদ্যোক্তা তপু
বোরহান উদ্দিন, রাজবাড়ী :
রাজবাড়ীর তরুণ উদ্যোক্তা তপু যেন বাস্তব জীবনের এক জীবন্ত অনুপ্রেরণার গল্প। অষ্টম শ্রেণির পর সংসারের অভাব-অনটনের তাড়নায় লেখাপড়া ছেড়ে দিতে বাধ্য হওয়া এই যুবক আজ দাঁড়িয়ে আছেন সাফল্যের শিখরে। প্রায় ২০ লাখ টাকার সম্পদের মালিক তপুর এই যাত্রার শুরু হয়েছিল মায়ের দেওয়া ভালোবাসার প্রতীক মাত্র ৫০০ টাকা দিয়ে—যা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় পুঁজি। সেই সামান্য টাকাই আজ তাকে এনে দিয়েছে আত্মবিশ্বাস, সম্মান ও স্বাবলম্বিতার ঠিকানা।
রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি সদর ইউনিয়নের ভীমনগর গ্রামের জাহিদ হাসান ওরফে তপু (৩৫) ছোটবেলা থেকেই অভাবের সঙ্গে লড়াই করে বড় হয়েছেন। পড়ালেখা বেশি দূর এগোতে না পারলেও হার মানেননি জীবনের কাছে। মায়ের কাছ থেকে পাওয়া সেই ৫০০ টাকা নিয়ে শুরু করেন ছোট পরিসরে ব্যবসা। ধীরে ধীরে নিজের পরিশ্রম, সততা ও দৃঢ় ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে তার রয়েছে ছাগল ও মাছের খামার, খেলনা ও কসমেটিকসের দোকান এবং সবচেয়ে ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগ—বাণিজ্যিক ফুল চাষ।
রাজবাড়ী জেলায় পেঁয়াজ, রসুন, পাট ও মসলা জাতীয় ফসলের চাষ ব্যাপক হলেও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ফুল চাষের তেমন প্রচলন ছিল না। ঠিক এমন এক বাস্তবতায় ঝুঁকি নিয়ে ফুল চাষে হাত দিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন তপু। তার সফলতা আজ শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং এলাকার অসংখ্য যুবকের জন্য নতুন স্বপ্নের দরজা খুলে দিয়েছে।
শুরুর দিকে বালিয়াকান্দি উপজেলা পরিষদ গেটের পাশে একটি ছোট ঘর ভাড়া নিয়ে খেলনা ও কসমেটিকসের দোকানের পাশাপাশি ফুলের ব্যবসা শুরু করেন তিনি। কিন্তু যশোরের গদখালী থেকে ফুল আনতে বেশি খরচ হওয়ায় লাভ কমে যাচ্ছিল। তখনই ২০১৮ সালে নিজেই ফুল চাষ করার সাহসী সিদ্ধান্ত নেন তপু। শুরুতে পরিবারের আপত্তি, বিশেষ করে বাবার অনিচ্ছা থাকলেও দমে যাননি তিনি। ২২ শতাংশ জমি লিজ নিয়ে প্রায় ৩২ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে গাঁদা, রজনীগন্ধাসহ বিভিন্ন ফুলের চাষ শুরু করেন। প্রথম বছরেই আশানুরূপ সাফল্য পাওয়ায় তার আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে যায়।
বর্তমানে তিনি ১৫০ শতাংশ জমিতে বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ করছেন। এসব ফুল বালিয়াকান্দির চাহিদা মিটিয়ে রাজবাড়ী, ফরিদপুর, মধুখালীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রতিদিনই ক্ষেত থেকে ফুল সংগ্রহ করা হয়। পাশাপাশি গড়ে তুলেছেন ফুলের নার্সারি, যেখান থেকেও আসছে উল্লেখযোগ্য আয়। মাঠে গিয়ে দেখা যায়, তপু তার আদরের ভাতিজিসহ কয়েকজন সহকারীকে নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন ফুল সংগ্রহে—যেন নিজের স্বপ্নের বাগান আগলে রাখছেন ভালোবাসায়।
নিজেকে স্বাবলম্বী করার পাশাপাশি তপু এখন এলাকার বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছেন। তার খামার ও ফুল বাগানে নিয়মিত কাজ করছেন কয়েকজন যুবক। তপুর বিশ্বাস, বিদেশে যাওয়ার জন্য চার-পাঁচ লাখ টাকা খরচ না করে দেশে এক থেকে দেড় লাখ টাকা বিনিয়োগ করলেও পরিশ্রম ও পরিকল্পনা থাকলে সফল হওয়া সম্ভব।
নিজের সাফল্যের কথা বলতে গিয়ে তপু বলেন,
“আমি খুব সাধারণ পরিবারের ছেলে। পড়ালেখা বেশি করতে পারিনি। মায়ের দেওয়া ৫০০ টাকাই ছিল আমার সব। শুরুতে অনেক কষ্ট করেছি, অনেকেই বলেছে ফুল চাষ করে কিছু হবে না। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। আজ আল্লাহর রহমতে আমি স্বাবলম্বী হতে পেরেছি।”
যুবকদের উদ্দেশে তিনি বলেন,
“বিদেশে যাওয়ার জন্য অনেক টাকা খরচ হয়। কিন্তু দেশে থেকেও অল্প পুঁজি আর পরিশ্রম করলে ভালো কিছু করা সম্ভব। এক থেকে দেড় লাখ টাকা বিনিয়োগ করলেই লাভজনক ব্যবসা করা যায়।”
তপুর এই উদ্যোগ শুধু তাকে স্বাবলম্বী করেনি, বরং এলাকার বেকার যুবকদের জন্যও তৈরি করেছে কর্মসংস্থানের সুযোগ। তার ফুল বাগান ও খামারে নিয়মিত কাজ করছেন কয়েকজন যুবক।
তপুর এই ফুল বাগান পরিদর্শনে এসে বালিয়াকান্দি উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুজিত দাস বলেন, “আমাদের বালিয়াকান্দির জাহিদ হাসান তপু একজন ব্যতিক্রমধর্মী চাষি। এই উপজেলায় প্রথম বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ শুরু করে তিনি আজ সফল। তার দেখাদেখি এখন অনেকেই ফুল চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। কৃষি বিভাগ থেকে আমরা তাকে নিয়মিত পরামর্শ ও সহযোগিতা দিয়ে আসছি।”
তপুর এই গল্প নিছক কোনো সাফল্যের পরিসংখ্যান নয়—এটি এক মায়ের দোয়া, সীমাহীন ভালোবাসা, অদম্য পরিশ্রম আর দৃঢ় মানসিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত। অভাবকে জয় করে স্বপ্ন বুনে নেওয়া এই তরুণ উদ্যোক্তা আজ প্রমাণ করে দিচ্ছেন, ইচ্ছা থাকলে অল্প পুঁজি দিয়েও বদলে দেওয়া যায় জীবনের গল্প।





