২০০৮-এর ছায়া, ২০২৬-এর হিসাব: নোয়াখালী–৫ এ কার ঘরে যাবে অদৃশ্য ভোট।
জয়া হাসান নোয়াখালী- নোয়াখালী–৫ (কোম্পানীগঞ্জ–কবিরহাট, সদর আংশিক) আসনের রাজনীতিতে আবারও ফিরে এসেছে চরম কৌতূহল ও হিসাব–নিকাশ। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় দলটি নির্বাচন অংশ নিতে না পারলেও তৃণমূলে থাকা তাদের বিশাল ভোটব্যাংক কোন দিকে যাবে, সেটিই এখন এই আসনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন।
২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নোয়াখালী–৫ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল হাড্ডাহাড্ডি। সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ওবায়দুল কাদের ১ লাখ ১২ হাজার ৫৭৫ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। খুব অল্প ব্যবধানে বিএনপির প্রার্থী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ পান ১ লাখ ১১ হাজার ২০৪ ভোট।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০০৮ সালের নির্বাচন ছিল তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং সে সময় তেমন বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ ওঠেনি। ফলে ওই নির্বাচনের ভোটের ধারা এখনো রাজনৈতিক বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
২০০৮ সালের পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো নিয়ে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক থাকলেও, সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের যে শক্ত ভোটভিত্তি তৈরি হয়েছিল, তা আজও নোয়াখালী–৫ আসনের রাজনীতিতে বড় একটি বাস্তবতা। যদিও বর্তমানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় অনেক নেতা আত্মগোপনে রয়েছেন এবং দলটি নিষিদ্ধ থাকায় নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না, তবুও তৃণমূল পর্যায়ে তাদের বিপুল ভোটব্যাংক সক্রিয় রয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা।
এই বাস্তবতায় এবারের নির্বাচনে এই আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠেছে সেই ভোটব্যাংককে ঘিরেই। ইতোমধ্যে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদের সহধর্মিণী হাসনা জসিম উদ্দীন মওদুদ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দাখিলের পর তা প্রত্যাহার করেছেন বলে নিজের ফেসবুক ভেরিফাই পেজে জানিয়েছেন। ফলে মাঠে এখন মূলত তিনজন প্রার্থীই শক্ত অবস্থানে রয়েছেন।
তারা হলেন— বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী অধ্যক্ষ বেলায়েত হোসেন এবং জাতীয় পার্টির নাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার খাজা তানভীর আহমেদ। রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায় রয়েছে, এই তিন প্রার্থীর সবার লক্ষ্য একটাই— নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের তৃণমূল ভোটব্যাংকের সমর্থন নিজেদের দিকে টেনে নেওয়া।
অন্যদিকে অতীতে নোয়াখালী–৫ আসনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও গ্রুপিং রাজনীতির বিষয়টি বেশ দৃশ্যমান ছিল। তবে এবারের নির্বাচনে সেই চিত্র অনেকটাই বদলেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। দলীয় সিদ্ধান্তের পর সব ধরনের মতবিরোধ পাশ কাটিয়ে বিএনপির তৃণমূল থেকে শুরু করে উপজেলা ও পৌর পর্যায়ের নেতাকর্মীরা এখন ঐক্যবদ্ধভাবে ধানের শীষের প্রার্থী মোহাম্মদ ফখরুল ইসলামের পক্ষে মাঠে কাজ করছেন। দীর্ঘদিন পর বিএনপির এই ঐক্যবদ্ধ উপস্থিতি নোয়াখালী–৫ আসনের নির্বাচনী সমীকরণে একটি ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। তারা বলছেন, অভ্যন্তরীণ বিরোধ মিটিয়ে মাঠে নামা শুধু দলীয় শক্তি বাড়ায় না, সাধারণ ভোটারদের মাঝেও আস্থার পরিবেশ তৈরি করে।
এদিকে তিন শক্তিশালী প্রার্থীর মধ্যে অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী হিসেবেও আলোচনায় রয়েছেন বিএনপি প্রার্থী মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম। শিল্প ও ব্যবসায়িক পটভূমি থাকায় নির্বাচনী প্রচার, সংগঠন পরিচালনা এবং মাঠপর্যায়ে কর্মীদের সক্রিয় রাখতে তার সক্ষমতা অন্যদের তুলনায় বেশি বলে মনে করছেন অনেকেই। এই আর্থিক সক্ষমতা ও দলীয় ঐক্য একসঙ্গে থাকায় নোয়াখালী–৫ আসনের নির্বাচনী লড়াইয়ে ফখরুল ইসলাম একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পেরেছেন।
বর্তমান নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, নোয়াখালী–৫ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৫ হাজার ৭১৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ১০ হাজার ৩৮৮ জন এবং মহিলা ভোটার ১ লাখ ৯৫ হাজার ৩২৭ জন। পুরো আসনে ভোটকেন্দ্র রয়েছে ১৩২টি, যা এই আসনের নির্বাচনী গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
সব মিলিয়ে, নোয়াখালী–৫ আসনের এবারের নির্বাচন শুধু দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার নয়, বরং একটি নিষিদ্ধ দলের অদৃশ্য ভোটব্যাংক কোন দিকে যাবে, সেই অঙ্কের ওপরই নির্ভর করছে চূড়ান্ত ফলাফল। এই ভোটব্যাংক যিনি নিজের ঘরে তুলতে পারবেন, তার নামেই উঠতে পারে জাতীয় সংসদের আসন— এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।





