সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পপার্কে শত কোটি টাকার সড়ক ব্যবহারের আগেই নষ্ট, উঠছে কার্পেটিং অনিয়মের অভিযোগ
ওয়াসিম সেখ, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি:
সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পপার্কে নির্মিত শত কোটি টাকার সড়ক ব্যবহারের আগেই উঠে যাচ্ছে কার্পেটিং। নির্মাণকাজে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, টেন্ডারের শর্ত ভেঙে এখনো নিম্নমানের কাজ করেছে। প্রকল্পে নির্ধারিত ৫০ মিলিমিটার সাইজের খোয়ার পরিবর্তে বড় আকারের ইটের খোয়া ব্যবহার করা হয়েছে। ৭৫ মিলিমিটার কার্পেটিংয়ের স্থলে কোথাও ৬০ থেকে ৬৫ মিলিমিটার পুরুত্ব পাওয়া গেছিলো। সড়ক নির্মাণে বড় আকারের নিম্নমানের খোয়া, ভাঙা ইটের খোয়া, প্রকল্প এলাকার ভরাটকৃত বালু ব্যবহার, খোয়া-বালুর মিশ্রণে অনিয়ম এবং নির্ধারিত পুরুত্ব না মানার মতো গুরুতর ত্রুটি রয়েছে। কোথাও পাথরের ঢালাই, কোথাও খোয়ার ঢালাই দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত ৭৫ মিমি কার্পেটিংয়ের স্থলে অনেক জায়গায় মাত্র ৬০-৬৫ মিমি পুরুত্ব রাখা হয়েছে।
এমনকি কাজ শেষ হওয়ার এক বছরের মধ্যেই সড়কের কার্পেটিং উঠে যাওয়ায় প্রকল্পের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে বিসিক চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম বলেন, রাস্তা উঠে যাচ্ছে এ বিষয়ে আমার জানা নেই। তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, দুদক তদন্ত করছে, আমরাও তদন্ত করছি। তবে তদন্তে কী পাওয়া গেছে, সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
অভিযোগ রয়েছে, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রভাবশালী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আরাফাত কনস্ট্রাকশন দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমানের কাজ করলেও বিসিক কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বরং বিসিকের প্রকৌশল ও প্রকল্প বাস্তবায়ন বিভাগের পরিচালক আব্দুল মতিন এবং প্রকল্প পরিচালক জাফর বায়জিদের যোগসাজশে প্রতিষ্ঠানটিকে ২০২৪ সালের জুনে প্রায় ২০০ কোটি টাকার বিল পরিশোধ করা হয়।
অভিযোগের বিষয়ে আরাফাত কনস্ট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী বলেন, আমরা নিয়ম মেনেই কাজ করেছি। তবে বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি ফোন কেটে দেন।
২০২৫ সালের ১৬ আগস্ট বিসিক শিল্পপার্ক এলাকা পরিদর্শনে যান পরিচালক আব্দুল মতিনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এ সময় সড়ক ও ড্রেন নির্মাণে ব্যবহৃত উপকরণ ও পুরুত্ব নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।
পরিদর্শনের ফলাফল জানতে চাইলে তিনি বলেন, রিপোর্টে দেখতে পাবেন, বলে দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন। পরিদর্শনের সময় কোনো মাপজোকও নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।
এদিকে, তথ্য অধিকার আইনে ২০২৫ সালের ২৮ জুলাই তথ্য চেয়ে আবেদন করা হলে বিসিক শিল্প নগরীর ব্যবস্থাপক মাহবুবুল তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি লিখিত জবাবে বলেন, চাওয়া তথ্য ব্যবসায়িক গোপনীয়তার মধ্যে পড়ে এবং তা প্রকাশযোগ্য নয়।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে ড্রেন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান আতাউর রহমান খান ও সড়ক নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান মজিদ সন্স লিমিটেড নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না করায় প্রায় ২০ কোটি টাকা জরিমানা করা হলেও এখনো তা আদায় করতে পারেনি বিসিক।
এদিকে, প্রকল্প এলাকায় সাব-বেজ নির্মাণে নিম্নমানের বালু ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, খোয়ার তুলনায় বালুর ব্যবহার বেশি এবং ভরাটকৃত বালু দিয়েই সাব-বেজের কাজ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, যমুনা সেতুর পশ্চিম পাশে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলী, পশ্চিম মোহনপুর, বনবাড়িয়া, বেলটিয়া ও মোরগ্রাম মৌজার প্রায় ৪০০ একর জমিতে বিসিক শিল্পপার্ক বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। একাধিকবার সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে প্রকল্পটির সর্বশেষ ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৭১৯ কোটি ২১ লাখ টাকা। এখানে ৮২৯টি প্লটে অন্তত ৫৭০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ঘটনায় দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।





