পরিচয়হীন এক বৃদ্ধের অসহায় চোখে যেন ফুটে উঠেছে সমাজের নির্মম বাস্তবতা
সাব্বির হোসাইন আজিজ, মাদারীপুরঃ একসময় হয়তো এই মানুষটিও ছিলেন একটি পরিবারের অবলম্বন। সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে জীবনের সবটুকু শক্তি উজাড় করে দিয়েছিলেন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে যখন নিজেই হয়ে পড়েছেন অসহায়, তখন কি সেই আপনজনরাই তাকে রাতের আঁধারে ফেলে গেলেন রাস্তার পাশে?। মাদারীপুর শহরের একটি নির্জন সড়কের পাশে পড়ে থাকা এক বৃদ্ধের করুণ অবস্থা দেখে এমন প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে স্থানীয়দের মনে। দুই দিন ধরে অসুস্থ ও অসহায় অবস্থায় পড়ে থাকা এই বৃদ্ধের পরিচয় এখনো জানা যায়নি। তবে তার কাঁদো কাঁদো চোখ আর অসংলগ্ন কথাগুলো যেন এক হৃদয়বিদারক গল্পের সাক্ষ্য দিচ্ছে। সোমবার (২৯ জুন) রাতে মাদারীপুর পৌরসভার পানিছত্র এলাকার লিগ্যাল এইড – আল জাবির উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন সড়কের পাশে বৃদ্ধকে দেখতে পান স্থানীয়রা। পরে স্থানীয় যুবক, মাদারীপুর রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সদস্য এবং সংবাদকর্মীদের সহযোগিতায় তাকে উদ্ধার করে মাদারীপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কয়েকদিন ধরে বৃদ্ধটি ওই স্থানে পড়ে ছিলেন। শারীরিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এই মানুষটির অবস্থা দেখে অনেকেই চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। কেউ খাবার দিয়েছেন, কেউ পানি, আবার কেউ খুঁজেছেন তার স্বজনদের।
বৃদ্ধের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলে তিনি জানান, ছেলে ও ছেলের স্ত্রী তার সঙ্গে খারাপ আচরণ করতেন এবং বিভিন্নভাবে নির্যাতন করতেন। একপর্যায়ে তাকে এখানে ফেলে রেখে চলে যায় বলেও দাবি করেন তিনি। তবে নিজের নাম-পরিচয় কিংবা বাড়ির ঠিকানা সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি। একই প্রশ্নের জবাবে বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন তিনি।
পথচারী আজিজুল ইসলাম বলেন, “বৃদ্ধ ব্যক্তি হয়তো স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন অথবা মানসিক বিভ্রান্তিতে ভুগছেন। তাই তার প্রকৃত পরিচয় খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবুও মানবিক কারণে আমরা সবাই তাকে সাহায্য করার চেষ্টা করছি।”
এলাকার মুদি দোকানি শহীদুল ইসলাম জানান, তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বৃদ্ধের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে স্বজনদের খোঁজ করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যদি সত্যিই পরিবারের সদস্যরা তাকে ফেলে গিয়ে থাকে, তাহলে এটি শুধু একটি পরিবারের ব্যর্থতা নয়, পুরো সমাজের জন্য লজ্জার বিষয়। এমন অমানবিক কাজের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।”
মাদারীপুর রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সদস্যরা জানান, খবর পেয়ে তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে বৃদ্ধকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। কিন্তু তিনি নিজের পরিচয় সম্পর্কে কার্যকর কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
সমাজসেবক আসাদুজ্জামান সাইফ বলেন, “আমরা প্রশাসন, সমাজসেবামূলক সংগঠন ও সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানাই, দ্রুত এই বৃদ্ধের পরিচয় শনাক্ত করে তার পরিবারকে খুঁজে বের করা হোক। একজন মানুষ যেন নিজের জীবনের শেষ সময়ে এভাবে পরিচয়হীন ও পরিত্যক্ত না থাকেন।”
মাদারীপুর সদর হাসপাতালের আরএমও ডা. অখিল সরকার বলেন, “স্বেচ্ছাসেবক সদস্য ও সাংবাদিকদের মাধ্যমে একজন অজ্ঞাত বৃদ্ধকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তবে এখনো তার পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।”
এই বৃদ্ধের অসহায় মুখ, শূন্য দৃষ্টি আর বারবার চারপাশে তাকানোর দৃশ্য যেন সমাজের বিবেককে নাড়া দেয়। প্রশ্ন রেখে যায় যে মানুষটি একদিন সন্তানকে হাঁটতে শিখিয়েছিলেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে কেন তাকেই পথের ধারে পড়ে থাকতে হবে?
একটি সভ্য সমাজে কোনো বৃদ্ধ মানুষ যেন এভাবে পরিত্যক্ত অবস্থায় দিন কাটাতে না হয় এটাই এখন মাদারীপুরবাসীর প্রত্যাশা।





