পঞ্চগড় সুগারমিল চালুর খবর নেই, পরিদর্শন আর আশ্বাসেই চলে গেছে ৬ বছর
একেএম বজলুর রহমান, পঞ্চগড়
দেশের সর্ব উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা পঞ্চগড়ের একমাত্র ভারি ও রাষ্ট্রয়ত্ব শিল্প প্রতিষ্ঠান পঞ্চগড় চিনিকল।
মৌসূম শুরু হওয়ার সময় চিনিকলের কর্মকর্তা, কর্মচারী আর শ্রমিকের আড্ডায় মূখর থাকতো গোটা চিনিকল এলাকা। চিনিকলের পাশে গড়ে উঠেছিল মিলগেট বাজার। চিনিকলের শ্রমিক কর্মচারীদের আনাগোনায় সব সময় ব্যস্ত সময় কাটাত সেখানকার ব্যবসায়ীরা। অন্যান্য আবাদের চেয়ে বেশি লাভজনক হওয়ায় কৃষকরা বেশি আকৃষ্ট ছিল আখ আবাদে।
প্রায় ৬ বছরে বিভিন্ন সময়ে সরকারের বিভিন্ন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা পরিদর্শন করে গেছেন। আশ্বাসও দিয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোন অগ্রগতি দেখা যায়নি বলে জানান তারা।
গত ৯ মে বর্তমান সরকারের শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির পঞ্চগড় চিনিকল পরিদর্শন করেন। পরে মিল প্রাঙ্গণে আয়োজিত আখ চাষীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেন। তিনিও পঞ্চগড় চিনিকলসহ বন্ধ থাকা চিনিকলগুলো চালুর উদ্যােগের আশ্বাস দেন।
জানা যায়, পঞ্চগড় চিনিকলটি ১৯৬৬-৬৯ সালে দৈনিক এক হাজার ১৬ মেট্রিক টন আখ মাড়াই ক্ষমতা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৬৯-৭০ সালে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করে। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। পরে লোকসান দেখিয়ে বিগত আওয়ামীলীগের সরকারের আমলে গত ২০২০ সালে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে মিলটির আখ মাড়াই ও চিনি উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
তবে চিনিকলটির কার্যক্রম বন্ধ হওয়ায় শুধু শ্রমিক-কৃষকরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না বরং মিলটি নিজেও সংকটে পড়েছে। মেশিনারিজ যন্ত্রণাংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। বিভিন্ন এলাকায় মিলের জমিও বেদখল ও সুষ্ঠু ব্যবহার হচ্ছে না। মিল কতৃপক্ষ কৃষকদের আখ চাষে উৎসাহ দিলেও তারা তাদের নিজের জমিগুলোও পতিত করে ফেলে রেখেছে। চিনিকলের পাশের দু’টি বৃহৎ খামার কয়েক বছর ধরে লীজ দেয়া হচ্ছে স্থানীয় কৃষকদের।
চিনিকলটি এখন যেন শুধুই স্মৃতি আর দীর্ঘশ্বাসের নাম। আখ উৎপাদন কমে যাওয়ায় ক্রমাগত লোকসানে ছয় বছর আগে বন্ধ করে দেয়া হয় এই চিনিকলটি। এক সময় এ জেলার অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল এই চিনিকলটি। এই চিনিকলটিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল হাজারো মানুষের জীবিকা। কিন্তু মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর একদিকে যেমন কর্মহীন হয়েছেন শ্রমিকরা। অন্যদিকে আখ চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন কৃষকরাও। মিলটি বন্ধ হয়ে পড়ায় শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়ায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কেউ ভ্যান, ইজিবাইক, দোকানসহ বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত হলেও সফল হতে পারছেন না কেউই। অনেকের দাবী তারা কাজের জন্য বিভিন্ন জায়গায় কাজের সন্ধানে গেলেও তাদের কাজে নেয়া হচ্ছে না। চিনিকলটি বন্ধ থাকায় এই জেলার উৎপাদিত আখ নিতে হয় পাশ্ববর্তী জেলা ঠাকুরগাঁও চিনিকলে। এতে বাড়ছে পরিবহন খরচ। সময় নষ্টের পাশাপাশি কৃষকদের গুনতে হচ্ছে লোকসানের হিসাবও।
এদিকে চিনিকলের শ্রমিক ও কৃষকসহ স্থানীয়দের অভিযোগ, চিনিকলটি বন্ধ হওয়ার পর থেকেই সেটি চালুর দাবিতে বছরের পর বছর আন্দোলন হলেও কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। উপদেষ্টা, মন্ত্রীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা চিনিকল পরিদর্শনে এলেও বাস্তবে চালুর কোনো অগ্রগতি নেই।
চিনিকল কর্তৃপক্ষ বলছে, এখানকার ট্রাক, ট্রাক্টরগুলো ঠাকুরগাঁও চিনিকলে স্থানান্তর করা হয়েছে। এই চিনিকলের ২শ ২৩ একর জমি আছে। রয়েছে ৫টি সাব জোন ও ৩১টি সেন্টার। বর্তমানে ৮টি সেন্টারের আওতায় বর্তমানে ৯৯০ একর জমিতে আখ চাষ হয়েছে। চিনিকলটিতে প্রায় ১২শ জনবল থাকলেও এখন আছে মাত্র ৭০ জনের মত। কিছু জনবল পার্শ্ববর্তি ঠাকুরগাঁও চিনিকলসহ অন্য মিলে স্থানান্তর করা হয়েছে।
অনেক কৃষক আখ চাষ ছেড়ে ভুট্টা, ধান কিংবা অন্য ফসলে ঝুঁকলেও সেখানেও মিলছে না কাক্সিক্ষত লাভ। তবে বেশ কয়েকবছর লোকসানের পর আখের জমিতে চা বাগান লাগিয়ে এখন লাভের মূখ দেখছেন অনেকেই।
পঞ্চগড় চিনিকল শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহিম বলেন, চিনিকলটি চালুর জন্য আমরা শুরু থেকে যেই সরকার এসেছে দাবি ও আন্দোলন করেছি। আমরা আর আশ্বাস চাই না, আমরা দ্রুত বাস্তবায়ন চাই। ২০২০ সালে অজুহাত দেখিয়ে আ’লীগ সরকার মিলটি বন্ধ করে দেয়। এতে আমরা যারা এ মিলের সাথে জড়িত ছিলাম সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।
পঞ্চগড় চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আতিকুজ্জামান বলেন, ৩১টি সেন্টারের মধ্যে ৮টি চালু আছে। যেখানে ৯৯০ একর জমি আখ চাষের আওতায় আছে। যা থেকে ১৮-২০ হাজার মেট্রিক টন আখ ঠাকুরগাঁও চিনিকলে সরবারহ করা হবে। এই চিনিকলের আওতায় ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে ১৬ হাজার মেট্রিক টন আখ উৎপাদন হয়েছিল।





