সারাদেশ

তীব্র গরমে সিরাজগঞ্জে বাড়ছে নিউমোনিয়া-ডেঙ্গু, মেঝেতে রোগীর চিকিৎসা

ওয়াসিম সেখ,সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি:
তীব্র গরম আর বদলে যাওয়া আবহাওয়ার প্রভাব পড়েছে সিরাজগঞ্জের জনস্বাস্থ্যে। জ্বর, নিউমোনিয়া, হাম, ডেঙ্গুসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিনই হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর ভিড়। বিশেষ করে শিশু রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা। নির্ধারিত শয্যা পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় অনেক রোগীকে ওয়ার্ডের মেঝেতেই রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সিরাজগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন ওয়ার্ডে নির্ধারিত শয্যার পাশাপাশি মেঝেতেও রোগী চিকিৎসাধীন। শিশু ওয়ার্ডের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক শিশু ভর্তি হওয়ায় চিকিৎসক ও নার্সদের বাড়তি দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। রোগীদের সঙ্গে থাকা স্বজনদেরও দীর্ঘ সময় হাসপাতালের ভেতরে অবস্থান করতে হচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্র ও স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বলছে, গত কয়েকদিনের তীব্র গরমের মধ্যে শিশুদের জ্বর, সর্দি-কাশি, বমি, খাবারে অনীহা ও শারীরিক দুর্বলতাসহ বিভিন্ন উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসার প্রবণতা বেড়েছে। অনেকের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, হাম ও ডেঙ্গুর উপসর্গ পাওয়া যাচ্ছে।
সিরাজগঞ্জ সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হাম আক্রান্ত হয়ে নতুন করে ১২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে হাম আক্রান্ত ২৮ জন চিকিৎসাধীন। এ পর্যন্ত চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২ হাজার ৩১ জন। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত হাম আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৫৯ জন। এ রোগে এখন পর্যন্ত জেলায় কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।
অন্যদিকে নিউমোনিয়াতেও বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সিরাজগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১৫ জন নিউমোনিয়া রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রতিদিনই নিউমোনিয়া আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।
ডেঙ্গুর চিত্রও উদ্বেগ তৈরি করছে। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে নতুন করে ২৭ জন ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৭২ জন। এ পর্যন্ত চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৭৪৮ জন। চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৮২১ জন। এর মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে। বেশি আক্রান্ত হচ্ছে কাজীপুরে গত ২৪ ঘণ্টায় ১৭ জন।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক শিশুর মা ইসমত আরা বলেন, কয়েকদিন ধরে তার শিশুর জ্বর ও শারীরিক দুর্বলতা ছিল। স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নেওয়ার পরও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় হাসপাতালে নিয়ে আসেন। তিনি বলেন, হাসপাতালে এসে দেখেছেন রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। বেড না থাকায় মেঝেতেও রোগীদের চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
রোগীর স্বজন মো. জীবন আকন্দ বলেন, শিশু রোগীর সংখ্যাই বেশি চোখে পড়ছে। অনেক রোগীকে বেড না পেয়ে মেঝেতে থাকতে হচ্ছে। গরমের মধ্যে শিশুদের নিয়ে এভাবে হাসপাতালে অবস্থান করা কষ্টকর। রোগীর চাপ কমাতে আরও শয্যা ও চিকিৎসক-নার্স প্রয়োজন।
২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সিরাজগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. শহীদুল্লাহ দেওয়ান বলেন, অতিরিক্ত রোগীর চাপের কারণে চিকিৎসক ও নার্সদের বাড়তি পরিশ্রম করতে হচ্ছে। সীমিত জনবল ও অবকাঠামোর মধ্যেই রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। তবে চিকিৎসাসেবায় কোনো ধরনের ঘাটতি রাখা হচ্ছে না।
তিনি বলেন, আবহাওয়া পরিবর্তনের সময় শিশুদের জ্বর, সর্দি-কাশি, বমি ও খাবারে অনীহাসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ সময় শিশুদের পর্যাপ্ত পানি ও পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার পাশাপাশি জ্বর বা অন্য কোনো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. মো. মাহবুবুল আলম বলেন, জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে অনেক অভিভাবক শিশুদের নিয়ে জেলা হাসপাতালে আসছেন। স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসা নেওয়ার পরও উপসর্গ না কমায় অনেক রোগীকে জেলা পর্যায়ে পাঠানো হচ্ছে। এতে প্রতিদিন বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে রোগীর চাপ বাড়ছে।
সিরাজগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. নুরুল আমিন জামান বলেন, নিউমোনিয়া ও হাম পরিস্থিতি বর্তমানে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে কাজীপুর উপজেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি। তিনি বলেন, ওই এলাকার অনেক মানুষ ঢাকার কোনাবাড়ী এলাকায় গার্মেন্টসে কাজ করেন। তারা বাড়িতে আসা-যাওয়া করায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার একটি সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা নতুন করে বাড়ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে কাজ চলছে। পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, বাড়িঘর ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা এবং দিনের বেলাতেও মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত থাকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, জ্বর হলেই আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। শিশুদের জ্বরের সঙ্গে শরীরে লালচে দাগ, বমি, অতিরিক্ত দুর্বলতা, খাবারে অনীহা, শ্বাসকষ্ট কিংবা অস্বাভাবিক আচরণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। একইভাবে ডেঙ্গুর ক্ষেত্রেও জ্বরকে সাধারণ জ্বর মনে না করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।
চিকিৎসকদের মতে, বর্তমানে হাম ও ডেঙ্গুর পাশাপাশি নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন মৌসুমি রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও বেড়েছে। ফলে সীমিত শয্যা ও জনবল দিয়ে অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। রোগীর চাপ কমাতে হাসপাতালের শয্যা ও জনবল বাড়ানোর পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসাসেবা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু হাসপাতালে চিকিৎসা দিয়ে এ পরিস্থিতি মোকাবিলা সম্ভব নয়। রোগ প্রতিরোধে পরিবার ও সমাজ পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। শিশুদের নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করা, বিশুদ্ধ পানি পান, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
তীব্র গরমের মধ্যে একদিকে বাড়ছে বিভিন্ন রোগের প্রকোপ, অন্যদিকে রোগীর চাপে বাড়ছে হাসপাতালের সংকট। মেঝেতে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের দৃশ্য যেন সেই চাপেরই বাস্তব চিত্র। চিকিৎসক-নার্সরা সাধ্যমতো সেবা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারি হাসপাতালগুলোর শয্যা, জনবল ও চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন রোগী ও স্বজনরা।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

সারাদেশ

মৌলভীবাজার জেলা ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক হলেন সাব্বির আহমেদ সামাদ

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: মৌলভীবাজার জেলা ছাত্রলীগের নতুন কমিটিতে প্রচার সম্পাদক পদে দায়িত্ব পেয়েছেন জেলার একনিষ্ঠ ও ত্যাগী ছাত্রনেতা সাব্বির আহমেদ সামাদ।
সারাদেশ

বদলে যাচ্ছে র‌্যাব: পরিবর্তন হচ্ছে নাম, লোগো ও পোশাক

নতুন রূপে আসছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। এ বাহিনীর নাম, লোগো ও পোশাক পরিবর্তনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়,