সারাদেশ

উত্তাল পদ্মার বুকে বাঁশের ভেলার কাফেলা, জিকির-গজলে আটরশির পথে জাকেররা

​শিমুল তালুকদার
সদরপুর (ফরিদপুর) প্রতিনিধি
​খরস্রোতা পদ্মার বুকে একের পর এক ভেসে চলছে বিশাল বিশাল বাঁশের ভেলা। কোনো ভেলায় মাইকে ধ্বনিত হচ্ছে ‘আল্লাহ আল্লাহ’ জিকির, কোথাও চলছে রান্নার আয়োজন। কোনো ভেলায় নামাজের প্রস্তুতি, আবার কোথাও গজলের সুরে সুরে চলছে দাঁড় টানা। রঙিন কাপড় ও বাহারি বাতিতে সাজানো কোনো কোনো ভেলায় আবার নির্মাণ করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন গেট। উত্তাল নদীর বুকে এমন দৃশ্য যেন এক ব্যতিক্রমী ভাসমান জনপদ।
​প্রতিবছর বর্ষা এলেই ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার পদ্মা নদীতে দেখা মেলে এমন অসংখ্য বাঁশের ভেলার কাফেলার। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসব ভেলা নদীপথ পাড়ি দিয়ে ছুটে যায় আটরশি বিশ্ব জাকের মঞ্জিল দরবার শরিফের উদ্দেশে।
​নদীপথেই যেন ভাসমান জীবনঃ
পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ নদ পেরিয়ে ছোট ছোট খাল ধরে এসব বাঁশের ভেলা প্রবেশ করে সদরপুর উপজেলার আটরশি দরবার শরিফে। দীর্ঘ এই যাত্রাপথে ভেলার ওপরই চলে খাবার রান্না, গোসল, নামাজ, বন্দেগি ও জিকির-আজকার। রাত-দিন পালা করে দাঁড় টেনে এগিয়ে চলে ভেলার কাফেলা।
​ভেলায় বহন করে আনা বাঁশগুলো পরবর্তী সময়ে আটরশির বাৎসরিক উরস শরিফে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়। এসব বাঁশ দিয়ে লক্ষাধিক মানুষের রান্নার জ্বালানি, সুবিশাল গেট, জাকেরানদের থাকার প্যান্ডেল, অজুখানা এবং পয়োনিষ্কাশনের জন্য অস্থায়ী বাথরুমসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় স্থাপনা তৈরি করা হয়।
​আশি বছরের ঐতিহ্যঃ
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৮০ বছর ধরে প্রতিবছর দেশের উত্তরাঞ্চলের কুড়িগ্রাম, রংপুর, নীলফামারী, গাইবান্ধা, পাবনাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আটরশি দরবারের ভক্তরা বাঁশের ভেলা নিয়ে এই দীর্ঘ নদীপথে যাত্রা করেন। করতোয়া, যমুনা, পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁসহ ছোট-বড় বেশ কয়েকটি নদ-নদী পাড়ি দিয়ে তারা পৌঁছান আটরশি দরবার শরিফে।
​ভেলায় আগত জাকের জামিরুল ইসলাম মানবজমিন-কে জানান, কোনো কোনো বাঁশের ভেলা আটরশিতে পৌঁছাতে ৮ থেকে ১০ দিন সময় লাগে। আবার কোনো কোনো জেলার ভেলা পৌঁছাতে সময় লাগে ২২ থেকে ২৫ দিন। তিনি বলেন, দীর্ঘ নদীপথের এই যাত্রায় বিভিন্ন জেলার স্থানীয় জাকেররা ট্রলার নিয়ে তাদের পাশে থাকেন। খাবার, চিকিৎসা ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা হয় নদীপথেই। কখনো প্রবল স্রোতে ভেলা এলোমেলো হয়ে গেলে ট্রলারের মাধ্যমে তাদের উদ্ধার করে আবার নদীর গতিপথে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
​এক ভেলায় তিন হাজার বাঁশঃ
বাঁশের ভেলায় আগত চিলমারীর ভক্ত রোকনুজ্জামান বলেন, “প্রতিবছর উরস শরিফ শেষ করে পরের বছরের উরসের জন্য আমরা জাকেরদের কাছ থেকে বাঁশ কেটে সংগ্রহ করি। বর্ষা মৌসুম এলেই সেসব বাঁশ একত্রিত করে বিশাল ভেলা তৈরি করা হয়। একেকটি বাঁশের ভেলায় প্রায় ৩ হাজার বাঁশ থাকে।”
​তিনি আরও বলেন, “নদীর পাড়ে ওয়াজ মাহফিলের মাধ্যমে সত্যের পতাকা উড়িয়ে আমরা দলবদ্ধভাবে রওনা দিই। একেকটি বাঁশের ভেলায় ৪০ থেকে ৫০ জন কর্মী দাঁড় টানার কাজে থাকেন। রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা পালা করে তারা দাঁড় টানেন। খাবার, গোসল, নামাজ, বন্দেগি, জিকির-আজকার—সবকিছুই চলে এই বাঁশের ভেলায়। আমাদের কাছে খুবই ভালো লাগে। আমি প্রায় প্রতিবছরই আসি।”
​ভেলায় ভেসে আসে ঐতিহ্যের দৃশ্যঃ
স্থানীয়রা জানান, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে সাজানো-গোছানো বাঁশের ভেলার সারি পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ নদ পেরিয়ে তাদের বাড়ির সামনে দিয়ে যায়। নদীর বুকে ভাসমান এসব ভেলা দেখতে সাধারণ মানুষের মধ্যেও তৈরি হয় দারুণ কৌতূহল।
​স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, দূর-দূরান্ত থেকে আসা এসব মানুষকে নদীপথে দিনের পর দিন ভ্রমণ করতে হয়। অনেক বয়স্ক মানুষও এই কাফেলায় থাকেন। শরীরে ক্লান্তি থাকলেও আটরশি দরবারের সীমানায় পৌঁছানোর সময় তাদের চোখেমুখে ফুটে ওঠে অন্যরকম আনন্দের ঝিলিক।
​উত্তাল পদ্মার স্রোত, দীর্ঘ নদীপথ আর নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে বাঁশের ভেলার এই কাফেলা যেন প্রতি বর্ষায় বহন করে নিয়ে আসে এক পুরোনো নদীপথের ঐতিহ্য—যেখানে ভাসমান ভেলার ওপরই চলে জিকির, গজল, নামাজ, রান্না ও পথচলা।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

সারাদেশ

মৌলভীবাজার জেলা ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক হলেন সাব্বির আহমেদ সামাদ

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: মৌলভীবাজার জেলা ছাত্রলীগের নতুন কমিটিতে প্রচার সম্পাদক পদে দায়িত্ব পেয়েছেন জেলার একনিষ্ঠ ও ত্যাগী ছাত্রনেতা সাব্বির আহমেদ সামাদ।
সারাদেশ

বদলে যাচ্ছে র‌্যাব: পরিবর্তন হচ্ছে নাম, লোগো ও পোশাক

নতুন রূপে আসছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। এ বাহিনীর নাম, লোগো ও পোশাক পরিবর্তনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়,