সারাদেশ

বাবার স্বপ্ন পূরণে চিকিৎসা সেবায় মানবিক ডাঃ অখিল সরকার

সাব্বির হোসাইন আজিজ, মাদারীপুরঃ বাবার স্বপ্ন ছিল ছেলে বড় হয়ে ডাক্তার হবে। সমাজের  অসুস্থ সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াবে। এবং  চিকিৎসাসেবা দিয়ে মানুষের জীবন বাঁচাবে। মৃত্যুর পরও যেন ছেলের ভালো কাজের মাধ্যমে মানুষ তাঁকে মনে রাখে এটাই ছিল বাবার  প্রত্যাশা। কিন্তু ছেলেকে ডাক্তার হিসেবে দেখার সেই স্বপ্ন পূরণের মুহূর্তটি দেখে যেতে পারেননি পিতা অনিল কুমার সরকার। তার আগেই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে তাঁকে পরকালে। তবে বাবার স্বপ্ন থেমে থাকেনি। মায়ের ত্যাগ, পরিবারের সংগ্রাম আর নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে সঙ্গী করে এগিয়ে গেছেন ছেলে অখিল সরকার। অভাব-অনটন, নানা প্রতিকূলতা এমনকি কখনো না খেয়ে থাকার পরিস্থিতিও তাঁকে লক্ষ্যচ্যুত করতে পারেনি। দীর্ঘ অধ্যবসায়ের পর অবশেষে চিকিৎসক হয়েছেন তিনি।
আজ সেই কেন্দুয়া গ্রামের সন্তানই মাদারীপুরের মানুষের চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত। তিনি মাদারীপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. অখিল সরকার। কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজের গ্রামের দরিদ্র ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন তিনি। রোগীর মুখে সুস্থতার হাসিই তাঁর কাছে, পেশাগত সাফল্যের পাশাপাশি প্রয়াত বাবার স্বপ্ন পূরণের একেকটি মুহূর্ত।
সংগ্রামের পথ পেরিয়ে চিকিৎসক
ডা. অখিল সরকার মাদারীপুর সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের চৌহদ্দি গ্রামের প্রয়াত অনিল কুমার সরকারের ছেলে। তাঁর বাবা চৌহদ্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তিনি তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে অখিল সরকার বড়।
১৯৯৭ সালে মাদারীপুর সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের কলাগাছিয়া গ্রামের এসি নর্থ কলাগাছিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পাস করেন তিনি। ১৯৯৯ সালে শহীদ স্মৃতি মহাবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এইচএসসি পাস করেন। পরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়ে ২০০৫ সালে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০০৬ সালে এক বছরের ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে ২৮তম বিসিএসের মাধ্যমে সরকারি চিকিৎসা ক্যাডারে যোগ দেন।তবে এই সাফল্যের পেছনে ছিল দীর্ঘ সংগ্রাম এবং পরিবারের ত্যাগ।
বাবার শেষ কথাই জীবনের প্রেরণা
ডা. অখিল সরকার বলেন,“আমার বাবা-মায়ের ইচ্ছে ছিল আমি ডাক্তার হবো এবং মানুষের সেবা করব। এই স্বপ্ন পূরণের জন্য আমার পরিবার অনেক কষ্ট করেছে। বিশেষ করে মা আমাদের লেখাপড়ার জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। আমিও অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে পড়াশোনা করেছি। কখনো না খেয়েও লেখাপড়া করেছি। কিন্তু লক্ষ্য থেকে সরে যাইনি।”বাবার শেষ সময়ের কথাগুলো আজও তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।“বাবা মৃত্যুর আগে আমাকে বলেছিলেন তুমি এমন লেখাপড়া করো, যাতে আমি মারা যাওয়ার পরও সেই লেখাপড়ার ফল ভোগ করতে পারি। মানুষ যেন আমাকে বলে, অনিল কুমার সরকারের ছেলে আমাদের সেবা-যত্ন করছে, চিকিৎসার মাধ্যমে মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে।”বাবা তাঁকে চিকিৎসক হিসেবে দেখে যেতে পারেননি এটাই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ। তবে মানুষের সেবা করার মধ্যেই বাবার সেই ইচ্ছার পূর্ণতা খুঁজে পান তিনি। তিনি আরও বলেন, আমার বাবা আমাকে ডাক্তার হিসেবে দেখতে পারেননি। এটা আমার সবচেয়ে বড় কষ্ট। কিন্তু আজ যখন মানুষের চিকিৎসা করি, অসুস্থ মানুষ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যায়, তখন মনে হয় আমি বাবার সেই ইচ্ছাটা পূরণ করতে পারছি।”
মায়ের ত্যাগের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “আমার মা আমাদের জন্য অনেক কষ্ট করেছেন। লেখাপড়ার জন্য তিনি অনেক ত্যাগ করেছেন। পরিবারও অনেক কষ্ট করেছে। তাঁদের সেই ত্যাগের কারণেই আজ আমি চিকিৎসক হতে পেরেছি। তাই মানুষের সেবা করার সুযোগ পাওয়াটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া।”
রোগীর মুখে চিকিৎসক অখিলের প্রশংসা
মাদারীপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা মোকলেস নামে এক রোগী বলেন, “অখিল স্যার আমাকে চেম্বারে নিয়ে খুব ভালোভাবে চিকিৎসা দিয়েছেন। এমনভাবে রোগীকে সময় দিয়ে দেখা অনেক ডাক্তারই করেন না। আমার কাছ থেকে কোনো টাকা-পয়সাও নেননি। তাঁর ব্যবহারে আমরা মুগ্ধ। সব হাসপাতালের ডাক্তাররা যদি এভাবে রোগীদের সঙ্গে আন্তরিকভাবে আচরণ করতেন, তাহলে চিকিৎসা পাওয়ার আগেই রোগীরা অনেকটা মানসিকভাবে স্বস্তি পেতেন।”
স্থানীয় বাসিন্দাদেরও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানা যায়। কেন্দুয়া এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, “তিনি আমাদের এলাকার গর্ব। শুক্রবার এলেই গ্রামের মানুষের খোঁজখবর নেন। অনেককে বিনা টাকায় চিকিৎসা দেন। অসুস্থ মানুষের কথা মন দিয়ে শোনেন। তাঁর মতো একজন চিকিৎসক আমাদের এলাকায় আছেন এটাই আমাদের জন্য বড় পাওয়া।”
৯০ বছর বয়সী মালতি বালা বলেন, “ডাক্তার অখিল আমারে চিকিৎসা দিছে। সে অনেক ভালো মানুষ। আমাগো এলাকার ছেলে, তাই আমাগো কথা মন দিয়া শোনে।”
অরিন কুমার মণ্ডল বলেন, “প্রতি শুক্রবার আমরা তাঁর অপেক্ষায় থাকি। কখন আসবেন, কখন চিকিৎসা দেবেন—এটা গ্রামের মানুষের মধ্যে এক ধরনের আগ্রহ থাকে। তিনি এলে অনেক মানুষ তাঁর কাছে চিকিৎসা ও পরামর্শ নিতে আসে।”
ছেলের সাফল্যে মায়ের চোখে স্বপ্নপূরণের আনন্দ
ডা. অখিলের মা দীপ্তি রানী সরকার বলেন, তাঁর স্বামীর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল ছেলে ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করবে। অখিলের বাবার স্বপ্ন ছিল ছেলে বড় হয়ে মানুষের সেবা করবে। শিক্ষক থাকা অবস্থায় আমাদের এলাকার অনেক মানুষকে চিকিৎসার অভাবে কষ্ট পেতে দেখেছে। সেখান থেকেই তার মনে স্বপ্ন হয়েছিল, ছেলেকে চিকিৎসক বানাবে। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। কিন্তু যে মানুষটা স্বপ্ন দেখেছিল, সে আজ নেই। অখিল ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করছে, মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে এটাই আমাদের কাছে সবচেয়ে বড় পাওয়া।”

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

সারাদেশ

মৌলভীবাজার জেলা ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক হলেন সাব্বির আহমেদ সামাদ

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: মৌলভীবাজার জেলা ছাত্রলীগের নতুন কমিটিতে প্রচার সম্পাদক পদে দায়িত্ব পেয়েছেন জেলার একনিষ্ঠ ও ত্যাগী ছাত্রনেতা সাব্বির আহমেদ সামাদ।
সারাদেশ

বদলে যাচ্ছে র‌্যাব: পরিবর্তন হচ্ছে নাম, লোগো ও পোশাক

নতুন রূপে আসছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। এ বাহিনীর নাম, লোগো ও পোশাক পরিবর্তনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়,