সাত সমুদ্রের দূরত্ব হার মানল ভালোবাসার কাছে
সাব্বির হোসাইন আজিজ, মাদারীপুরঃ ভালোবাসার কি কোনো সীমানা আছে? ভাষা, সংস্কৃতি কিংবা দেশের মানচিত্র কোনোটিই কি পারে হৃদয়ের টানকে আটকে রাখতে? মাদারীপুরের এক তরুণী আর সুদূর চীনের এক যুবকের গল্প যেন সেই চিরচেনা প্রশ্নেরই নতুন উত্তর। হাজার হাজার কিলোমিটারের পথ পেরিয়ে, অচেনা দেশের অচেনা মানুষের টানে বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখেছেন চীনের হেনান শহরের নাগরিক ওয়াং এরলিং। উদ্দেশ্য একটাই প্রেমের মানুষ হাফিজা আক্তারকে জীবনসঙ্গী করা। আর সেই স্বপ্ন পূরণে ইসলাম গ্রহণ করে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। ভিনদেশি এই প্রেমিকের আগমন ঘিরে এখন মাদারীপুরের মস্তফাপুর ইউনিয়নের চাপাতলী গ্রামে বইছে কৌতূহলের হাওয়া। শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকালে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, কনের বাড়িতে ভিড় করছেন উৎসুক মানুষ। কেউ দেখতে চান চীনা জামাইকে, কেউ তাঁর সঙ্গে কথা বলতে, আবার কেউ স্মৃতি ধরে রাখতে তুলছেন সেলফিও।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়, অতঃপর হৃদয়ের লেনদেন ঘটনার শুরু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ভার্চুয়াল জগতের পরিচয় যে কখনো কখনো বাস্তব জীবনের গভীর সম্পর্কের সেতু হয়ে ওঠে, হাফিজা আর চীনা যুবকের গল্প যেন তারই এক উদাহরণ। পরিচয়ের পর নিয়মিত কথোপকথন, মনের কথা ভাগাভাগি আর পারস্পরিক বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে তাঁদের ভালোবাসার সম্পর্ক। দূরত্ব ছিল দুই দেশের, ভাষা ছিল ভিন্ন, সংস্কৃতিও আলাদা তবু কথার আড়ালে তৈরি হয় এক অদৃশ্য মায়ার বাঁধন। একপর্যায়ে চীনা যুবক নিজের পরিবারের সঙ্গে হাফিজার যোগাযোগ করিয়ে দেন। এতে তাঁর প্রতি হাফিজা ও তাঁর পরিবারের আস্থা আরও দৃঢ় হয়। পরে বিয়ের প্রস্তাব দেন ওই যুবক। হাফিজা বিষয়টি পরিবারকে জানালে তাঁরাও সম্মতি দেন। এরপর আর ভার্চুয়াল জগতের কথোপকথনে সীমাবদ্ধ থাকেনি তাঁদের সম্পর্ক; ভালোবাসাকে বাস্তবের আঙিনায় নিয়ে আসতে চীন থেকে বাংলাদেশে আসার সিদ্ধান্ত নেন ওই যুবক।
১৫ অক্টোবর বিমানবন্দরে আগমন, গ্রামে গ্রামে কৌতূহল। ঢাকার বিমানবন্দর থেকে চীনা যুবককে স্বাগত জানিয়ে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে আসেন হাফিজার পরিবারের সদস্যরা। এরপর থেকেই মস্তফাপুর ইউনিয়নের চাপাতলী এলাকায় শুরু হয় তাঁকে ঘিরে নানা আলোচনা। খবর ছড়িয়ে পড়তেই আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ ছুটে আসতে থাকেন কনের বাড়িতে। কারও চোখে বিস্ময়, কারও মুখে প্রশ্ন, আবার কারও কৌতূহলের শেষ নেই। বিদেশি জামাইয়ের সঙ্গে দু-চার কথা বলার সুযোগ পেয়ে কেউ হাসিমুখে ছবি তুলছেন, কেউ আবার সেই ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। সব মিলিয়ে হাফিজাদের বাড়ি যেন পরিণত হয়েছে স্থানীয় মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রে। যে সম্পর্কের শুরু হয়েছিল মোবাইলের পর্দায়, সেই সম্পর্কের মানুষটিকে এখন সামনাসামনি দেখে অনেকের কাছেই ঘটনাটি রীতিমতো ব্যতিক্রমী। গ্রামের চেনা পরিবেশে ভিনদেশি এক যুবকের উপস্থিতি যেন যোগ করেছে নতুন এক গল্পের রং।
স্থানীয় আল-আমিন, সাইদুল, রুবিনাসহ বেশ কয়েকজন বলেন, “চীন থেকে একজন নাগরিক আমাদের মাদারীপুরে এসেছেন। তিনি এখানকার এক মেয়ের প্রেমে পড়েছেন। ওই ছেলেটি এখন মুসলমান হয়ে মেয়েটিকে বিয়ে করতে চান। তবে আমরা অনেক সময় বিভিন্ন সংবাদে দেখি, বিয়ের পর কেউ কেউ পালিয়ে যান, আবার কাউকে বিদেশে নিয়ে বিক্রি করে দেওয়ার আশঙ্কাও থাকে। তাই শরিয়তসম্মতভাবে এবং প্রশাসনের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে বিয়ের কাজটি সম্পন্ন হোক—এটাই আমরা চাই। চীনা নাগরিক মাদারীপুরে এসেছেন, বিষয়টি আমাদের কাছে ভালো লাগছে। ”বিয়ের আগে কাগজপত্র যাচাই, পরিবারের সতর্ক অবস্থান।
হাফিজা আক্তার জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের পর তাঁদের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও বোঝাপড়া তৈরি হয়। সেই সম্পর্ক থেকেই তাঁরা বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। তবে আবেগের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন তাঁরা।
হাফিজার তথ্য অনুযায়ী, চীনা যুবকের পরিচয় ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই-বাছাই এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর ধর্মীয় রীতি মেনে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে চান তাঁরা। তাঁর দাবি, যুবক ইসলাম গ্রহণ করে তাঁকে বিয়ে করবেন।
‘ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্ত স্বেচ্ছায়’ বাংলাদেশে এসে এখানকার মানুষের আন্তরিকতা ও পারিবারিক উষ্ণতায় মুগ্ধ হওয়ার কথা জানিয়েছেন চীনা যুবক ওয়াং এরলিং। তিনি বলেন, ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্ত তাঁর নিজের এবং তিনি স্বেচ্ছায় এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। হাফিজাকে জীবনসঙ্গী করে সুখী ও সুন্দর সংসার গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন তিনি।
তবে বিয়ের আগে পরিচয় ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই-বাছাইয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন হাফিজার পরিবারও।
হাফিজার মা বিউটি বেগম জানান, মেয়ের সুখের কথা বিবেচনা করেই তাঁরা বিয়েতে সম্মতি দিয়েছেন। তবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে সবকিছু নিশ্চিত হওয়ার পরই বিয়ের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে চান তাঁরা। মেয়ের ভবিষ্যৎ যেন সুন্দর ও নিরাপদ হয়, সেটিই তাঁদের প্রধান বিবেচনা।
এ বিষয়ে মাদারীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ জানান, “বিষয়টি আমরা শুনেছি। তবে এখনো পরিবারের কেউ আমাদের কাছে অবহিত করেনি। অবহিত করলে আমরা খোঁজখবর নিয়ে দেখব।”
প্রেমের গল্পে মজেছে এলাকা, অপেক্ষা বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার মানচিত্রে দূরত্ব যতই দীর্ঘ হোক, হৃদয়ের টান যে কখনো কখনো মানুষকে হাজার মাইল পাড়ি দিতে উদ্বুদ্ধ করে—হাফিজা আর চীনা যুবকের গল্প এখন মাদারীপুরের মানুষের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ানো তেমনই এক আলোচিত উপাখ্যান। এখন তাঁদের সম্পর্কের পরবর্তী ধাপ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই এবং বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন দুই পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় মানুষ।





