সিরাজগঞ্জে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল বিতরণে ডিলারের অনিয়ম
ওয়াসিম সেখ, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি:
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার রতনকান্দি ইউনিয়নের কুড়িপাড়ায় সরকারি খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে ডিলার সোহাগ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. রবিউল হাসানের বিরুদ্ধে। উপকারভোগীদের অভিযোগ, নির্ধারিত সময়ে চাল না পাওয়া, কার্ড যাচাই ছাড়াই চাল বিতরণ, এক ব্যক্তির একাধিক কার্ড নিয়ে চাল উত্তোলন এবং উপকারভোগীদের কাছ থেকে চাল কিনে নেওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। বিতরণকেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত ট্যাগ অফিসারকে উপস্থিত না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) সরেজমিনে কুড়িপাড়ায় ডিলারের কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, সরকারি চাল নিতে কার্ডধারীদের ভিড় জমেছে। কার্যালয়ের ভেতরে কার্ড জমা নিয়ে চাল বিতরণ করা হচ্ছিল। তবে কার্ডধারীদের পরিচয় যাচাই, একাধিক কার্ড নিয়ে চাল উত্তোলন এবং বিতরণ কার্যক্রম তদারকির বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। অভিযোগ রয়েছে, ৪৫০ টাকার বিনিময়ে ৩০ কেজি চালের বস্তা দেওয়া হচ্ছে এ সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত ট্যাগ অফিসারকেও কার্যালয়ে পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল বিতরণে নিয়মনীতি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না। কোনো কোনো ব্যক্তি একাধিক কার্ড নিয়ে চাল তুলছেন। আবার উপকারভোগীদের কেউ চাল বিক্রি করতে গেলে ডিলার নিজেই তা কিনে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকারি সহায়তার চাল প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছানোর কথা থাকলেও এ ধরনের অভিযোগে কর্মসূচির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ ছাড়া কিছু কার্ডধারী নির্ধারিত সময়ে চাল না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। তাঁদের দাবি, চাল বিতরণের তারিখ সম্পর্কে যথাসময়ে জানানো হয় না। এতে নিম্নআয়ের পরিবারগুলো সরকারি খাদ্যসহায়তা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়ছেন।
বাহুকা গ্রামের সাইদুল ইসলাম বলেন, গত ৭ এপ্রিল আমি চাল পেয়েছিলাম। এর মধ্যে দুইবার চাল বিতরণ করা হলেও আমাকে চাল দেওয়া হয়নি। আজ অনেক কষ্টে চাল পেয়েছি।
মহিষামুড়া গ্রামের গোলাম সারোয়ার বলেন, আমি এপ্রিল মাসের ১১ তারিখে চাল পেয়েছিলাম। এরপর এপ্রিল মাসে আমাকে চাল দেওয়া হয়নি। এরকম অনেক গ্রাহকের চাউলে তিনি দেন না।
একই গ্রামের মো. রবিউল আলম বলেন, গত সেপ্টেম্বর মাসের চাল পাইনি। ডিলার আমাদের চাল বিক্রি করে দিতে বলেন। আমরা চাল বিক্রি করতে চাই না। অথচ কবে চাল দেওয়া হবে, সে বিষয়ে আমাদের কোনো তথ্য দেওয়া হয় না।
উপকারভোগীদের এসব বক্তব্যে চাল বিতরণের তালিকা, কার্ডের বিপরীতে বরাদ্দ এবং প্রকৃত বিতরণের হিসাব যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সরেজমিন তদন্ত জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল বিতরণ কার্যক্রম তদারকির দায়িত্বে থাকা ট্যাগ অফিসারকে বিতরণকেন্দ্রে উপস্থিত পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার উপস্থিতি ছাড়া বিতরণ কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হচ্ছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সরকারি খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল নির্ধারিত উপকারভোগীদের কাছে সরকারি নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করার কথা। এ কর্মসূচির চাল বিতরণে অনিয়ম, আত্মসাৎ কিংবা নিয়মবহির্ভূত কেনাবেচার অভিযোগ পাওয়া গেলে বরাদ্দ, বিতরণ রেজিস্টার, কার্ডধারীদের তালিকা এবং মজুতের হিসাব যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
অভিযোগের বিষয়ে সোহাগ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. রবিউল হাসান বলেন, আমি কোনো দুর্নীতি বা অনিয়ম করছি না। আপনারা যা লেখার লেখেন, আমার কোনো সমস্যা নেই।
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক শাব্বীর আহমেদ মুরাদ বলেন, আমি আজ এ ধরনের অভিযোগ পেয়েছি। সেখানে ট্যাগ অফিসারকে উপস্থিত থাকতে বলেছি। আপনার কাছে এ বিষয়ে কোনো তথ্য থাকলে আমাকে দেন, আমি ব্যবস্থা নিচ্ছি।
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মামুন খান বলেন, এর আগেও তাঁকে একবার শোকজ করা হয়েছিল। এরপরও তিনি ভালো হননি। তাঁর বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সরকারি খাদ্যসহায়তা প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, কার্ডের বিপরীতে চাল বিতরণের হিসাব যাচাই এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার উপস্থিতি নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে যেসব কার্ডধারী চাল পাওয়ার কথা থাকলেও পাননি, তাঁদের প্রাপ্য চাল নিশ্চিত করা এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
এখন প্রশ্ন হলো, আগেও শোকজের মুখে পড়া এই ডিলারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো তদন্তে কী উঠে আসে এবং সরকারি খাদ্যসহায়তা বিতরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয়।





