ডিবি পরিচয়ের আড়ালে জিম্মি বাণিজ্য, তারাগঞ্জে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ
জুয়েল ইসলাম, তারাগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি:
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলায় এক ব্যক্তিকে ডিবি (গোয়েন্দা পুলিশ) পরিচয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে অপহরণ, নির্জন স্থানে নিয়ে মারধর, জোরপূর্বক অপরাধ স্বীকারের ভিডিও ধারণ, রাতভর জিম্মি করে রাখা এবং শেষ পর্যন্ত মোটরসাইকেল বন্ধক রেখে এক লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।এ ঘটনায় দুইজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৪ থেকে ৫ জনের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী।
অভিযোগকারী মো. আব্দুল হামিদ (৩৫) উপজেলার ভীমপুর শৈলবাড়ী মৌলভীপাড়া এলাকার বাসিন্দা। তিনি গত ২রা আগস্ট তারাগঞ্জ থানায় দায়ের করা অভিযোগে রাব্বি (৪৮) ও আসাদুলকে প্রধান অভিযুক্ত করে মামলা গ্রহণের আবেদন করেন।
লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ১লা আগস্ট রাত আনুমানিক ৯টার দিকে মোবাইল ফোনের কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে মোটরসাইকেল যোগে নতুন চৌপথির দিকে যাচ্ছিলেন আব্দুল হামিদ। পথে পূর্বপরিচিত রাব্বি তার মোটরসাইকেলের গতিরোধ করে কিছুক্ষণ কথা বলেন এবং সামনে একটি চায়ের দোকানে বসার প্রস্তাব দেন।
চায়ের দোকানে পৌঁছানোর পর আগে থেকেই ওত পেতে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি তাকে ঘিরে ফেলেন। পরে জোরপূর্বক তাকে উপজেলার ২ নম্বর কুর্শা ইউনিয়নের একটি শ্মশানঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে মারধর করা হয় এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন করে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করিয়ে ভিডিও ধারণ করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ভিডিও ধারণের পর তাকে অভিযুক্ত রাব্বির বাড়িতে নিয়ে রাতভর আটকে রাখা হয়। সেখানে প্রথমে তার কাছে চার লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। পরে দরকষাকষির একপর্যায়ে পরদিন সকালে তাকে সঙ্গে নিয়ে তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেল স্থানীয় এক দাদন ব্যবসায়ীর কাছে বন্ধক রেখে এক লাখ টাকা সংগ্রহ করা হয়। ওই টাকা অভিযুক্তদের হাতে তুলে দেওয়ার পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী মো. আব্দুল হামিদ বলেন, “আমি চরম আতঙ্কের মধ্যে ছিলাম। তারা নিজেদের প্রভাবশালী পরিচয় দিয়ে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখিয়েছে। প্রাণে বাঁচার জন্য তাদের কথামতো চলতে বাধ্য হয়েছি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে পরে থানায় লিখিত অভিযোগ করেছি। এখন আমি আমার ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন।” তিনি আরও বলেন, “এই সংঘবদ্ধ চক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে আরও নিরীহ মানুষ একইভাবে হয়রানির শিকার হতে পারেন।”
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অভিযোগে নাম থাকা রাব্বি ও আসাদুলের নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে বলে জনমনে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, তাদের বিরুদ্ধে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, দাঙ্গা সৃষ্টি, জোরপূর্বক দোকানঘর দখল, প্রতারণা, মাদকসেবী ও মাদক কারবারিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দার অভিযোগ, চক্রটি বিভিন্ন সময় নারীদের ব্যবহার করে তথাকথিত ‘হানি ট্র্যাপ’ তৈরি করে মানুষকে ফাঁদে ফেলে অর্থ আদায় করে থাকে। অভিযোগ রয়েছে, প্রধান অভিযুক্ত রাব্বি মাঝে মাঝে নিজেকে ডিবি পুলিশের সদস্য পরিচয় দিয়ে কিংবা ডিবির ভয় দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অর্থ আদায় করতেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত রাব্বি ও আসাদুলের বক্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ফলে এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য জানা যায়নি।
তারাগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রুহুল আমিন বলেন, “একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না।”
ঘটনার পর পুরো এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহল নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।




