তারাগঞ্জে ২ লাখ টাকার মাঠ ভরাট প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ
জুয়েল ইসলাম, তারাগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধিঃ
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার আলমপুর ইউনিয়নে ইউনিয়ন উন্নয়ন সহায়তা তহবিলের ২ লাখ টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্প ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তেঁতুলতলা উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠ ভরাটের জন্য সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হলেও বাস্তবে প্রয়োজনীয় পরিমাণ মাটি ফেলা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা, অভিভাবক, শিক্ষক ও জনপ্রতিনিধিরা। অভিযোগের পর বিষয়টি তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। একই সঙ্গে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রকল্পের বিল পরিশোধ না করার কথা জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতি বর্ষা মৌসুমেই তেঁতুলতলা উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এতে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত এবং পাঠদান ব্যাহত হয়। সমস্যা সমাধানে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ উপজেলা প্রশাসনের কাছে মাঠ ভরাটের আবেদন জানালে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) প্রাক্কলন প্রস্তুত করে। পরে ইউনিয়ন উন্নয়ন সহায়তা তহবিল থেকে ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে প্রকল্পটি অনুমোদন করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পটি আলমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. রবিউল ইসলাম রাসেলের তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়ন করা হলেও বরাদ্দের তুলনায় অনেক কম পরিমাণ মাটি ফেলা হয়েছে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও মাঠের অবস্থার তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি।
বুধবার (৫ আগস্ট) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মাঠজুড়ে এখনও হাঁটুসমান পানি জমে রয়েছে। একই মাঠ ব্যবহার করে তেঁতুলতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও বিদ্যালয়ে যাতায়াত করে। অনেক শিশুকে হাঁটুসমান পানি মাড়িয়ে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে দেখা যায়। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রকল্পটি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে এমন পরিস্থিতি থাকার কথা নয়।
বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক ও অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য আনিসুল হক বলেন, “আমি নিয়মিত সন্তানকে বিদ্যালয়ে নিয়ে যাই। মাঠে যে পরিমাণ মাটি ফেলা হয়েছে, তাতে সর্বোচ্চ ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকার কাজ হয়েছে বলে মনে হয়েছে। ২ লাখ টাকার কাজের কোনো প্রতিফলন চোখে পড়ছে না।”
হাজীপাড়া এলাকার বাসিন্দা ও অভিভাবক জোবায়দুল ইসলাম বলেন, “যদি প্রকৃত অর্থেই ২ লাখ টাকার কাজ হয়ে থাকে, তাহলে মাঠে এখনও হাঁটুসমান পানি জমে থাকার প্রশ্নই ওঠে না। বাস্তব কাজ ও বরাদ্দের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে বলে মনে হচ্ছে।”
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক বলেন, মাঠে যে পরিমাণ মাটি ফেলা হয়েছে, তা প্রকল্পের বরাদ্দের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাদের দাবি, বর্ষার পানি আগের মতোই মাঠে জমে থাকছে, যা কাজের মান নিয়েই প্রশ্ন তৈরি করেছে।
এদিকে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্য মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, “কাগজে-কলমে আমাকে সভাপতি করা হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়ে আমাকে কিছুই জানানো হয়নি। কাজ কীভাবে হয়েছে, কত টাকা ব্যয় হয়েছে—কোনো বিষয়েই আমি অবগত নই।”
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আলমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. রবিউল ইসলাম রাসেল। তিনি বলেন, “সরকারি বিধি-বিধান অনুসরণ করেই সম্পূর্ণ ২ লাখ টাকার কাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। প্রকল্পে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়নি।”
তারাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মোনাব্বর হোসেন বলেন, “অভিযোগটি আমাদের নজরে এসেছে। এলজিইডির প্রাক্কলন, মাঠে ফেলা মাটির পরিমাণ, কাজের মান এবং ব্যয়ের হিসাব যাচাই করে তদন্ত করা হবে। তদন্তে কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রকল্পের বিল পরিশোধ করা হবে না।”
স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পে ব্যবহৃত মাটির পরিমাণ, বিল-ভাউচার, ব্যয়ের হিসাব, এলজিইডির প্রাক্কলনসহ সব নথি যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক। অভিযোগের সত্যতা মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করারও দাবি জানান তারা।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, জনগণের করের অর্থে পরিচালিত উন্নয়ন প্রকল্পে কোনো ধরনের অনিয়ম বা অপচয়ের সুযোগ থাকা উচিত নয়। তাই এ ঘটনায় দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র তুলে এনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।




