সাইবার অপরাধের অন্ধকারে সচেতনতার আলো জ্বালাচ্ছেন ফেরদৌস তাহসিন
আসাদুল্লাহ হাসান মুসা,বিশেষ প্রতিনিধিঃ-
ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবন যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি নীরবে বেড়েছে এক নতুন ধরনের ঝুঁকি-সাইবার অপরাধ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ই-মেইল, মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন কেনাকাটা কিংবা ব্যক্তিগত ডেটা সংরক্ষণ-সবকিছুই আজ ইন্টারনেটনির্ভর। কিন্তু এই নির্ভরতার সুযোগ নিয়েই প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ নানাভাবে প্রতারিত হচ্ছে, যার অনেকটাই তারা আগে থেকে বুঝে উঠতে পারে না।
বর্তমানে মানুষ যে সাইবার সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হচ্ছে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়া, ভুয়া আইডি খুলে হয়রানি, ফিশিং লিংকের মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য চুরি, মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়া, অনলাইন প্রতারণা এবং ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্য ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইলের মতো ঘটনা। অনেক সময় একটি ছোট অসতর্কতা—যেমন দুর্বল পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা, অচেনা লিংকে ক্লিক করা কিংবা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ব্যক্তিগত তথ্য অনলাইনে শেয়ার করা—একটি বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এই সাইবার অপরাধের প্রভাব কেবল আর্থিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। অনেক ভুক্তভোগী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন, দীর্ঘদিন আতঙ্কে ভোগেন এবং সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হন। বিশেষ করে নারীরা ভুয়া আইডি ও তথ্য অপব্যবহারের কারণে বেশি মানসিক ও সামাজিক চাপের মুখে পড়েন। আবার অনেক মানুষ জানেনই না—এই ধরনের সমস্যায় পড়লে কোথায় যাবেন, কীভাবে শুরু করবেন বা আদৌ কোনো সমাধান পাওয়া সম্ভব কি না।
এই বাস্তবতার মাঝেই নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন রংপুরের একজন সাইবার এক্সপার্ট ফেরদৌস তাহসিন। তিনি অনলাইন অ্যাকাউন্ট সিকিউরিটি, ডিজিটাল সমস্যা সমাধান এবং সাইবার সচেতনতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তি পর্যায়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে আসছেন। তার ঠিকানা রংপুর সদর সিটি কর্পোরেশনের দর্শনা মোর এলাকায়, ওয়ার্ড নম্বর ১৫। কোনো বড় প্রচার বা আলোচনার বাইরে থেকেই তিনি প্রতিদিন অসংখ্য ভুক্তভোগীকে সহায়তা করে যাচ্ছেন।
ফেরদৌস তাহসিনের সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে কাজ শুরু কোনো করপোরেট লক্ষ্য বা পরিকল্পিত ক্যারিয়ার পথ থেকে নয়। নিজের এবং পরিচিতজনদের অনলাইন সমস্যার অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি উপলব্ধি করেন—ডিজিটাল দুনিয়ায় সামান্য অজ্ঞতা কত বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। সেই অভিজ্ঞতাই তাকে ধীরে ধীরে এই খাতে যুক্ত করে এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে করতেই তিনি নিজেকে একজন দক্ষ সাইবার এক্সপার্ট হিসেবে গড়ে তোলেন।
তার কাছে সাফল্যের মানদণ্ড খুব সাধারণ কিন্তু গভীর। কোনো সনদ বা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির চেয়ে তার কাছে সবচেয়ে বড় অর্জন হলো—যখন কোনো ভুক্তভোগী তার হারানো অ্যাকাউন্ট ফিরে পায় অথবা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পায়। তার ভাষায়, মানুষের কৃতজ্ঞতা আর স্বস্তির নিঃশ্বাসই তার কাজের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
বর্তমানে সাইবার অপরাধের কারণে মানুষ যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তা তিনি খুব কাছ থেকে দেখছেন। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির শিকারই হন না, বরং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন, আত্মবিশ্বাস হারান এবং সামাজিক সম্মান নষ্ট হওয়ার ভয় নিয়ে বাঁচেন। এই বাস্তব অভিজ্ঞতাই তাকে আরও দায়িত্বশীল করে তুলেছে।
কেউ সাইবার সমস্যার শিকার হলে ফেরদৌস তাহসিন প্রথমেই সমস্যার মূল কারণ শনাক্ত করার চেষ্টা করেন। কীভাবে অ্যাকাউন্ট হ্যাক হলো, কোন জায়গায় নিরাপত্তার ঘাটতি ছিল, কোথায় ব্যবহারকারীর অসতর্কতা কাজ করেছে—এসব বিষয় তিনি ধাপে ধাপে ভুক্তভোগীকে বুঝিয়ে দেন। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী নিরাপত্তামূলক গাইডলাইন দেন এবং অ্যাকাউন্ট রিকভারি ও রিপোর্টিং প্রসেসে সহায়তা করেন, যাতে ভুক্তভোগী সঠিক পথে এগোতে পারেন।
এই সহায়তার বড় একটি অংশই তিনি সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে করে থাকেন। অনেক সময় কোনো আর্থিক বিনিময় ছাড়াই তিনি মানুষকে সাহায্য করেন, কারণ তার মতে ডিজিটাল নিরাপত্তা কেবল ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি সামাজিক সচেতনতারও অংশ।
দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি মনে করেন, সাইবার অপরাধ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সচেতনতা। তিনি সবসময় মানুষকে শক্তিশালী ও ইউনিক পাসওয়ার্ড ব্যবহারের পরামর্শ দেন, টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন চালু রাখতে বলেন এবং সন্দেহজনক লিংক ও লোভনীয় অফার এড়িয়ে চলার ওপর গুরুত্ব দেন। তার মতে, অনলাইনে একটু সতর্ক থাকলেই অনেক বড় বিপদ এড়ানো সম্ভব।
বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ না করার ওপর তিনি জোর দেন। কারণ অনেক সময় এসব তথ্যই সাইবার অপরাধীদের জন্য সবচেয়ে সহজ অস্ত্র হয়ে ওঠে।
ডিজিটাল যুগে তরুণদের জন্য সাইবার সিকিউরিটিকে তিনি একটি সম্ভাবনাময় ও দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার হিসেবে দেখেন। তার মতে, প্রযুক্তির ব্যবহার যত বাড়ছে, ততই দক্ষ সাইবার এক্সপার্টের প্রয়োজন বাড়ছে। তবে এই খাতে আসতে হলে শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতা নয়, ধৈর্য, শেখার আগ্রহ এবং মানুষের উপকার করার মানসিকতা থাকতে হবে।
ফেরদৌস তাহসিন মূলত ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতা ও সহায়তার কাজ করে থাকেন। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করতে ভুক্তভোগীদের পথ দেখান, যাতে তারা সঠিক ও নিরাপদ সমাধানের দিকে যেতে পারেন। তার কাজের মূল লক্ষ্য একটাই—ডিজিটাল সমস্যায় পড়ে যেন কেউ নিজেকে একা মনে না করে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে তার বার্তাটি খুবই স্পষ্ট ও সময়োপযোগী। তিনি বলেন, “ডিজিটাল দুনিয়ায় নিরাপত্তা কোনো অপশন না, এটি একটি প্রয়োজন। সচেতন থাকুন, শিখুন এবং নিজের তথ্য নিজেই রক্ষা করুন। একটু সতর্কতাই আপনাকে বড় বিপদ থেকে বাঁচাতে পারে।”
অনলাইন প্রতারণা আর সাইবার ঝুঁকিতে ভরা এই সময়ে ফেরদৌস তাহসিনের মতো নীরব কর্মীরাই ধীরে ধীরে মানুষের আস্থার জায়গা হয়ে উঠছেন। প্রযুক্তির জটিল এই দুনিয়ায় সচেতনতা ও মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়াই যে সবচেয়ে বড় শক্তি—তার কাজই তার প্রমাণ।





