কয়লার ব্যবহার এবং আগামীর ভাবনা
কাজী ফারহান হায়দার
কয়লার ব্যবহার সম্পর্কে জানার আগে জানতে হবে কয়লা কি? এর গঠন প্রকৃতি সম্পর্কে।
কয়লা হচ্ছে স্তরীভূত শিলা। এটি উদ্ভিদের পরিবর্তিত অবশেষ ও খনিজ দ্রব্য মিশ্রিত পদার্থ নিয়ে গঠিত। পৃথিবীর প্রায় সব অঞ্চলেই কয়লা পাওয়া যায়।
কয়লার স্তর গঠনের জন্য কিছু বিষয় লক্ষ্য করা যায়।
১) উদ্ভিদের অবশেষ যেখানে জমে সেখানে দীর্ঘ দিন ধরে জমা এবং এর স্তরবৃদ্ধির উপযোগী পরিবেশ থাকা।
২) উদ্ভিদের একীভূত অবশেষের ক্ষয়প্রাপ্তি হতে সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকা। সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকলে ইহা কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂), মিথেন (CH₄), পানি (H₂O) ইত্যাদিতে পরিণত হয়ে যেতে পারে।
৩) উদ্ভিদের অবশেষ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পলির নিচে এদের অবস্থান থাকা দরকার ।
আমাজন নদীর বদ্বীপ অঞ্চলে ভাসকুলার ক্রিসপোপ্রাম জাতীয় উদ্ভিদ, ফার্ণ জাতীয় গাছ, হর্সটেইল, ক্লাব- ম্স, সাইকোও জাতীয় উদ্ভিদ প্রচুর জন্মে ব্যাপক বৃদ্ধি ঘটে। এজাতীয় উদ্ভিদ গভীর মাটিতে শিকড়ে প্রবেশ করে নিজেদের প্রয়োজনীয় মৌলিক পদার্থসমূহকে বের করে আনে এবং ক্ষারহীন করে। উদ্ভিদের পচা কঙ্কাল হতে নিঃসৃত এসিড মাটির চুন ও ম্যাগনেসিয়ামকে দ্রবীভূত করে ফলে এটি মাটির নিচে চলে যায়। মাটিতে পড়ে যাওয়া উদ্ভিদ সমূহ জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয় এবং আংশিকভাবে বিভিন্ন গ্যাসে হাইড্রোকার্বন, H2S, CO2, NH3 ও পানিতে পরিণত হয়। মাটির কিছু নিচে ক্ষয়প্রাপ্ত কিছু জঞ্জাল একীভূত হয়ে যে হিউমিক এসিড তৈরি করে তা জীবাণুদের কার্যে বাঁধা প্রদান করে ফলে জৈব পদার্থ সমূহ পূর্ণ ভাবে পড়ে না এবং এর বিয়োজন সম্ভব হয় না।
উদ্ভিজ জঞ্জাল স্তুপের উচ্চতা বা পুরত্ব বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নিচের স্তরসমূহ ক্রমাগত চাপে দৃঢ়তর হতে থাকে ও নিষ্কাশনে পানি বের হয়ে পড়ে এবং অবশেষ সমূহ চূর্ণীকৃত হয়ে যায় এভাবে তৈরি হয় কয়লা।
কয়লা সিমের তিনটি উপাদান আছে
১) উজ্জ্বল বা ব্রাইট কয়লা এটি অতি উজ্জ্বল ভঙ্গুর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত হয়ে যায়।
২) অনুজ্জ্বল বা ভালো কয়লা এটি কালো অনুজ্জ্বল শক্ত ও বাষ্প উত্তোলনের জন্য সুবিধা জনক।
৩) খনিজ বা মিনারেল চারকোল এটি অনুজ্জ্বল আঁশযুক্ত সহজে ভেঙে যায় ।
কয়লায় বিভিন্ন উপাদান পাওয়া যায় । বিটুমিনাস কয়লার চারটি উপাদান দেখা যায় যেমন ভিট্রেইন, ক্ল্যারেইন, ডিউরেইন, ফিউসেইন । কয়লার বিভিন্ন উপাদানের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। বাতাসে শুকানো কয়লার মধ্যে যে পরিমাণ জলীয় ভাগ থাকে তাকে কয়লার শ্রেণী ও মানের পরিমাপক হিসাবে ধরা হয়। জলীয় বাষ্পের পরিমাণ যত বেশি হয় কয়লার শ্রেণীর মান তত কম হবে এদেরকে কুকিং শক্তিহীন বা নন কুকিং কয়লা হিসাবে অভিহিত করা হয়।
কয়লার খনিজ দ্রব্যকে ছাই বলে যেটি মূল্যহীন, ছাই এর পরিমাণ বেশি হলে এটিকে জাফরি বা গ্রটের ভিতর বায়ু চলাচল বন্ধ করে দেয় ও দহনের মাত্রা কে কমিয়ে দেয় ও বয়লারের উৎপাদন হ্রাস পায়। ছাইয়ে সাধারণত SiO2 ৪০-৬০%, Al2O3 ২০-৩৫%, Fe2O3 ৫-২৫%, CaO ১-১.৫% ও H20 ৩-৪% থাকে। ভাল কয়লার জন্য ৫% ছাই গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া Cr (ক্রোমিয়াম), Mn (ম্যাঙ্গানিজ), Ge (জার্মেনিয়াম), Sn (টিন), Zn (দস্তা) ইত্যাদি দুর্লভ উপাদান ছাইয়ে পাওয়া যায়। বিটুমিনাস কয়লায় অক্সিজেনের আধিক্য থাকলে এর কোকিং শক্তি কমে । উচ্চ অক্সিজেন কয়লা কোক – শক্তি বিহীন এর মধ্যে ১০% এর বেশী জলীয় অংশ থাকে । নিম্ন অক্সিজেন কয়লা অধিক কোকিং শক্তি সম্পন্ন বাতাসে শুকনো অবস্থায় এই কয়লায় ১-২% জলীয় অংশ থাকে।
কয়লা ১-৩% পর্যন্ত নাইট্রোজেন থাকে। যখন কয়লাকে পতন করা হয় তখন অল্প পরিমাণ সায়ানোজেন ও পিরিডিন বেইজসহ নাইট্রোজেনের প্রায় ১৫% NH3 তে রূপান্তরিত হয় ।
কয়লায় তিনটি অবস্থায় সালফার উপস্থিত থাকে। পাইরাইটিক সালফার, জৈব সালফার, ক্যালসিয়াম সালফেট (CaSO4) হিসাবে ।
ধাতু নিষ্কাশনে ব্যাবহৃত জ্বালানিতে সালফারের পুরুত্ব কম, কয়লাকে পুড়িলে যে সালফার মুক্ত হয় তা গ্রেটের দন্ড দ্বারা শোষিত হয় ।
কয়লাতে অতি সামান্য পরিমাণে আর্সেনিকের উপস্থিতি দেখা যায় । কয়লাকে যখন পুড়ানো হয় তখন আর্সেনিকের কিছু অংশ বর্জ্য গ্যাসের সাথে চলে যায় বাকি অংশ ৫০-৯০% ছাইয়ের মধ্যে আবদ্ধ থাকে ।
ক্যালসিয়াম ফসফেট হিসেবে কয়লাতে ফসফরাসের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। কয়লাকে শিল্পে ব্যবহার করতে হলে কয়লার কিছু গুণাবলি থাকা প্রয়োজন ১) উচ্চ ক্যালসিয়াম ২) নিম্ন খনিজ যুক্ত ৩) কম জলীয় অংশ ৪) সমান সাইজ ৫) গুনাগুনের সামঞ্জস্যতা ।
কয়লা একটি প্রাকৃতিক জীবাশ্ম জ্বালানি ও জৈব পাললিক শিলা, ব্যাবহারের মান ও কার্বনের উপর ভিত্তি করে কয়লাকে চারভাগে ভাগ করা হয় ।
১) অ্যানথ্রাসাইট: উৎকৃষ্ট মানের কয়লা যাতে কার্বনের পরিমাণ ৯০-৯৫% ।
২) বিটুমিনাস: এটি সাধারণ ও বহুল ব্যবহৃত কয়লা যাতে কার্বনের পরিমাণ ৬০-৮০%
৩) লিপনাইট: এটি তুলনামূলক নিম্নমানের কয়লা যাতে কার্বনের পরিমাণ ৪০-৪৫% ।
৪) পিট: এটি কয়লার প্রাথমিক অবস্থা যা অত্যন্ত নিম্নমানের।
আনথ্রাসাইট হলো সর্বাধিক রূপান্তরিত কয়লা। আনথ্রাসাইট সাধারণ কয়লার চেয়ে দুই তিন গুণ বেশি দামি। আনথ্রাসাইট স্বয়ংক্রিয় স্টেকার চুল্লিতে জ্বালানীর কাজে ব্যবহার করা হয় ।বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আনথ্রাসাইট জ্বালানি হিসেবে চুল্লিতে ব্যবহৃত হয় । চীন আনথ্রাসাইট উৎপাদনের সবথেকে অগ্রগামী, বিশ্বের মোট উৎপাদনের তিন চতুর্থাংশের বেশি চীনে উত্তোলিত হয়। বিটুমিনাস কয়লা মাঝারি মানের কয়লা। এটি লিগনাইট কয়লার চেয়ে উন্নত ।বিটুমিনাস কয়লা সাধারণত বিদ্যুৎ উৎপাদন, স্টিল ইন্ডাস্ট্রি এ ব্যবহৃত হয়।
লিগনাইট হচ্ছে গাছপালা ও উদ্ভিদজাত দ্রব্যের পরিবর্তিত রূপ । এটি পিটের চেয়ে শক্তিশালী। লিগনাইট কয়লায় কাদা জাতীয় পদার্থ মিশ্রিত থাকে ফলে এতে ছাই এর পরিমাণ বেশি। রান্না-বান্না ইট পোড়ানো বাষ্পীয় ইঞ্জিন ও তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি হিসেবে লিগনাইট ব্যবহৃত হয়। লিগনাইটে কার্বনের পরিমাণ ৬৭-৬৮ শতাংশ। পিট কয়লায় কার্বনের পরিমাণ ৬০% ও অক্সিজেন ৩০%( আদ্রতামুক্ত ) শুষ্ক অবস্থায় এটি অবাধে জ্বলে। বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় পিট কয়লা সন্ধান পাওয়া গেছে। পিট কয়লা মূলত গৃহস্থলীর কাজ যেমন- রান্নাবান্না, আয়রন করা ইত্যাদি কাজে ব্যবহৃত হয় ।এছাড়াও ইট ভাটা , বেকারির চুল্লী, তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহৃত হয়। কয়লার অঁঙ্গরীকরণ যদি ৫০০-৭০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পরিচালনা করা হয় তাহলে উৎপন্ন দ্রব্য কে নিম্ন তাপ কোক বলে। এই প্রক্রিয়ায় যে কোক পাওয়া যায় তাতে ৫-১৫% উদ্ধায়ী পদার্থ থাকে, যা যথেষ্ট শক্ত না হওয়ায় ধাতু নিষ্কাশনে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায় না তবে এটি মূল্যবান ধূমহীন জ্বালানি। এই প্রক্রিয়ায় যে গ্যাস পাওয়া যায় তা উচ্চ তাপমাত্রা কোকিং পদ্ধতি হতে প্রাপ্ত গ্যাস হতে অধিকতর সমৃদ্ধ।
উচ্চ তাপে ১০০০-১১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা পরিচালনা করে কয়লার অঙ্গুরীকরণের মাধ্যমে ধাতু নিষ্কাশনে কোক তৈরি করা হয়। যে রূপ কয়লা হতে প্রয়োজনীয় গ্রেডের কোক তৈরি করা যায় তাকে কোকিং বলে। ইহার ক্যালরি মান প্রতি পাউন্ডের প্রায় ১৩০০০ BTU. কোল- গ্যাস উৎপাদনেও কোক পাওয়া যায়। নিম্নতাপ ও উচ্চতাপ কার্বোনাইজেশন এর মধ্যে পার্থক্য হল (উৎপন্ন দ্রব্যের উপর ভিত্তি করে)
গ্যাস- নিম্নতাপে ৪০০০-৯০০০ ঘনফুট/টন
প্রধানত মিথেন, ইথেন ও অন্যান্য গ্যাসাফিন, অলিফিন হাইড্রোজেন থাকে। মিথেন ও এর সমগোত্রীয় ৬৫%, Co2 ৯%, Co ৫৫%, H2 ১৩%।
উচ্চতাপে ১০০০০- ১৩০০০ ঘনফুট/টন। এতে প্রধানত মিথেন (২৫-৩০%), H2- (৪৫-৫৫%), Co- ৮%, Co2- (২-৮%) ।
আলকাতরা- নিম্ন তাপে ১০ থেকে ১৫%, ৩০ গ্যালন/টন, এতে প্রধানত প্যারাফিন, ন্যাফথিন, উচ্চ আনবিক ওজনের ফিনল থাকে। এতে নরম পিচ থাকে, মুক্ত কার্বন থাকে নাহ যা তরল জ্বালানীতে পরিবর্তন করা সুবিধাজনক। আলকাতরায় ৩৫% টার এসিড থাকে।
উচ্চতাপে ৪-৭%, টনপ্রতি ৮-১২ গ্যালন। এটি প্রধানত অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন, পিরিডিন-বেসেস, ফিনল, ন্যাপথালিন, অ্যানথ্রাসিন ইত্যাদি নিয়ে গঠিত। এটির সঙ্গে পিচ থাকে ও মুক্ত কার্বন থাকে। এসিড ১%, ২০-৩০ পাউন্ড/টন।
অ্যামোনিয়াম সালফেট- নিম্নতাপ ১০ পাউন্ড/টন ও উচ্চতাপ ২০-৩০ পাউন্ড/টন।
লবু তেল – নিম্নতাপে ২ গ্যালন/টন ও উচ্চতাপে ২-৪ গ্যালন/টন।
কোক- নিম্নতাপে অর্ধ কোক ১৫০০ পাউন্ড/টন Vm ২৫%।
এটি মূল্যবান ধূমহীন জ্বালানি কিন্তু ধাতু নিষ্কাশনের জন্য সুবিধাজনক নয়।
উচ্চতাপে চুল্লীর কোক ১৪০০ পাউন্ড/টন, Vm ৩%। এটি প্রধানত কার্বন ও ছাই থাকে। তীব্র বায়ু প্রবাহ পাওয়া গেলে এটি সুবিধাজনক জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তরল জ্বালানির প্রধান উৎস পেট্রোলিয়াম হলেও কোন কোন দেশ কয়লা, তৈল-সেইলস থেকে প্রয়োজনীয় তরল জ্বালানি সংগ্রহ করে থাকে। কয়লাকে নিম্ন তাপমাত্রায় এবং উচ্চ তাপমাত্রায় অঙ্গুরীকরণ করার সময় উপজাত হিসেবে তরল জ্বালানি পাওয়া যায়, এছাড়াও কয়লা ও কয়লা তেলের হাইড্রোজিনেশন ক্র্যাকিং দ্বারা তরল জ্বালানি উৎপন্ন করা হয়। H2 এর উপস্থিতিতে উচ্চ তাপমাত্রায় এবং চাপে কয়লা কে প্রক্রিয়াজাত করে জ্বালানি তেল ও মোটর স্পিরিট পাওয়া যায়। যে সকল কয়লায় ৮০ – ৮৫ শতাংশ কার্বন এবং ৫ থেকে ৫.৮% হাইড্রোজেন থাকে তাকে ব্যবহার করে সর্বোৎকৃষ্ট ফল লাভ করা যায়। কয়লা থেকে কোল গ্যাস উৎপাদনের সময় উপজাতি হিসেবে ঘন, কালো, আঠালো তরল পাওয়া যায় যা হাইড্রোজেন ও মুক্ত কার্বনের সমন্বয়ে তৈরি যার নাম আলকাতরা।
আলকাতরা কাঠের নৌকা, বাঁশ ও টিনের চালে ব্যবহার করা হয় পচন ও পানি থেকে সুরক্ষার জন্য, রাস্তা তৈরিতে পিচ হিসেবে আলকাতরা ব্যবহার করা হয়। আলকাতরা পাতলা করে ন্যাপথালিন, কার্বন ব্ল্যাক, ক্রিয়েটেক তেল তৈরি করে বিভিন্ন কারখানায় ব্যবহৃত হয়। ত্বকের বিভিন্ন সমস্যায় ডাক্তাররা কোলটার যুক্ত সাবান ও শ্যাম্পু ব্যবহার করার পরামর্শ দেন।
কয়লা থেকে কার্বন মনোক্সাইড ও হাইড্রোজেন গ্যাসের যে মিশ্রণ পাওয়া যায় তাকে ওয়াটার গ্যাস বলে। উচ্চ তাপমাত্রায় হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস উত্তপ্ত কোক বা কয়লার উপর দিয়ে জলীয় বাষ্প চালনা করলে ওয়াটার গ্যাস উৎপন্ন হয়, এটি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। শিল্পক্ষেত্রে মিথানল ও অন্যান্য জ্বালানির জন্য এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
আমাদের দেশে কয়লার ব্যবহার শুরু হয় গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে- উৎসবে রান্নার কাজে। খাবারের দোকানগুলিতে রুটি তৈরিতে কয়লা ব্যবহার করা হত। এছাড়া কাপড় আয়রন করার জন্য প্রধান মাধ্যম ছিল কয়লা। ইট-ভাটায় কয়লার প্রচলন ব্যাপকভাবে শুরু হয় নির্মাণ শিল্পে ইটের চাহিদা বাড়ার সাথে সাথে। ইট পোড়ানোর জন্য চুল্লিতে জ্বালানি হিসেবে বিপুল পরিমাণ কয়লা ব্যবহার করা হয়। শিল্প কলকারখানায় তাপ ও বাষ্প তৈরির জন্য কয়লা অপরিহার্য উপাদান, পেপার মিল, টেক্সটাইল মিল, সিমেন্ট শিল্প সমূহে কয়লার বহুল ব্যবহারের প্রচলন দেখা যায়।
কাঠ ও কয়লার ব্যবহার বাংলাদেশের বহু প্রচলিত। কাঠ কয়লার ব্যবহার ও গুনাগুন সম্পর্কে জানতে হলে অবশ্যই এর গঠন সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। কাঠ কয়লার উৎস হচ্ছে কাঠ, কাঠ পোড়ালে কয়লা হয়ে যায় আর কয়লাকে পোড়ানো হলো এটি ছাই এ রূপান্তরিত হয়, কাঠের অসম্পূর্ণ দহনে কাঠ কয়লা পাওয়া যায়। কাঠ মূলত সেলুলোজ, সেলুলোজ হল কার্বন, অক্সিজেন ও হাইড্রোজেনের সংযোগ তৈরি লম্বা চেন বিশিষ্ট পলিমার, কয়লা মূলত কার্বন। সেলুলোজকে যখন পোড়ানো হয় তরল সেলুলোজ এর কার্বন ও হাইড্রোজেন বাতাসের অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে কার্বন ডাই অক্সাইড ও পানি তৈরি করে উড়ে চলে যায় সেলুলোজকে পুরোপুরি পুড়তে না দিলে তার মধ্যে কার্বন থেকে যায়, সেটিকে কয়লা হিসেবে পাওয়া যায়। কাঠ কয়লা ফাঁপা হয় কিন্তু খনি থেকে উত্তোলিত কয়লা ফাঁপা হয় না। কাঠ কয়লার ভিতরে ছোট ছোট ছিদ্র থেকে যায় ফলে তার পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল অনেক বেশি। ফাঁপা বৈশিষ্ট্যের কারণে কাঠ কয়লার পরিশোষণ ক্ষমতা অনেক, কাঠ কয়লা বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থকে এর পৃষ্ঠে শোষন করতে পারে।
অল্প জায়গার মধ্যে যেহেতু অনেকগুলো পৃষ্ঠ থাকে তাই কাঠ কয়লার পরিশোষণ ক্ষমতা বেশি। প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে কয়লার পরিশোষণ ক্ষমতা বাড়ানো যেতে পারে। প্রক্রিয়াকৃত কয়লাকে এক্টিভেটেড কার্বন বলে। এক পাউন্ড এক্টিভেটেড কার্বনে প্রায় এক একর পরিশোষণ ক্ষমতা সম্পূর্ণ পৃষ্ঠ থাকতে পারে। একটিভেটর কার্বন ব্যবহার করে মাটির সাথে মিশিয়ে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করা যায়। বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে মাটিতে কয়লা মিশালে মাটির উর্বরতা অনেকগুলো বৃদ্ধি পায়। আমাজন অঞ্চলের মাটির উর্বরতার জন্য প্রাচীন অধিবাসীরা কাঠ বা উদ্ভিদ পুড়িয়ে কাঠ কয়লা তৈরি করে মাটিতে মিশিয়েছিল, এই কাঠ কয়লা মাটিতে দীর্ঘদিন থেকে যায় এবং মাটির ও গঠন উন্নত করে। মাটিতে মাত্র ১% কয়লা মেশানো গেলে মাটির উর্বরতা অনেকগুনে বৃদ্ধি পায়, মাটিতে কয়লা মিশিয়ে মাটির জৈব উপাদান বৃদ্ধি করা যায়। মাটিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ক্ষতিকারক প্রভাব কয়লার ব্যবহারের মাধ্যমে দূর করা সম্ভব। কয়লা মাটি ও পানি থেকে অতিরিক্ত কীটনাশক পরিশোষণ করে পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে। এক্টিভেটেড কার্বনের কার্যকরি ভাবে পানি শোষণের ক্ষমতা আছে। এটি পানি থেকে দূষণকারী পদার্থ শোষণ করে নিতে পারে, এটিকে ফিল্টার হিসেবে বিভিন্ন পানি শোধনাগার প্রকল্পে ব্যবহার করা যেতে পারে। ফিল্টার হিসেবে ব্যবহার করে পানির ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ ও জীবাণুমুক্ত করা যেতে পারে। বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসায় এক্টিভেটেড কার্বন ব্যবহার করা যেতে পারে। গবেষণাগার ও শিল্প কলকারখানায় কাঠ কয়লার বহুবিধ ব্যবহার শুরু হয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে কাঠকয়লা কোলেস্টেরল কমাতে, এসিডিটি কমাতে, ফাঁটা-ছেড়ার সংক্রমণ রোধ, পেট কমাতে, ব্যথা-উপশমে ব্যবহার করা যেতে পারে। কাঠ কয়লা দিয়ে পেন্সিল, কালি, রং ইত্যাদি শিক্ষা উপকরণ তৈরি করা হচ্ছে। কাঠ কয়লা যেহেতু সহজলভ্য তাই এটি ব্যবহার করে সারা পৃথিবী তথা আমাদের দেশের মানুষ উপকৃত হতে পারে।
কয়লার প্রাথমিক পর্যায়ে যেটি পাওয়া যায় তাকে পিট বা পিট কয়লা বলে।
বাংলাদেশে বিভিন্ন এলাকার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পিট মজুদের সন্ধান পাওয়া গেছে। এরমধ্যে মাদারীপুরের বাঘিয়া ও চাদাবিল, খুলনা জেলার কোলা মৌজা, মৌলভীবাজার জেলার মৌলভীবাজার ও চাতাল বিল, সুনামগঞ্জ জেলার পাগলা ও চোরকাই উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশে পিট কয়লার ব্যবহার এখনো সীমিত পর্যায়ে আছে। বাংলাদেশ আবিষ্কৃত পাঁচটি কয়লা খনির মধ্যে একমাত্র বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে কয়লা উত্তোলন করা হচ্ছে।
বড় পুকুরিয়া কয়লা খনি বাংলাদেশের প্রথম কয়লা খনি যেখান থেকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কয়লা উত্তোলিত হচ্ছে। এটি দিনাজপুরের পার্বতীপুরে অবস্থিত। এটি ১৯৮৫ সালে আবিষ্কৃত হয়। এটির আয়তন ৬.৬৮ বর্গকিলোমিটার। এখানে প্রধানত বিটুমিনাস কয়লা উত্তোলন করা হয় যা দিয়ে পার্শ্ববর্তী ২৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে। খনি এলাকার কয়লা উচ্চ ক্যালরিফিক মান, নিম্ন সালফার ও নিম্ন ছাই যুক্ত হওয়ায় এটি বিদ্যুৎ উৎপাদনে অত্যন্ত উপযোগী। ৪ জুন ২০০৫ সালে বড় পুকুরিয়া কোল শাইনিং কোম্পানি লিমিটেড ও চাইনিজ কনসোটিয়াম এরমধ্যে ৪.৭৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন কয়লা উত্তোলনের জন্য ৭১ মাস মেয়াদী প্রথম ম্যানেজমেন্ট এন্ড প্রোডাকশন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই সময়ের আওতায় ৩.৬৫১ মিলিয়ন মেট্রিক টন কয়লা সেন্টাল পার্ট হতে উত্তোলন করা হয়। এই বেসিনে কয়লার মোট মজুদ ৩৯০ মিলিয়ন মেট্রিক টন।বড় পুকুরিয়া কয়লা খনি হতে প্রাপ্ত কয়লার মান উদ্ধায়ী বিটুমিনাস শ্রেণী হতে প্রাপ্ত বিটুমিনাস শ্রেণীর অন্তর্গত। যার মূল উপাদান ফিক্সড কার্বন ৪৮.৪০%, এ্যাশ ১২.৪০%, কোলাটাইল মেটার ২৯.২০%, ময়েশ্চার ১০%, ক্ষতিকারক উপাদান সালফারের পরিমাণ ০.৫৩%, তাপ দহন ক্ষমতা ১১০৪০ BTU/ পাউন্ড
কয়লা ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন এর আগ্রহ দিন দিন বেড়ে চলেছে। কয়লা ব্যবহার করে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করলে ২০-২৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কয়লা আমদানি করতে হবে। পাশাপাশি দেশের কয়লা উত্তোলনের ব্যবস্থা করতে হবে।
কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে আগুন, কয়লার স্বতঃস্ফূর্ত জ্বলন, বিষাক্ত ধোঁয়া, ছাই থেকে বাঁচতে সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ, পরিবেশের নিরাপত্তা বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।
১. কয়লার স্টকে আগুন লাগার রোধ করতে নিয়মিত তাপমাত্রা পরিমাপক সেন্সর করা ও কয়লার স্তুপ আর্দ্রতা মুক্ত রাখা।
২. কয়লার পরিবহন বেন্ট ও ইয়ার্ডে কয়লার গুড়া উঠে যাওয়া ঠেকাতে পানি দেওয়ার ব্যবস্থা করা ও ভেন্টিলেশন সিস্টেম চালু রাখা।
৩. কয়লার বা ছাই পিটে ঢোকার আগে স্থানটি ভালোভাবে ঠান্ডা ও বিষাক্ত গ্যাস মুক্ত করা।
৪. ঘূর্ণায়মান যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ এর সময় মেশিনটি পুরোপুরি বন্ধ করে তার পাওয়ার সার্কিট লক করে রাখা যাতে হঠাৎ কেউ মেশিন চালু করতে না পারে।
৫. ফ্লাই অ্যাশ সংরক্ষণের জন্য পরিবেশবান্ধব অ্যাশ পন্ড তৈরি করা, যাতে মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানি দূষিত না হয়।
৬. ক্ষতিকারক গ্যাস সালফারের অক্সাইড ও নাইট্রোজেনের অক্সাইড বায়ুতে ছড়াতে না দেওয়ার জন্য ডিসালফারাইজেশন ও ক্যাটালিটিক সিস্টেম ব্যবহার করা।
৭. কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সঠিক ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম যেমন
ইয়ারপ্লাগ- শব্দ দূষণ থেকে বাঁচার জন্য
গ্লাভস- উচ্চ তাপমাত্রা প্রতিরোধক।
রেসিপিরেটর- ধুলা থেকে বাঁচতে
হেলমেট- নিরাপত্তার জন্য
নিরাপত্তা জুতো- ভারি কিছু পড়ার ঝুঁকি এড়াতে।
৮. চিমনি দিয়ে ফ্লাইঅ্যাশ বের হওয়া রোধ করতে ESP ব্যবহার করতে হবে।
৯. বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নির্গত বর্জ্য পানি শোধন করে বাইরে ছাড়ার ব্যবস্থা রাখা।
১০. বিদ্যুৎ প্লান্ট এর প্রতিটি * পর্যাপ্ত অগ্নি নির্বাপক সরঞ্জাম রাখা ও জরুরী বহির্গমন ব্যবস্থা রাখা




