তারাগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রাতের সেবায় ‘নীরবতা’, ক্যানুলা হাতে নার্সের দরজায় রোগী
জুয়েল ইসলাম, তারাগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি:
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নৈশকালীন দায়িত্ব পালনকারী নার্স ও কর্মীদের বিরুদ্ধে রোগীদের যথাসময়ে চিকিৎসা সেবা না দেওয়া, অসহযোগিতা ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। গভীর রাতে হাতে ক্যানুলা লাগানো এক নারী রোগী নার্সদের দায়িত্বকক্ষে গিয়ে দীর্ঘ সময় ডাকাডাকি ও দরজায় কড়া নাড়লেও কোনো সাড়া না পাওয়ার ঘটনায় হাসপাতালে ভর্তি রোগী ও স্বজনদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ভুক্তভোগী ওই নারী রোগীর অভিযোগ, শারীরিক অসুস্থতার কারণে শুক্রবার তিনি তারাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন। রাতে হাতে লাগানো ক্যানুলায় সমস্যা দেখা দিলে তীব্র ব্যথা ও অস্বস্তিতে তিনি কর্তব্যরত নার্সদের সহযোগিতার জন্য ডাকতে থাকেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া পাননি বলে জানান তিনি।
একপর্যায়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে বাধ্য হয়ে তিনি নিজেই স্যালাইন খুলে ক্যানুলা হাতে নিয়ে নার্সদের দায়িত্বকক্ষের সামনে যান। সেখানে গিয়েও দীর্ঘ সময় দরজায় ধাক্কা ও কড়া নাড়েন। কিন্তু ভেতর থেকে কেউ দরজা খুলে সাড়া দেননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পরে ওই রোগী নিজের মুঠোফোনে নার্সদের কক্ষের দরজায় কড়া নাড়ার দৃশ্য ধারণ করেন। তার দাবি, জরুরি অবস্থায় একজন ভর্তি রোগীকে এভাবে নিজেই নার্সদের খুঁজতে যাওয়া অত্যন্ত কষ্টকর ও ঝুঁকিপূর্ণ। একই সময়ে পুরুষ ওয়ার্ডের কয়েকজন রোগীও প্রয়োজনীয় সেবার জন্য নার্সদের কক্ষে গিয়ে সাড়া না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন।
হাসপাতালটিতে সরেজমিনে দেখা যায়, পুরুষ ও নারী ওয়ার্ডের মাঝামাঝি স্থানে নৈশকালীন দায়িত্ব পালনকারী নার্সদের জন্য একটি নির্ধারিত কক্ষ রয়েছে। কক্ষটিতে চেয়ার-টেবিলসহ দায়িত্ব পালনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এর সঙ্গে থাকা পৃথক একটি অংশে দুটি বিছানাও দেখা যায়।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কয়েকজন রোগী ও তাদের স্বজনের অভিযোগ, নৈশকালীন দায়িত্বে থাকা নার্স ও কর্মীদের কেউ কেউ দীর্ঘদিন ধরে ওই কক্ষে বিশ্রাম নেন। ফলে গভীর রাতে রোগীদের জরুরি প্রয়োজনে নার্সদের পাওয়া যায় না। এতে অসুস্থ রোগীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
তাদের অভিযোগ, হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের অনেক সময় রাতের বেলায় শারীরিক সমস্যা দেখা দিলে নার্সদের সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। কিন্তু দায়িত্বকক্ষে গিয়ে তাদের পাওয়া না গেলে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। বিশেষ করে জরুরি মুহূর্তে নার্সদের অনুপস্থিতি রোগীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
শুধু সেবা না দেওয়াই নয়, নৈশকালীন দায়িত্বে থাকা কিছু কর্মীর বিরুদ্ধে রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগও করেছেন কয়েকজন।
তাদের দাবি, রাতে সামান্য চিকিৎসাসেবা, শারীরিক সমস্যা কিংবা প্রয়োজনীয় সহযোগিতার কথা জানাতে গেলে কোনো কোনো সময় বিরক্তি প্রকাশ করা হয়। এমনকি কোনো কোনো রোগী ও স্বজনকে—‘এতই যদি সমস্যা, তাহলে বেসরকারি ক্লিনিকে ভর্তি হননি কেন?’—এ ধরনের কথাও শুনতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
রোগী ও স্বজনদের ভাষ্য, সরকারি হাসপাতালে মানুষ চিকিৎসা নিতে আসে সেবার প্রত্যাশায়। সেখানে দায়িত্বে থাকা কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর অসহযোগিতা বা অসৌজন্যমূলক আচরণ রোগীর মানসিক কষ্ট আরও বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে রাতের সময়ে অসুস্থ রোগীদের পাশে দায়িত্বশীল আচরণ ও দ্রুত সাড়া পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অভিযোগের বিষয়ে তারাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. হামদুল্লাহ বলেন, দায়িত্ব পালনকালে চিকিৎসাসেবা বন্ধ রেখে ঘুমানোর কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নার্সদের দায়িত্বকক্ষের ভেতরে থাকা বিছানার বিষয়ে তিনি বলেন, জরুরি প্রয়োজনে কিংবা শারীরিক অসুস্থতার ক্ষেত্রে সামান্য বিশ্রামের জন্য বিছানা ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে দায়িত্বে অবহেলা করে ঘুমানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি আরও বলেন, রোগীরা যাতে যথাসময়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পান, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগী ও তাদের স্বজনদের দাবি, নৈশকালীন চিকিৎসাসেবার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদারকি করা প্রয়োজন। দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্স ও কর্মীরা নির্ধারিত সময়ে দায়িত্বকক্ষে উপস্থিত থাকছেন কি না, জরুরি সময়ে রোগীদের ডাকে সাড়া দিচ্ছেন কি না এবং রোগীদের সঙ্গে যথাযথ আচরণ করছেন কি না—এসব বিষয় নিয়মিত নজরদারির আওতায় আনা দরকার।
তাদের মতে, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর একটি। বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা। ফলে রাতের সময়ে দায়িত্বে অবহেলা বা রোগীদের প্রতি অসহযোগিতার অভিযোগ কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।
রোগী ও স্বজনরা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, নৈশকালীন দায়িত্ব ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করা এবং দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
তাদের প্রত্যাশা, অভিযোগের দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে এবং তারাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দিন-রাত নির্বিশেষে রোগীদের জন্য নিরাপদ, মানবিক ও নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত হবে।




