সাতক্ষীরায় কৃষিতে পুরুষ শ্রমিকের সংকট পুরণ করছে নারীরা
মোঃ খলিলুর রহমান, সাতক্ষীরা ::
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরারা। এখানে অসংখ্য নারী শ্রমিক প্রতিদিন পুরুষের সমান পরিশ্রম করেও মজুরি পান অর্ধেক। দীর্ঘদিন ধরে এই বৈষম্যমূলক মজুরিতে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। বিশ্বজুড়ে শ্রমিক অধিকারের প্রতীক হিসেবে পালিত হলেএ বাস্তবতা হলো, সাতক্ষীরার উপকূলের নারীরা এখনও ন্যায্য মজুরি, সম্মান ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ থেকে বঞ্চিত।
সরজমিনে উপকূলীয় এলাকা ঘুরে দেখা গেছে ধানক্ষেত থেকে শুরু করে কাঁকড়া খামার, মাছের ঘের, নদীতে রেণু আহরণ, এমনকি রাস্তা নির্মাণের কাজেও পুরুষের পাশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন নারীরা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রোদে পুড়ে, কাদা-মাটিতে ভিজে তারা কাজ করেন। কিন্তু দিনের শেষে মজুরির হিসেবে দেখা যায় বৈষম্য।
স্থানীয় নারী শ্রমিক আকলিমা খাতুন, সাবিত্রী কয়াল, অলোকা পরমান্যসহ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কাজের ধরন ও সময় এক হলেও শুধুমাত্র নারী হওয়ায় তারা কম মজুরি পাচ্ছেন। অনেকেই বাধ্য হয়ে এই কম পারিশ্রমিকেই কাজ করছেন, কারণ বিকল্প আয়ের সুযোগ সীমিত।
মুন্সিগঞ্জের কলবাড়ি এলাকার জয়ন্ত রপ্তান ও সাহেব আলী জানান, এটি দীর্ঘদিনের প্রচলিত চর্চা, যা এখনও পরিবর্তন হয়নি। ফলে চিংড়ি ঘের, কাঁকড়ার প্রকল্প,ধান খেত,সবজিক্ষেতসহ কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মজুরি বৈষম্য স্পষ্টভাবে বিদ্যমান।
শ্যামনগর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এসব এলাকায় চাষাবাদের কাজে নিয়োজিত অধিকাংশ শ্রমিকই নারী। তুলনামূলক কম মজুরি দেওয়ায় চাষিরা নারী শ্রমিকদের বেশি নিয়োগ দেন। মাঠে ধান কাটা, রোপণসহ অন্যান্য শ্রমনির্ভর কাজে পুরুষ শ্রমিকরা যেখানে দৈনিক ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা পান, সেখানে একই সময় ও সমপরিমাণ পরিশ্রম করেও নারী শ্রমিকদের দেওয়া হয় মাত্র ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা।
ধান কাটার কাজ করা নারী শ্রমিক শিবানী মন্ডল জানান, স্বামীর আয়ে সংসার চলে না, তাই বাধ্য হয়ে কাজে নামতে হয়। কিন্তু সারাদিন পরিশ্রম করেও পুরুষের অর্ধেক মজুরি পাওয়া তার জন্য কষ্টের। একই কথা বলেন নারী শ্রমিক আলেয়া বেগম। তিনি বলেন, “একই সময়, একই কাজ করি। কিন্তু টাকা নিতে গেলে মনে হয় আমরা মানুষ না, আলাদা কিছু।”
স্থানীয় চাষীরাও বৈষম্যের বিষয়টি স্বীকার করেন।
ধানচাষী ফজলুর রহমান বলেন, “নারীরা পুরুষদের মতোই কাজ করে। কিন্তু আমরা পুরুষদের ৫৫০ টাকা এবং নারীদের ৩০০ টাকা মজুরি দেই।” উপকূলীয় এই অঞ্চলে পুরুষ শ্রমিকদের একটি বড় অংশ কাজের সন্ধানে শহরমুখী হওয়ায় কৃষি ও মৎস্য খাতে নারীদের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। কিন্তু সেই নির্ভরতার বিপরীতে তারা পাচ্ছেন না ন্যায্য মূল্যায়ন। এই বৈষম্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয় শিক্ষার্থীরাও।
শ্যামনগর উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শারিদ বিন শফিক বলেন, পুরুষের তুলনায় নারী শ্রমিকদের অর্ধেক মজুরি পাওয়া দুঃখজনক। তবে এই বৈষম্য নিরসনে সচেতনতামূলক কার্যক্রম ছাড়া তাদের হাতে তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই।





