সারাদেশ

সোনালি মুকুলে ভরেছে আমবাগান, স্বপ্ন দেখছেন তারাগঞ্জের কৃষকরা

জুয়েল ইসলাম, তারাগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধিঃ

উত্তরের জনপদ তারাগঞ্জ উপজেলা-এ চলতি মৌসুমে আমগাছগুলো মুকুলে ভরে উঠেছে। শীত বিদায়ের পর হালকা উষ্ণতা, পর্যাপ্ত রোদ এবং অনুকূল আবহাওয়ার কারণে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার ছোট-বড় আম বাগান জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে মুকুলের মিষ্টি সুবাস। প্রকৃতির এই সজীব রূপে নতুন আশায় বুক বাঁধছেন স্থানীয় কৃষক ও বাগান মালিকরা।
রংপুর অঞ্চলের কৃষিনির্ভর অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফল আম। চলতি মৌসুমে উপজেলার রহিমাপুর, কাশিয়াবাড়ী, ইকরচালী, সয়ার, শিকারপাড়া, খিয়ারডাঙ্গা, আলমপুর ও ধোলাইঘাটসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে অধিকাংশ আমগাছে প্রচুর মুকুল এসেছে। কোথাও নতুন পাতার সঙ্গে মুকুলের সমারোহ, আবার কোথাও পুরোনো গাছজুড়ে ঝুলে আছে ফুলের মতো ঘন থোকা। সকালবেলার সূর্যের আলো পড়লে মুকুলে ভরা গাছগুলো সোনালি আভা ছড়িয়ে চারপাশের পরিবেশকে করে তোলে আরও মনোরম ও প্রাণবন্ত।
কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, তারাগঞ্জে দেশীয় ও উন্নত—দুই ধরনের আমের চাষই হয়ে থাকে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য জাতগুলো হলো হিমসাগর, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, আম্রপালি, বারি আম-৩ ও বারি আম-৪। এসব উন্নত জাত উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে Bangladesh Agricultural Research Institute (BARI)। তবে হাঁড়িভাঙ্গা আম এ অঞ্চলের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক জাত হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয় এই আম, যা উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।
ধোলাইঘাট গ্রামের কৃষক আব্দুল লতিফ মিয়া বলেন, “গত বছর ঝড়-বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে অনেক মুকুল ঝরে পড়ে ফলন কম হয়েছিল। তবে এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় গাছে ভালো মুকুল এসেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এবং রোগবালাই কম থাকলে ভালো ফলনের আশা করছি।”
স্থানীয় বাগান মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ধানসহ প্রচলিত ফসলের পাশাপাশি আম চাষ এখন লাভজনক বিকল্প কৃষি হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। অনেক কৃষক বাণিজ্যিকভাবে আম চাষে ঝুঁকছেন। এতে জমির বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাসও মিলছে।
তারাগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ধীবা রানী রায় জানান, আমের মুকুল আসার সময় পোকামাকড় ও ছত্রাকজনিত রোগের ঝুঁকি বেশি থাকে। এজন্য কৃষকদের সুষম সার প্রয়োগ, নিয়মিত বাগান পরিচর্যা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কীটনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, “আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং কৃষকরা সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত করতে পারলে চলতি মৌসুমে আমের ভালো ফলন হবে। এতে স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি জেলার বাইরেও আম বাজারজাত করে কৃষকরা লাভবান হবেন।”
কৃষি সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, মুকুল থেকে ফল ধরা পর্যন্ত সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত কুয়াশা, বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি বা দমকা হাওয়া হলে মুকুল ঝরে পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কৃষকদের সচেতন করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে উপজেলায় আমবাগানজুড়ে মুকুলের সমারোহ কৃষকদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। প্রকৃতি সহায় হলে চলতি মৌসুমে আম উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, বাজারে সরবরাহ বাড়বে এবং কৃষকদের অর্থনৈতিক স্বস্তি ফিরে আসবে—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।
চলতি মৌসুমে সোনালি মুকুলের এই দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যই নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতির সম্ভাবনারও এক উজ্জ্বল প্রতীক হয়ে উঠেছে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

সারাদেশ

মৌলভীবাজার জেলা ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক হলেন সাব্বির আহমেদ সামাদ

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: মৌলভীবাজার জেলা ছাত্রলীগের নতুন কমিটিতে প্রচার সম্পাদক পদে দায়িত্ব পেয়েছেন জেলার একনিষ্ঠ ও ত্যাগী ছাত্রনেতা সাব্বির আহমেদ সামাদ।
সারাদেশ

বদলে যাচ্ছে র‌্যাব: পরিবর্তন হচ্ছে নাম, লোগো ও পোশাক

নতুন রূপে আসছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। এ বাহিনীর নাম, লোগো ও পোশাক পরিবর্তনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়,