ছাদ ঝরে পড়ছে, বিশ্বাস থমকে—তারাগঞ্জে পূজা বন্ধের করুণ বাস্তবতা
জুয়েল ইসলাম, তারাগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি:
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলায় একটি প্রাচীন মন্দিরের ছাদ ভেঙে পড়ার আশঙ্কায় সেখানে পূজা অর্চনা বন্ধ করে দিয়েছেন স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষজন। দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকা মন্দিরটির সংস্কার না হওয়ায় চরম উদ্বেগ ও হতাশা বিরাজ করছে এলাকাবাসীর মধ্যে।
সরেজমিনে উপজেলার সয়ার ইউনিয়নের কাজীপাড়া এলাকায় অবস্থিত ব্রহ্ম মন্দির ও আশ্রমে গিয়ে দেখা যায়, মন্দিরের ছাদের বিভিন্ন অংশ ভেঙে মাটিতে পড়ে রয়েছে। ছাদের প্লাস্টার খসে পড়ছে নিয়মিত, ফলে যে কোনো সময় পুরো ছাদ ধসে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দুর্ঘটনা এড়াতে মন্দিরে পূজা অর্চনা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ব্রহ্ম মন্দির ও আশ্রমটি দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অসংখ্য ভক্ত এখানে পূজা অর্চনা করতে আসতেন। কিন্তু বর্তমানে মন্দিরের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার কারণে দূর-দূরান্ত থেকে আসা ভক্তরা পূজা না করেই ফিরে যাচ্ছেন।
মন্দির কমিটির সভাপতি সাধু বিমল চন্দ্র রায় ব্রহ্মচারী বলেন,
“এই মন্দিরের নামে প্রায় ২১ শতক জমি রয়েছে এবং এটি অত্যন্ত মনোরম পরিবেশে অবস্থিত। কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর থেকে ছাদটি আর সংস্কার করা হয়নি। বর্তমানে ছাদের বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়ছে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যেকোনো সময় পুরো ছাদ ধসে পড়তে পারে। এ কারণে আমরা পূজা অর্চনা বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের আহ্বান—পুরনো ছাদ ভেঙে দ্রুত নতুন ছাদ নির্মাণের ব্যবস্থা করা হোক।”
মন্দিরের পুরোহিত কালিপদ চন্দ্র রায় ব্রহ্মচারী বলেন,
“আমাদের জন্য এটি অত্যন্ত কষ্টের বিষয়। প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় এখানে পূজা অর্চনা হতো। কিন্তু এখন ছাদ ভেঙে পড়ার ভয়েই আমরা আর সেখানে যেতে পারছি না। অর্থের অভাবে নিজেরা সংস্কার করতে পারছি না। বহুবার বিভিন্ন দপ্তরে জানিয়েও কোনো কার্যকর উদ্যোগ পাইনি।”
তারাগঞ্জ উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক হরলাল রায় বলেন,
“মন্দিরটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় সেখানে কেউ পূজা অর্চনা করতে পারছেন না, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। ধর্মীয় চর্চা ব্যাহত হওয়ায় আমরা মানসিকভাবেও কষ্ট পাচ্ছি। দ্রুত মন্দিরটির সংস্কার প্রয়োজন।”

মন্দিরের সার্বিক দেখভালের দায়িত্বে থাকা চন্দনা রানী রায় ব্রহ্মচারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“আমরা বারবার আবেদন করেও কোনো সহায়তা পাইনি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে দুইবার আবেদন করেও বরাদ্দ পাইনি। এখন আমরা সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থায় আছি।”
স্থানীয় ইউপি সদস্য মোঃ আব্দুল হামিদ প্রামাণিক বলেন,
“দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি নিয়ে আমি বিভিন্ন জায়গায় কথা বলেছি। কিন্তু এখনো কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আমার ওয়ার্ডের মানুষ তাদের ধর্মীয় স্থান ব্যবহার করতে পারছে না—এটা খুবই দুঃখজনক।”
এ বিষয়ে তারাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোনাব্বর হোসেন বলেন,
“বিষয়টি আগে জানা ছিল না। এখন জেনেছি। দ্রুত সরেজমিনে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত সময়ের মধ্যে মন্দিরটির সংস্কার কাজ শুরু না হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি ধর্মীয় কার্যক্রম চালু রাখতে জরুরি ভিত্তিতে সরকারি সহায়তা প্রদানের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।





