সদরপুরে ২০০ বছরের ঐতিহ্য: জরিপের ডাঙ্গীতে উৎসবমুখর ‘মুসলমানদের মেলা’
শিমুল তালুকদার, সদরপুর (ফরিদপুর) থেকে ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার চরবিষ্ণুপুর ইউনিয়নে প্রায় দুই শতাব্দী ধরে বহমান গ্রামবাংলার প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্থানীয়ভাবে ‘মুসলমানদের মেলা’ হিসেবে পরিচিত এই উৎসবকে কেন্দ্র করে জরিপের ডাঙ্গী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে নামে মানুষের ঢল। প্রতি বছরের মতো এবারও ৫ই বৈশাখ (১৯ এপ্রিল) চিরায়ত লোকজ সংস্কৃতির এই মিলনমেলাটি অত্যন্ত উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়েছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
স্থানীয় প্রবীণদের মতে, এই মেলার ইতিহাস প্রায় ২০০ বছরের পুরনো। মেলাটির উৎপত্তির নেপথ্যে রয়েছে এক ব্যতিক্রমী সামাজিক প্রেক্ষাপট। সাবেক ইউপি সদস্য জয়নাল খাঁন জানান, অতীতে পার্শ্ববর্তী চাঁদপুরে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মেলায় মুসলিম জনগোষ্ঠীর যাতায়াত নিরুৎসাহিত করতে এবং নিজস্ব সংস্কৃতির প্রসারে তৎকালীন মুরুব্বিরা এই মেলার সূচনা করেছিলেন। সেই থেকে এটি অত্র অঞ্চলে ‘মুসলমানদের মেলা’ হিসেবে পরিচিতি পায় এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এর ঐতিহ্য টিকে রয়েছে।
ফরিদপুর জেলা গণঅধিকার পরিষদের নেতা শেখ জাহিদ হাসান বলেন, “প্রায় দুই শতাব্দী আগে শুরু হওয়া এই মেলাটি অত্র অঞ্চলের মানুষ আজও পরম মমতায় আগলে রেখেছে। এটি আমাদের শিকড়ের পরিচয়।”
মেলার আয়োজন ও পরিবেশ
রবিবার বিকেল থেকে শুরু হওয়া এই মেলা চলে গভীর রাত পর্যন্ত। সরেজমিনে দেখা যায়, মেলা প্রাঙ্গণে দূর-দূরান্ত থেকে আসা শত শত মানুষের সমাগমে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। মেলায় বাঁশ ও বেতের তৈরি নান্দনিক গৃহস্থালি সামগ্রী থেকে শুরু করে মাটির ও প্লাস্টিকের খেলনার দোকানগুলোতে ছিল উপচে পড়া ভিড়। মেলার বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে ঐতিহ্যবাহী জিলাপি, খৈ-বাতাসা, মুরালি ও মিষ্টান্নের সমারোহ ছিল চোখে পড়ার মতো। শিশুদের বিনোদনের জন্য ছিল নাগরদোলার আয়োজন।
সামাজিক বন্ধন ও ঐতিহ্য
জরিপের ডাঙ্গী ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য জিয়া খোরশেদ বলেন, “এই মেলাটি আমাদের গ্রামের গর্ব। এটি কেবল কেনাবেচার জায়গা নয়, বরং আমাদের লোকজ সংস্কৃতি ও সামাজিক বন্ধনের এক অন্যতম মাধ্যম।”
স্থানীয়দের মতে, বৈশাখী এই মেলাকে কেন্দ্র করে প্রতিটি ঘরে ঘরে উৎসবের আমেজ বিরাজ করে। আত্মীয়-স্বজনদের আগমনে মুখরিত হয়ে ওঠে গ্রামটি। এটি যেন গ্রামীণ সম্প্রীতি ও ঐতিহ্য রক্ষার এক চিরকালীন সেতুবন্ধন।





