রৌমারী থেকে বিশ্বমঞ্চে: মেধা, গবেষণা ও নেতৃত্বে অনন্য এক তরুণের গল্প

জহুরুল ইসলাম রৌমারী কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:
বাংলাদেশের প্রত্যন্ত জনপদ থেকেও যে বিশ্বমানের গবেষক, উদ্ভাবক ও নেতৃত্বের প্রতীক হয়ে ওঠা সম্ভব—তারই এক অনন্য উদাহরণ মোহসিনুর রহমান মুরাদ। মেধা, অধ্যবসায়, আন্তর্জাতিক গবেষণা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার গৌরবময় অর্জনের মাধ্যমে তিনি আজ রৌমারী, কুড়িগ্রাম ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিত এক তরুণ মুখ।

শৈশব থেকেই তাঁর মেধার স্বাক্ষর স্পষ্ট ছিল। পঞ্চম শ্রেণিতে মেধাতালিকায় বৃত্তি অর্জনের পর যাদুরচর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি এবং ঢাকা সিটি কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এইচএসসি—উভয় পরীক্ষায় জিপিএ–৫ অর্জন করেন।
এরপর আসে জীবনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। ২০১৬–১৭ শিক্ষাবর্ষে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘এ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় প্রায় ৫৮,৮৯৭ পরীক্ষার্থীর মধ্যে, যেখানে প্রতি আসনের বিপরীতে প্রায় ৭৬ জন প্রতিযোগিতা করেছিলেন, সেখানে ১৯০তম মেধাক্রম অর্জন করে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হন। এই অর্জনই তাঁর ভবিষ্যতের পথচলার ভিত্তি স্থাপন করে।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ইন্টারনেট অব থিংস (IoT) এবং স্বাস্থ্য প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণায় আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর গবেষণাকর্ম জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার আন্তর্জাতিক গবেষণা জার্নাল ও সম্মেলনে প্রকাশ ও উপস্থাপিত হয়েছে। একজন তরুণ বাংলাদেশি গবেষক হিসেবে এটি নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়।
২০২৫ সালে অস্ট্রেলিয়ার University of Sydney-এর আমন্ত্রণ ও অর্থায়নে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পান তিনি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রায় ৫০০ প্রতিযোগীর অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক আয়োজনে তাঁর দল চ্যাম্পিয়ন, রানার্স-আপসহ তিনটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করে। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা উঁচিয়ে ধরার সেই মুহূর্ত তাঁর জীবনের অন্যতম গর্বের অধ্যায়।
রাজনৈতিক পরিবারের সন্তানদের ঘিরে সমাজে প্রায়ই নানা ধরনের পূর্বধারণা কাজ করে। কিন্তু সেই ধারণাকে অতিক্রম করে নিজের কর্ম, মেধা ও চরিত্রের মাধ্যমে স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তোলাই প্রকৃত সাফল্য। রৌমারীর সুপরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মজিবুর রহমান বঙ্গবাসীর সন্তান হয়েও মোহসিনুর রহমান মুরাদ কখনো পারিবারিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেননি। বরং শিক্ষা, গবেষণা, আন্তর্জাতিক অর্জন, সামাজিক সম্পৃক্ততা এবং ব্যক্তিগত যোগ্যতার মাধ্যমে তিনি নিজের স্বকীয় পরিচয় নির্মাণ করেছেন। রৌমারী তথা কুড়িগ্রামের তরুণদের কাছে তিনি আজ একটি ইতিবাচক অনুপ্রেরণার নাম।
শুধু একাডেমিক ও গবেষণায় নয়, সামাজিক কর্মকাণ্ড, স্বেচ্ছাসেবামূলক উদ্যোগ, সাংস্কৃতিক চর্চা, ব্যান্ড মিউজিক এবং বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমেও তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ তাঁকে একজন বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। তাঁর বিশ্বাস—একজন শিক্ষিত মানুষের দায়িত্ব শুধু নিজের সাফল্যে সীমাবদ্ধ নয়; সমাজ ও দেশের উন্নয়নেও অবদান রাখা।
বর্তমানে তিনি গবেষণা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন। ভবিষ্যতে বিশ্বমানের গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং তরুণদের দক্ষতা বিকাশে ভূমিকা রাখাই তাঁর স্বপ্ন।
মোহসিনুর রহমান মুরাদের জীবনগল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জন্মস্থান নয়, পারিবারিক পরিচয় নয়, বরং অধ্যবসায়, সততা, মেধা এবং নিরলস পরিশ্রমই একজন মানুষকে সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দেয়। তাঁর অর্জন আজ শুধু একটি ব্যক্তিগত সাফল্যের কাহিনি নয়; এটি রৌমারী, কুড়িগ্রাম, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং সমগ্র বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য এক উজ্জ্বল অনুপ্রেরণা।




