দেবীগঞ্জের পাকুড়িতলা বালুর ডাম্পিং পয়েন্ট বিপজ্জনক, পথচারী ও চালকরা থাকেন আতংকে
একেএম বজলুর রহমান, পঞ্চগড়
পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার করতোয়া সেতুর পশ্চিম পাড় এলাকা পাকুড়িতলা থেকে সোনাপোতা পর্যন্ত সড়কটি বর্তমানে পরিবেশ দূষণ ও সড়ক দুর্ঘটনার একটি বড় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়েছে।
পাকুড়িতলা এলাকায় গত ২৯ মে ডাম্পিং পয়েন্টে বালুবাহী ট্রাকের সঙ্গে ইজিবাইকের সংঘর্ষে একই পরিবারের তিনজন নিহত হয়।
এব্যাপারে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) জেলা প্রশাসনের নিকট স্মারকলিপিও দেয়া হয়। সে স্মারকলিপির আবেদনও উপেক্ষিত করা হয়েছে। এব্যাপারে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন কোন ব্যবস্থা নেয়নি।
কিশোর ও অদক্ষ চালক দিয়ে চলছে শতাধিক অবৈধ ট্রাক্টর। এসব ট্রাক্টর চলাচল করায় চরম ভোগান্তিতে পড়ছে বিভিন্ন স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা।
বালু ব্যবসাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে চলমান ধুলাবালি, নিয়ন্ত্রণহীন যান চলাচল ও নিরাপত্তাহীনতা স্থানীয় মানুষদের এখন নিত্যদিনের দুর্ভোগে রূপ নিয়েছে।
করতোয়া সেতুর পশ্চিম পাশে পাকুড়িতলা এলাকায় একদিকে বোদা উপজেলাগামী আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং অন্য দিকে বোদা উপজেলা মাড়েয়া বাজার গামী গ্রামীণ সড়কের সংযোগস্থল রয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে একটি বালু ডাম্পিং ইয়ার্ড স্থাপন করা হয়েছে। পার্শ্ববর্তী করতোয়া নদীর সোনাপোতা মৌজা থেকে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শতাধিক ট্রাক্টরের মাধ্যমে এখানে বালু আনা হচ্ছে। ফলে পাকুড়িতলা থেকে সোনাপোতা পর্যন্ত পুরো সড়কে বালুর স্তুপ জমে থাকছে এবং আশপাশের এলাকা ধুলায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়কে জমে থাকা বালু পিচ্ছিল হয়ে যাওয়ায় মোটরসাইকেল, সাইকেল ও ভ্যান চালকদের জন্য চলাচল মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। টাকাহারা ভায়া দেবীগঞ্জ সড়কে বালুর কারণে দ্রুত রোগী পরিবহন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে বলে জানান স্থানীয় অটোচালক আকবর আলী। তিনি বলেন,
গতি বাড়ালেই অটো দুলতে থাকে, তখন আর অটোটি নিয়ন্ত্রণ রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
পঞ্চগড় ভায়া দেবীগঞ্জ সড়কে নিয়মিত যাতায়াতকারী সরকারি চাকরিজীবী রাশেদ বলেন, বালুর কারণে মোটরসাইকেলের চাকা পিছলে যায় তখন মোটরসাইকেলের ভারসাম্য রাখা খুব কঠিন হয়ে পড়ে।
দেবীগঞ্জ সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী শিমূল ও সাঈদ জানান, প্রায় দুই কিলোমিটার ধুলোমাখা সড়ক পার হতে গিয়ে চোখ-মুখে ধুলা ঢোকা এড়ানো যায় না। শালডাঙ্গা এলাকার বৃদ্ধ শমসের আলী বলেন, নিয়মিত যাতায়াতে চোখ জ্বালা করে এবং কাশি শুরু হয়।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সুমন ধর বলেন, ধুলাবালির কারণে বায়ু দূষণ বেড়ে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিসসহ বিভিন্ন শ্বাসযন্ত্রজনিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি।
অন্যদিকে বোদাগামী আঞ্চলিক মহাসড়কে বালু লোডের জন্য ট্রাক ও ট্রাক্টর দাঁড় করিয়ে রাখা এবং অবৈধ স্থাপনার কারণে সড়কের বিভিন্ন অংশ ভেঙে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এর আগে গত ২৯ মে এশিয়ান হাইওয়েতে বালু লোডের জন্য ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকায় একটি থ্রি-হুইলারের সঙ্গে সংঘর্ষে একই পরিবারের তিনজন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে সাত বছরের এক শিশুও ছিল। ওই ঘটনার পর কিছুদিন নজরদারি থাকলেও বর্তমানে আবারও মহাসড়কে ট্রাক দাঁড় করিয়ে বালু লোড করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) পঞ্চগড় জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আজহারুল ইসলাম জুয়েল বলেন, বালুমহালের শর্ত অনুযায়ী জনদুর্ভোগ সৃষ্টিকারী কার্যক্রম নিষিদ্ধ। অথচ পাকুড়িতলায় বালু ব্যবসাকে ঘিরে পরিবেশ দূষণ অব্যাহত রয়েছে।
তিনি জানান, বাপা’র দেবীগঞ্জ উপজেলা শাখার পক্ষ থেকে গত ৩০ নভেম্বর জেলা প্রশাসককে স্মারকলিপি দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরিবেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও সড়ক দুর্ঘটনা রোধে দ্রুত ডাম্পিং ইয়ার্ডটি অন্যত্র স্থানান্তরের দাবি জানান তিনি।
তবে ইজারাদারের প্রতিনিধি সোলেমান হক দাবি করেন, নিয়ম মেনেই বালু ব্যবসার কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, সড়ক ও জনপথ বিভাগকে সেখান থেকে বালুর স্তূপ ও অবৈধ স্থাপনা অপসারণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।




