ভোলার যুগীরঘোল সড়ক দখল: অবৈধ ইজারা, চাঁদাবাজি ও তীব্র যানজটে চরম ভোগান্তি রোগী–শিক্ষার্থীদের
মোঃ রাফসান জানি, ভোলা:
ভোলা শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম সড়ক যুগীরঘোল এলাকায় রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ দোকান। স্থানীয়দের অভিযোগ, পৌরসভার মাধ্যমে অবৈধভাবে ইজারা দেওয়ার সুযোগে সড়কের দুই পাশে প্রতিদিন বসছে মাছ, মাংস, সবজি ও বিভিন্ন খাবারের দোকান। এতে একদিকে যেমন বাড়ছে যানজট, অন্যদিকে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে হাসপাতালে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের, পাশাপাশি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের।
গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের মাঝখানে দখলবাজি
যুগীরঘোল সড়কের আশপাশে রয়েছে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল, আব্দুর রব স্কুল অ্যান্ড কলেজ, চর জংগলা প্রাথমিক বিদ্যালয়, হোসাইনিয়া মাদ্রাসা, ভোলা সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ভোলা সরকারি কলেজসহ একাধিক সরকারি দপ্তর। প্রতিদিন হাজারো মানুষ এই সড়ক ব্যবহার করে বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াত করেন।
কিন্তু সড়কের দুই পাশ দখল করে দোকান বসানোর ফলে চলাচলের পথ সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। অনেক সময় পথচারীদের হাঁটার মতো জায়গাও থাকে না। শিক্ষার্থীরা ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে, আর জরুরি রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কের উভয় পাশে সারি সারি দোকান বসানো হয়েছে। কোথাও কোথাও ফুটপাত পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। দোকানের সামনে ক্রেতাদের ভিড় এবং পণ্য নামানো-তোলার কারণে সড়কের কার্যকর প্রস্থ আরও কমে গেছে।
বিশেষ করে সকাল ও দুপুরের ব্যস্ত সময়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। স্কুল-কলেজে যাওয়া শিক্ষার্থী, অফিসগামী মানুষ ও রোগী পরিবহনকারী যানবাহন একসঙ্গে আটকে পড়ে দীর্ঘ ভোগান্তিতে পড়েন।
‘প্রতিদিন চাঁদা দিয়েই বসতে হচ্ছে’
ফুটপাতে দোকান বসিয়ে ব্যবসা করা কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন ইজারাদারের লোকজনকে ১০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়।
একজন দোকানি বলেন, “আমরা গরিব মানুষ, ব্যবসা করে সংসার চালাই। এখানে বসতে প্রতিদিন টাকা দিতে হয়। যদি বসতে না দেয়, অন্য জায়গায় গিয়ে বসব। কিন্তু টাকা দিয়েই বসতে হচ্ছে।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে নতুন দোকান বসানোর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। ফলে প্রতিনিয়ত দোকানের সংখ্যা বাড়ছে এবং দখলদারিত্ব আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
স্থানীয়দের ক্ষোভ
এলাকাবাসী জানান, রাস্তা ও ফুটপাত বন্ধ করে খামখেয়ালিভাবে ইজারা দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সামনে এমন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।
তাদের দাবি, একাধিকবার অভিযোগ জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং নিয়মিত টোল আদায়ের মাধ্যমে দখলদারিত্বকে স্থায়ী রূপ দেওয়া হচ্ছে।
বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এনামুল হক বলেন, ভোলা পৌরসভা গত বছর থেকে যুগীরঘোলসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও ফুটপাত ইজারা দিয়ে আসছে, যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও জনস্বার্থবিরোধী।
তার দাবি, সড়ক ইজারা দেওয়ার মাধ্যমে ইজারাদাররা খামখেয়ালিভাবে চাঁদাবাজি করছে। বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য তিনি পৌর কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান এবং জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
আব্দুর রব স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক আ. মান্নান বলেন, সড়কে দোকান থাকার কারণে শিক্ষার্থীদের স্কুলে আসতে মারাত্মক সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। কয়েকবার অভিযোগ দেওয়ার পরও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, “কোন আইনে সড়ক ও ফুটপাত ইজারা দেওয়া হচ্ছে, তা আমাদের জানা নেই। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি আগে বিবেচনা করা উচিত।”
অভিযোগের বিষয়ে পৌর প্রশাসক মো. মিজানুর রহমান বলেন, পৌরসভা পরিচালনার স্বার্থে বাধ্য হয়ে কিছু সড়ক ও ফুটপাত ইজারা দিতে হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, গুরুত্বপূর্ণ সড়কে দোকান বসানোর কারণে সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
তিনি জানান, ভবিষ্যতে যুগীরঘোল মেইন সড়ক বাদ দিয়ে চত্বরের পর থেকে ভোকেশনাল পর্যন্ত অংশে সীমিতভাবে দোকান বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি নতুন জনবল নিয়োগ দিয়ে পরিচ্ছন্নতা ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার কথাও উল্লেখ করেন।
দ্রুত সমাধানের দাবি
এদিকে স্থানীয়দের দাবি, গুরুত্বপূর্ণ এই সড়ক ও ফুটপাত দ্রুত দখলমুক্ত করে জনদুর্ভোগ লাঘবে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক। হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসংলগ্ন এলাকায় যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
জনস্বার্থে অবৈধ দখল উচ্ছেদ ও সুষ্ঠু ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি—এমনটাই প্রত্যাশা এলাকাবাসীর।





