জ্বিন তাড়ানোর নামে তরুণীকে পিটিয়ে জখম: যশোরে ‘আয়না কবিরাজ’-এর প্রতারণার মুখোশ উন্মোচন।
মো: হামিদুজ্জামান জলিল, স্টাফ রিপোর্টার:
জ্বিন তাড়ানো ও জটিল রোগ ব্যাধি ভালো করার ভুয়া আশ্বাস দিয়ে প্রতারণা এবং চিকিৎসার নামে এক তরুণীকে ঘরের ভেতর আটকে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে যশোর কোতোয়ালি থানার শ্যামনগর মাঠপাড়ার কথিত ভন্ড ‘আয়না কবিরাজ’-এর বিরুদ্ধে।
ডালিম গাছের ডাল দিয়ে বেধড়ক পিটিয়ে সুমাইয়া খাতুন (২২) নামের এক তরুণীকে মুমূর্ষু অবস্থায় ফেলে রাখার খবর পাওয়া গেছে। বর্তমানে ওই তরুণীর অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। ভুক্তভোগী পরিবার ঘটনাটিতে স্থানীয় প্রশাসনসহ যশোরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও)-এর জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
স্থানীয় ও ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা যায়, ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার নর্দ গ্রামের মোঃ ওহিদ আলীর মেয়ে সুমাইয়া খাতুনের শরীরে শারীরিক অসুস্থতার কারণে কথিত ‘জ্বিনের আছড়’ পড়েছে বলে ধারণা করে পরিবার। পরবর্তীতে খবর পেয়ে গত শনিবার দুপুর ২ টার দিকে সুমাইয়াকে যশোর কোতোয়ালি থানাধীন শ্যামনগর মাঠপাড়ার প্রবাসী মোঃ সৈয়দ আলীর স্ত্রী মোছাঃ আয়না খাতুনের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।
অভিযোগ উঠেছে, সুমাইয়াকে চিকিৎসার কথা বলে ঘরের ভেতর নিয়ে অন্য সকল স্বজনকে বের করে দেন আয়না কবিরাজ। এরপর একটি বন্ধ ঘরে ডালিম গাছের মোটা ডাল দিয়ে সুমাইয়ার শরীরে নির্বিচারে পেটাতে থাকেন তিনি। এতে সুমাইয়া একপর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন। মেয়ের অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে পরিবারের সদস্যরা তাকে দ্রুত উদ্ধার করে নিজ গ্রাম কালীগঞ্জের নর্দ এলাকায় নিয়ে আসেন। সুমাইয়ার শরীরে মারাত্মক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগী সুমাইয়ার মা রোশনা বেগম কান্নাকাটি করে সাংবাদিকদের বলেন—
”আমার মেয়ের শারীরিক অবস্থা দেখে আমরা বিভ্রান্ত হয়ে কবিরাজ আয়নার কাছে নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু চিকিৎসার নামে ঘরের দরজা বন্ধ করে ডালিম গাছের ডাল দিয়ে পিটিয়ে আমার মেয়েকে নির্মমভাবে জখম করা হয়েছে। কবিরাজ আয়না একজন ধোকা দেওয়া প্রতারক। সে শুধু জ্বিন তাড়ানোর নাটকই করে না, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে সর্বরোগের চিকিৎসার নামে সাধারণ মানুষের সাথে নিয়মিত প্রতারণা করে আসছে। আমরা ডিসি মহোদয় ও উপজেলা ইউএনও মহোদয়ের কাছে এই ভন্ডের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও বিচার দাবি করছি।”
ঘটনার সত্যানুসন্ধানে বুধবার বিকেলে সরেজমিনে কথিত কবিরাজ আয়নার বাড়ি শ্যামনগর এলাকায় পৌঁছান গণমাধ্যমকর্মীরা। তবে সংবাদকর্মীদের উপস্থিতির কথা আগেই টের পেয়ে বাড়ি ছেড়ে সটকে পড়েন ভন্ড আয়না কবিরাজ।
পরে তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তিনি নির্যাতনের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। মোবাইল ফোনে আয়না কবিরাজ বলেন—
”আমি বর্তমানে বহু বিপদে আছি, ঝামেলায় আছি। পরে কথা বলব।” — এ কথা বলেই তিনি ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
স্থানীয় এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আয়না কবিরাজ দীর্ঘ দিন ধরে অশিক্ষিত ও সরল-সহজ মানুষদের অলৌকিক ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে এবং দূরারোগ্য ব্যাধি সারানোর মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। অমানবিক নির্যাতন চালিয়ে ভীতি সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি প্রতারণার এই সিন্ডিকেট চালিয়ে আসছিলেন।
এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে এ ধরনের ভন্ডামী ও ঝাড়ফুঁকের নামে নির্যাতন বন্ধে যশোরের জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের নিকট অভিযুক্ত আয়না কবিরাজের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জোর দাবি জানানো হয়েছে।





