জাতীয় সারাদেশ

কচুয়ায় থামছে না সহিংসতা: ৫ আগস্ট পরবর্তী ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডে আতঙ্কিত জনপদ

উজ্জ্বল কুমার দাস ,বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি।।

​বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলায় ৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে একের পর এক হত্যাকাণ্ড, হামলা ও পঙ্গু করে দেওয়ার মতো নৃশংস সহিংসতায় জনমনে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। মূলত এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ এবং পুরনো গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করেই এসব ঘটনা ঘটছে। গজালিয়া, মঘিয়া, রাড়িপাড়া ও সদর ইউনিয়নসহ উপজেলার বিভিন্ন প্রান্তে গত দেড় বছরে প্রাণ হারিয়েছেন একাধিক রাজনৈতিক কর্মী, আইনজীবী ও সাধারণ মানুষ।
​মঘিয়া ইউনিয়নের সম্মানকাঠি গ্রামে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গফফার শেখ হত্যাকাণ্ড এলাকাটিতে দীর্ঘমেয়াদী উত্তেজনার জন্ম দেয়। এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই অত্যন্ত সাম্প্রতিক অর্থাৎ ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে সম্মানকাঠি গ্রামে রহমতউল্লাহ শেখ (২৭) নামের এক যুবকের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়। হামলাকারীরা তার হাত-পা কুপিয়ে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। বর্তমানে তিনি আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আধিপত্য বিস্তার, জমি সংক্রান্ত বিরোধ ও স্থানীয় কোন্দল এই হামলার মূল কারণ বলে জানা গেছে।
​কচুয়া সদর ইউনিয়নের বাড়ইখালী গ্রামে গত ১৩ অক্টোবর ২০২৪ রাতে প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট লতিফ জোয়ার্দার (৬৫)-কে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। বিএনপির সমর্থক হিসেবে পরিচিত এই সিনিয়র আইনজীবীর মৃত্যুটি ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে কচুয়ার সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা। এছাড়া একই গ্রামে ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ রাতে নয়ন শেখ (২৮) নামের এক শ্রমিককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নয়ন স্থানীয়ভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন।
​রাড়িপাড়া ইউনিয়নের চন্দ্রপাড়া গ্রামে মাত্র এক দিনের ব্যবধানে দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪ রাতে বিএনপি কর্মী রাসেল শেখ (৩৫) এবং ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে যুবদল কর্মী পলাশ শেখ (৩২)-কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে এই খুনের পেছনে দীর্ঘদিনের গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব ও জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের তথ্য উঠে এসেছে। অন্যদিকে, গজালিয়া ইউনিয়নের আলিপুর গ্রামে জমিজমা ও আধিপত্য নিয়ে বিরোধে কৃষক মোজাহার মোল্লা (৫৫)-কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
​১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে ধোপাখালী ইউনিয়ন বিএনপির সম্মেলন নিয়ে দুই গ্রুপের সংঘর্ষে আহত হন নবগঠিত কমিটির সাধারণ সম্পাদক শওকত হোসেন (৫০)। ৯ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ২০ ফেব্রুয়ারি তিনি মারা যান। ১৩ অক্টোবর ২০২৫ রাতে দুর্বৃত্তদের হামলায় জাহিদুল ইসলাম মিন্টু (৪৫) নামের এক যুবদল কর্মী নিহত হন। নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থক ওসমান সরদার (২৯)। এর আগে ১৩ ফেব্রুয়ারি ধোপাখালী ইউনিয়নে নির্বাচন পরবর্তী সংঘর্ষে তিনি গুরুতর আহত হয়েছিলেন।
​৫ আগস্টের ঠিক আগে অর্থাৎ ২ আগস্ট ২০২৪ তারিখে খুলনায় আন্দোলনকারীদের সাথে সংঘর্ষে নিহত হন কচুয়ার গোপালপুর ইউনিয়নের কিসমত মালিপাটন গ্রামের বাসিন্দা ও পুলিশ কনস্টেবল সুমন কুমার ঘরামী। তার মৃত্যুতে পুরো ইউনিয়নে শোকের ছায়া নেমে আসে।
​কচুয়ায় প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক মোড়ক থাকলেও গভীরে রয়েছে দীর্ঘদিনের পারিবারিক শত্রুতা, জমিজমা দখল,চুরিডাকাতির ঘটনা,মাদক ব্যাবসা এবং গ্রাম্য দলাদলি। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, দ্রুত অপরাধীদের আইনের আওতায় না আনা হলে এই সহিংসতার চক্র থামানো সম্ভব হবে না।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

সারাদেশ

মৌলভীবাজার জেলা ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক হলেন সাব্বির আহমেদ সামাদ

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: মৌলভীবাজার জেলা ছাত্রলীগের নতুন কমিটিতে প্রচার সম্পাদক পদে দায়িত্ব পেয়েছেন জেলার একনিষ্ঠ ও ত্যাগী ছাত্রনেতা সাব্বির আহমেদ সামাদ।
সারাদেশ

বদলে যাচ্ছে র‌্যাব: পরিবর্তন হচ্ছে নাম, লোগো ও পোশাক

নতুন রূপে আসছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। এ বাহিনীর নাম, লোগো ও পোশাক পরিবর্তনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়,