সম্পাদকিয়

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ দূষন এবং আমাদের করনীয়

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ দূষন এবং আমাদের করনীয়

— কাজী ফারহান হায়দার

আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। এদেশের স্বাধীনতার পর শহরাঞ্চলের মানুষের সমাগম বাড়তে থাকে কারন সদ্য যুদ্ধ বিদ্ধস্ত দেশে মানুষ কাজের সন্ধানে শহরে ছুটতে আরম্ভ করে। শহরে মানুষের চাপ বাড়ার সাথে সাথে অনেকগুলা বিষয় তাদের নিজেদের বসবাসের সাথেই আড়াআড়ি ভাবে জড়িয়ে গেছে, তার মধ্যে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ দূষন বিষয়টি দিনে দিনে প্রকট আকার ধারণ করেছে। রাজধানী শহর ঢাকার পাশাপাশি বিভাগীয় ও জেলা শহর গুলোতে কাজের সন্ধানে, শিক্ষাদীক্ষার প্রয়োজনে মানুষের আগমন বাড়তে থাকে। যে অনুপাতে মানুষ শহরে আগমন করছে সে অনুপাতে পরিকল্পিত নগরায়ন বলতে যা বুঝায় তার ছিটে ফোটাও বাস্তবায়িত হয়নি দেশের অধিকাংশ শহরে, ফলে বর্জ্য ব্যবস্থ্যাপনার বিষয়টি উপেক্ষিত থেকেছে দিনের পর দিন। বর্জ্য ব্যবস্থ্যাপনার পরিকল্পিত উদ্দ্যেগের অভাবে পরিবেশ দূষন আজ পুরো দেশবাসীর জন্য হুমকিস্বরূপ দেখা দিয়েছে। দেশেরর প্রায় সব কয়টি শহর আজ পরিবেশগত বিপর্যয়ের সম্মুখীন সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থ্যাপনার অভাবে। মানুষের সৃষ্ট বর্জ্য , পশুপাখির বর্জ্য এবং ক্লিনিকাল বর্জ্য ব্যবস্থ্যাপনার ক্ষেত্রে কোন কার্যকর উদ্দ্যেগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। দৈনন্দিন খাদ্য দ্রব্যের বর্জ্য, ধাতব বর্জ্য, কাঁচ ভাঙ্গা, প্লাস্টিকের বর্জ্য, পুরাতন্ কাপড়-চোপড়, নির্মান সামগ্রী, শিল্প কারখানার বর্জ্য, বিভিন্ন শপিংমল, রেস্টরেন্টের সৃষ্ট বর্জ্য আমাদের দেশের সামগ্রিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিষয়টিকে জটিল থেকে জটিলতর করে তুলেছে। এসব বর্জ্যের মধ্যে কিছু বর্জ্য আছে যেসব সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিবেশ দুষন নিয়ন্ত্রনের পাশাপাশি আমাদের বাসাবাড়িতে ব্যবহার উপযোগী বায়োগ্যাস উৎপাদনে ব্যবহার করা সম্ভব। আর কিছু বর্জ্য আছে যেসব বর্জ্য পৃথক করে সঠিক ভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উদ্দ্যেগ নিলে আমাদের ব্যবহার উপযোগী সামগ্রী তৈরি করা সম্ভব আর কিছু বর্জ্য আছে যা আমাদের নষ্ট করে ফেলার কার্যকারী উদ্দ্যেগ নিতে হবে।

শহরের মধ্যে সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভায় যেসব বর্জ্য জমা হয় সেসব বর্জ্য ব্যবস্থাপনের ক্ষেত্রে শুধু মাত্র খোলা ডাস্টবিন গড়ে তুলা ছাড়া অন্য কোন উদ্দ্যেগ দেখা যায় নি।এসব খোলা ডাস্টবিন থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করে একটি নির্দিষ্ট স্থানে বা কিছু জমিতে জমা করে ভরাট করা হয়। এইভাবে উন্মুক্তভাবে বর্জ্য সংগ্রহ করে উন্মুক্ত স্থানে ফেলার কারণে বায়ু দূষন হচ্ছে মারাত্মক ভাবে। এছাড়া এখানে মশা মাছির বংশ বিস্তার হচ্ছে দিনের পর দিন।
উন্মুক্ত স্থানে মেডিকেলের বর্জ্য ফেলার কারনে রোগ জীবানু ছড়িয়ে পড়ছে প্রতিদিন। মেডিকেল বর্জ্য ধংসের জন্য দেশের কয়েকটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ব্যবস্থা রয়েছে তা আবার ঢাকা শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ঢাকার বাইরের শহর গুলোতে প্রতিনিয়ত মেডিকেলের বর্জ্য পরিবেশের জন্য, মানব স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে বিভিন্ন অসুখ-বিসুখে। বিভিন্ন গবেষনা গারের সৃষ্ট বর্জ্য এবং প্যাথলজি পরীক্ষায় সৃষ্ট বর্জ্য উন্মুক্ত স্থানে ফেলার কারনে বায়ু দুষিত হচ্ছে। বর্তমানে ক্লিনিক্যাল ও গবেষনাগারের সৃষ্ট বর্জ্য শুধু পরিবেশই দূষন করছে না মানুষের জীবনহানির ও কারন হিসেবে কাজ করছে। তাই অনতিবিলম্বে এই ব্যাপারে কার্যকর কোন ব্যবস্থা না নেওয়া হলে আমাদের স্বাস্থ্য খাতে বিপর্যয়ের আশংকা দিনে দিনে বেড়ে চলবে।
বর্জ্য ব্যসবস্থানার ক্ষেত্রে যেসব বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন তা হলো বর্জ্য সংগ্রহ করে সঠিক ভাবে সরিয়ে ফেলা এবং বর্জ্য কে সম্পদে পরিনত করার জন্য উদ্দ্যেগ নেওয়া। প্রত্যেকটি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে বর্জ্য ধংসের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরবরাহের উদ্দ্যেগ নেওয়া দরকার জরুরী ভিত্তিতে। যে সব বর্জ্য রিসাইক্লিং করা সম্বব সেগুলো রিসাইক্লিং করা যাতে সেসব বর্জ্য পরিবেশ দূষন সৃষ্টি না করে। বোতল গ্লাস কাগজ প্লাস্টিকের সামগ্রি কাপড় চোপড় ইত্যাদি জিনিসকে আলাদা করে রিসাইক্লিং করে পুনরায় ব্যবহার উপযোগী করার জন্য বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে সঠিক ও কার্যকারী পদক্ষেপ নিতে হবে।
সঠিক ব্যবস্থাপনা সম্ভব হলে আমাদের দেশের জনগনের স্বাস্থ্যগত বিপর্যয়ের ঝুকি অনেকাংশে কমে যাবে এবং আমরা ভালো পরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম হবো পরিবেশ দূষন রোধের মাধ্যমে। উন্মুক্তস্থানে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে। স্বাস্থ্যসম্মত ভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করলে পরিবেশ দূষন রোধ করা যাবে। অল্প খরচে বায়ু দূষন রোধ করার মাধ্যমে বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা করলে বানিজ্যিকভাবে গ্যাস তৈরি করা সম্ভব হবে।

বর্জ্যকে সঠিকভাবে কাজে লাগালে পরিবেশ দূষন রোধের পাশাপাশি জৈব সার তৈরির প্রক্রিয়া নেয়া যেতে পারে ফলে আমাদের মাটির চরিত্র ও বদলে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হতো যা আমাদের মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করতো, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র উপাদান গুলো বাড়ত। দেশের রাজধানী শহর ছাড়াও অনান্য শহরে অর্থবহ উপায়ে বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থা[পনার মাধ্যমে পরিবেশ দূষন রোধ করা সম্ভব। এজন্য মানুষের সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষে সবার অংশগ্রহনে বিভিন্ন সভা সমিতি সেমিনারের মাধ্যমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে ঘিরে অভিজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহন করা প্রয়োজন। জনসাধারন কে উদ্ভুদ্ধকরনের লক্ষে সরকারি ভাবে উদ্দ্যেগ নিতে হবে। প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াই বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য নিয়িমিত অনুসন্ধানী রিপোর্ট থাকা আবশ্যক। সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার সাথে রাষ্ট্রের অনান্য কতৃপক্ষের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে পরিবেশ দুষন কমাতে প্রয়োজনীয় প্রদক্ষেপ গ্রহন করার জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে। সর্বোপরি, সম্মিলিত উদ্দ্যেগের মাধ্যমে সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিবেশ দূষন রোধ করতে সকলকে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালনের জন্য মানসিক ভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

সম্পাদকিয়

বদলে যাচ্ছে কৃষি, ঝুঁকিতে স্বাস্থ্য

There are many variations of passages of Lorem Ipsum available but the majority have suffered alteration in that some injected
Uncategorized সম্পাদকিয়

সম্পাদকের কথা

There are many variations of passages of Lorem Ipsum available but the majority have suffered alteration in that some injected