নিরাপদ খাদ্যঃ ভাবনা বনাম বাস্তবতা এবং করনীয়
—- কাজী ফারহান হায়দার
নিরাপদ খাদ্য বলতে স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাদ্যকে আমরা বুঝি। যে প্রক্রিয়ায় বৈজ্ঞানিকভাবে খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, বিপণন প্রস্তুত ও পরিবেশন করা হয় তাকে নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থা বলে, খাদ্য আমাদের একটি মৌলিক চাহিদা।
নিরাপদ খাদ্যের সংস্থান মানুষের বেঁচে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ, নিরাপদ খাদ্যের ব্যাপারে আমাদের সচেতন থাকতে হবে নিজেদের সুস্থতার স্বার্থে, কারণ আমাদের বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য গ্রহণ প্রয়োজনীয়, অনিরাপদ খাদ্যে আমাদের স্বাস্থ্যহানির কারণ হতে পারে।
বর্তমানে শস্য উৎপাদন, বাজারজাতকরণ, বিপণন প্রক্রিয়ায় রাসায়নিকের ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে যার ফলে আমাদের মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর উপাদান খাদ্যের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। শস্য উৎপাদনে কীটনাশক যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে, একই সাথে রাসায়নিক সারের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার শস্য উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি শস্যের গুণগতমানের ক্ষতি করছে। যে সকল রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে তার মধ্যে অনেকগুলো রসায়নিকে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর উপাদান আছে, এছাড়াও খাদ্যে বিভিন্ন প্রকার জীবানু থাকে যা মানব দেহে রোগ সৃষ্টি বা শারীরিক সমস্যা তৈরি করে।
নিরাপদ খাদ্য সুস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্য আমাদের সুস্বাস্থ্যের জন্য অতি প্রয়োজনীয়। ইদানিং আমাদের দেশে খাদ্যে বিষক্রিয়ায় অসুস্থ হওয়ার পরিমাণ দিন দিন বেড়ে চলছে, খাদ্যে বিষক্রিয়ার ফলে পেটের পীড়া সহ নানা অসুখ-বিসুখে মানুষ মৃত্যুর মুখে পর্যন্ত পতিত হচ্ছে।
অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণের কারণে বিভিন্ন ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে বিষক্রিয়া তৈরি হচ্ছে শরীরে যা থেকে ডায়রিয়া, জ্বর, বমি সহ নানান স্বাস্থ্যঝুকি তৈরি হচ্ছে। শস্য বাজারজাত করনের সময় অতিরিক্ত মুনাফার লোভে ব্যবসায়ীরা ফলমূল, শাকসবজি এসবে ফরমালিন ব্যবহার করে দীর্ঘ সময় সতেজ রাখার চেষ্টা করে। খাদ্য সতেজ থাকলেও ক্ষতিকারক রাসায়নিক দীর্ঘ মেয়াদে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
এছাড়াও ইদানিং ফ্রোজেন খাদ্যদ্রব্য বাজারজাতকরণ করা হচ্ছে যা মোটেও স্বাস্থ্যসম্মত নয়, সহজলভ্য ও মুনাফার জন্য তৈরি করা খাবার ফ্রিজে রেখে দীর্ঘদিন ধরে রাখা হচ্ছে, এসব ফ্রোজেন খাবারে মারাত্মক ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ রয়েছে যা মানুষ গ্রহণের ফলে স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। আমিষ জাতীয় খাদ্য আমাদের শরীরের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। আমিষ জাতীয় খাদ্য থেকে মানব শরীর প্রয়োজনীয় ক্যালোরির যোগান পেয়ে থাকে। উদ্ভিজু ও প্রাণিজ আমিষের উৎস যেমন মাছ, মাংস, ডিম, বাদাম, ডাল ইত্যাদি। এইসব জাতীয় শস্যে অতিমাত্রায় রাসায়নিক ব্যবহার করার ফলে আমিষের উৎস অনিরাপদ ও খাবারের অনুপোযোগী হয়ে পড়ছে। খাদ্য সংরক্ষণের জন্য যে রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে তা মানব দেহের জন্য ক্ষতিকারক হয়ে উঠেছে।
এছাড়াও শর্করা জাতীয় খাদ্যের প্রধান উৎস গুলোর মধ্যে আলু, ভাত, মুড়ি, চিড়া, নুডুলস, আটা-রুটি, লাল চাল অন্যতম। ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ক্যালরির যোগান এসব খাদ্য উপাদান থেকে হয়ে থাকে, অতিরিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে এসব খাদ্য উপাদানে রাসায়নিক উপাদান যুক্ত হচ্ছে যা মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক হয়ে উঠেছে। মানব শরীরে চর্বি জাতীয় খাবার থেকে (১৫ – ২০)% ক্যালরি যুক্ত হয়। কিন্তু আমাদের দেশে চর্বি জাতীয় খাবার তৈরিতে অতি মাত্রায় অনিয়মের ফলে চর্বি জাতীয় খাবারে স্বাস্থ্য ঝুকি তৈরি করেছে। বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের ফাস্ট ফুড যেমন বার্গার, পরটা, পেটিস, রোল, গ্রিল, মাংসের উপাদান তৈরি খাবারে নিয়ম বহির্ভূত ভাবে চর্বি ব্যবহৃত হচ্ছে।
বর্তমানে আমাদের দেশে রান্না করা খাবার ফ্রিজে রেখে দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশন করা হচ্ছে বিভিন্ন হোটেল এবং রেস্টুরেন্টে। বিশেষজ্ঞদের মতে রান্না করা খাবার একবারের বেশি গরম করা যায় না, একবারের বেশি গরম করে বা ফ্রিজে রেখে দিলে এতে ক্ষতিকারক ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এই জাতীয় খাদ্য গ্রহণের ফলে খাদ্যে বিষক্রিয়া হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাই আমাদের উচিত রান্না করা খাবার পুনঃপুন গরম করে পরিবেশন থেকে বিরত থাকা এবং ফ্রোজেন খাবার থেকে দূরে থাকা।অপরদিকে আমাদের দেশে রান্না করা নাস্তা যেমন সিঙ্গারা, চমুচা, রোল, পরোটা, চিকেন বার্গার, সবজি বার্গার সহ কিছু খাদ্যদ্রব্য প্যাকেটজাত করে ফ্রিজিং করে বিক্রি করা হচ্ছে। এসব ফ্রিজিং খাবারের সহজলভ্যতা এত বেশি হয়েছে যে আমরা অতিথি আপ্যায়নে, সামাজিক অনুষ্ঠানে এসব খাবারের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। এসব খাবার দীর্ঘ সময় ফ্রিজিং করে রাখার ফলে ক্ষতিকারক রাসায়নিক উপাদান, ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়ায় সংক্রমণ হচ্ছে যা গ্রহণের ফলে স্বাস্থ্যে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করছে। রান্না করা খাবারের বহুত প্রচলন আছে ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলোতে, বিশেষত আমেরিকার FDA যে প্রক্রিয়ায় খাবারের মান নিয়ন্ত্রণ ও অনুমোদন করে সেটার ছিটে ফোটাও আমাদের দেশে নাই।
দুগ্ধজাত খাবারের মধ্যে প্রচুর পুষ্টি উপাদান আছে যার মধ্যে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস অন্যতম। দুধ, দই, ছানা, ঘি প্রক্রিয়াজাত করার সময় অবশ্যই নিরাপদ পরিবেশে সংরক্ষণ করতে হবে যাতে কোন ধরনের বিষাক্ত ধাতু সংমিশ্রণে না আসে। এছাড়া গবাদি পশুর খাদ্য সংগ্রহের সময়ে এতে কোন বিষাক্ত ভারী ধাতুর উপস্থিতি আছে কিনা তা নিশ্চিত করতে হবে।
বর্তমান সময়ে আমাদের দেশে ফাস্টফুডের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে, দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে এসব রেস্টুরেন্ট এবং দোকান। বাহারি রঙের খাবার প্রস্তুত করে বিশেষত মাংসের কাবাব, গ্রিল, ফুচকা, বিভিন্ন ধরনের রোল, ভাজা স্টিক বিফ। এইসব খাবার তৈরিতে নিম্নমানের ঘি, কালারের জন্য কাপড়ের রং, ভোজ্য তেলের পরিবর্তে জ্বালানি তেলের উপকরণ ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বিভিন্ন সরকারি অভিযানে ধরা পড়ছে যা আমাদের মানব স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি তৈরি করছে প্রতিনিয়ত। এছাড়াও বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের পানীয় পাওয়া যাচ্ছে (যেইগুলো এনার্জি ড্রিংক্স নামে পরিচিত) যাতে মাত্রাতিরিক্ত অ্যালকোহলের উপস্থিতি আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের সস, জুস (যেমন আম,লিচু) বাজারে বিক্রি হচ্ছে যাতে খাদ্য উপাদানের চেয়ে ক্ষতিকারক রাসায়নিক এর উপাদান বেশি পাওয়া যাচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত দিচ্ছেন। ভয়ংকরভাবে আরো লক্ষ্য করা যাচ্ছে রাস্তার পাশে ও ফুটপাতে মাংসের টুকরো ভাজা করে, চিংড়ির মাথা, কাকড়া ভাজা বিক্রি করা হচ্ছে, যাতে নিম্ন মানের ঘি, মুবিল জাতীয় পদার্থ ব্যবহৃত হচ্ছে মচমচে করে সুস্বাদু করে পরিবেশনের জন্য,যা স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি স্বরূপ।
বর্তমানে আমাদের সামাজিক অনুষ্ঠান বিয়ে, আকীকা, ওয়ালিমা এসব অনুষ্ঠানে খাবার মুখরোচক করার জন্য বিভিন্ন ধরনের ঘি, গোলাপজল, টেস্টিং সল্ট, চিনি, বিভিন্ন ধরনের সস, ভিনেগার, অপ্রোয়জনীয় ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে যা খাদ্যের স্বাভাবিক খাদ্য গুন নষ্ট করছে এবং পাশাপাশি মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান সংযুক্ত হচ্ছে যা খাদ্যকে অনিরাপদ করে তুলছে।
এছাড়াও বর্তমানে বিভিন্ন লোকেশনে বিরানি হাউস, ওরশ বিরিয়ানির নামে ক্ষতিকর রাসায়নিক এবং কাপড়ের রঙ ব্যবহার করে মুখরোচক খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে বলে প্রতীয়মাণ হচ্ছে যা মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
দেশের বাহিরের থেকে যেসব ফল আমদানি করা হচ্ছে যেমন- কমলা, মাল্টা, আপেল, ইত্যাদি সেসব ফলে ক্ষতিকর ফরমালিন সহ বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে। ফল পচন রোধে রাসায়নিক ব্যবহার করার ফলে খাদ্য নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। নিরাপদ খাদ্যের উৎসের জন্য এসব বিষয়ে নজরদারি করা খুবই জরুরী হয়ে পড়েছে।
শিশু খাদ্য যেমন চিপস, নুডুলস ইত্যাদি খাবারে নিম্ন মানের ঘি ব্যবহার হচ্ছে বলে বিভিন্ন সরকারি তদারকিতে উঠে এসেছে। শিশুদের আকর্ষণ করার জন্য চকলেট, আচার, ময়দা দিয়ে বানানো বিভিন্ন ধরনের চিপস জাতীয় খাবার ও তরল জাতীয় খাবার যেমন জুস, তরল দুধ এসবে ভেজাল মিশ্রিত করা হচ্ছে বলে ভোক্তা অধিকারসহ বিভিন্ন সংস্থার অভিযানে তথ্য উঠে এসেছে যা আমাদের শিশু স্বাস্থ্যের ও বিকাশের জন্য ক্ষতিকারক।
ভিটামিন ও খনিজ আহরনের প্রধান উপাদান ফলমূল, শাকসবজিতে ফরমালিন ব্যবহারের ফলে ভিটামিন ও খনিজের উপাদান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং আমাদের খাদ্য উপাদান গুলো অনিরাপদ হয়ে উঠেছে।
নিরাপদ খাদ্যের ব্যবস্থার জন্য সরকারের নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ পাঁচটি বিষয় নির্ধারণ করেছেন।-
১) পরিচ্ছনতা বজায় রাখা
২) কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখা
৩) সঠিক তাপমাত্রায় নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত খাবার রান্না করা
৪) নিরাপদ তাপমাত্রায় সংরক্ষণ
৫) নিরাপদ পানি ও খাদ্য উপকরণ ব্যবহার
মানব স্বাস্থ্যের জন্য কিছু প্রয়োজনীয় ভারী ধাতু যেমন ম্যাগনেসিয়াম(Mg), ক্যালসিয়াম(Ca), আইরন (Fe), কপার (Cu), জিংক (Zn) এবং কোবাল্ট (Co)। এসব ধাতু থেকে প্রয়োজনীয় প্রোটিন আমরা পেয়ে থাকি। আয়রন (Fe) ব্যবহৃত হয় ML, HL, FD ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণে। জিংক(Zn) ব্যবহৃত হয় মানব শরীরের বিভিন্ন ধরনের এনজাইম নিয়ন্ত্রণে, এসব রাসায়নীক উপাদানের ঘাটতি মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর। এছাড়াও কিছু ভারী ধাতু মানব দেহের জন্য অপ্রয়োজনীয় হিসেবে বিবেচিত, যার অতিরিক্ত উপস্থিতি মানব দেহের জন্য ক্ষতিকারক যেমন লেড(Pb), ক্যাডমিয়াম (Cd), ক্রোমিয়াম (Cr), আর্সেনিক (As), নিকেল (Ni) এবং মারকারি (Hg)। এসব ধাতুর কোন প্রকার ভূমিকা নিয়ে মানব স্বাস্থ্যের জন্য এবং শরীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় এদের উপস্থিতি ক্ষতিকারক। সাধারণভাবে এসব ধাতুকে টক্সিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। জারিত অবস্থায় Fe2+ , Co2+, Cr6+, As3+, Ni0, Hg2+ ৷ মানব শরীরে বিষক্রিয়া তৈরি করতে পারে, এসব ধাতুর নিম্নমাত্রা মানব স্বাস্থ্যের প্রাথমিক ক্ষতি করে এবং অতিমাত্রায় উপস্থিতি শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হানির সম্ভাবনা থাকে।
পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার জন্য ভূগর্ভস্থ পানির উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে জলধারা তৈরি করে বৃষ্টির পানির ব্যবহার বাড়াতে হবে পাশাপাশি নদী নালা, খাল বিলের পানি সেচ কাজে ব্যবহারের পরিমাণ বাড়াতে হবে। পানি পানের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উপাদান আছে কিনা তা পরীক্ষা করতে হবে, বিশেষত পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি থাকলে ঐ পানি পান পরিহার করতে হবে। ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি আছে কিনা দেখার জন্য টিউবওয়েল গুলোর পানি নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে পাওয়া যায় এমন বিষাক্ত ধাতুর উপস্থিতি সম্পর্কে নিচের চার্টে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
বাংলাদেশে বিষাক্ত ধাতুর উৎস বিষাক্ত ধাতু উৎস ( বাংলাদেশ) লেড(pb) ব্যবহৃত ব্যাটারি, লেড যুক্ত রং, লেড যুক্ত গ্যাসোলিন এবং বিভিন্ন পরীক্ষাগারে ও কারখানেতে ব্যবহৃত লেড লবণ ধ্বংস করার পর।ক্যাডমিয়াম(Cd) রং, প্লাস্টিক সামগ্রী, Ni – Cd ব্যাটারি থেকে, ফসফেট সারকারখানা থেকে এবং বিভিন্ন গবেষণাগার থেকে।ক্রোমিয়াম(Cr) Cr সাধারণত যৌগ আকারে রং এ ব্যবহৃত হয় কাপড় ও চামড়া জাত পন্য তৈরীতে
আর্সেনিক(As) As প্রধানত পানিতে পাওয়া যায়
নিকেল(Ni) ইলেক্ট্রনিক সামগ্রী, কয়েন, ব্যাটারি, জুয়েলারি, স্টেইনলেস স্টীল এ Ni পাওয়া যায়।
বিষাক্ত ধাতু মানব শরীরের জন্য কতটুকু সহনীয় তা আমরা নিচের চার্টের মাধ্যমে বুঝার চেষ্টা করবো।
বিষাক্ত ধাতু সমূহ আমাদের খাদ্যে যদি যুক্ত থাকে তাহলে বিষাক্ত ধাতুসমূহ মানব শরীরের বিভিন্ন অঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
লেড (Pb) – কিডনি, নার্ভাস সিস্টেম,হাড়।
ক্যাডমিয়াম (Cd)- লিভার, পাকস্থলী।
আর্সেনিক (As) – চামড়া, নখ, চুল।
নিকেল ( Ni) – ফুসফুস, চামড়া ।
লেড(Pb): লেড মানব শরীরের হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কমিয়ে দেয় ।মারাত্মক লেডের বিষক্রিয়ায় কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ক্যাডমিয়াম(Cd) : ক্যাডমিয়ামের(Cd) উপস্থিতি মানব শরীরের শ্বাস গ্রহণ প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এছাড়াও ক্যাডমিয়ামের বিষক্রিয়ার কারণে ফুসফুসের ক্যান্সার, কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং হৃদ রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
ক্রোমিয়াম(Cr)- ক্রোমিয়াম(Cr) (Vi) যৌগ হজমে বাধা দিতে পারে এবং মারাত্মক রকম পাকস্থলীর ব্যাথা, ডায়রিয়া হতে পারে। চূড়ান্তভাবে লিভার কেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। আর্সেনিক (As): আর্সেনিক (As) ( III) যৌগ চামড়া, চুল ,নখের ক্ষতি করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি চামড়ার ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে ।
নিকেল (Ni) : নিকেলের উপস্থিতি চামড়ার ফুসকুড়ি, লালচে দাগ এবং অ্যাজমার সৃষ্টি করতে পারে ।
ক্ষতিকারক বিষাক্ত ধাতু যাতে আমাদের খাদ্য উপাদানের সংযুক্ত হতে না পারে সেজন্য বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নিয়মিত কিছু কার্যক্রম চলমান রয়েছে যা প্রয়োজনীয় তুলনায় অপ্রতুল এ বিষয়ে আমাদের করণীয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা যাক।
১) শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে সব শিল্প কারখানায় নিজস্ব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা রাখতে হবে এবং তদারকি করে নিশ্চিত করতে হবে
২) পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অধীনে অধিদপ্তর সমূহের তদারকি জোরদার করতে হবে যাতে কোন প্রকার বিষাক্ত ধাতু চাষাবাদের জমিতে এবং মানুষের ব্যবহার পানিতে না যায় ।
৩) নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম জোরদার করতে হবে; ভোক্তা অধিকারের কিছু অভিযান চলমান থাকলেও এটার অগ্রগতি হবে যদি উৎসে সেটি বন্ধ করা যায় । BSTI যেসব পণ্যের ছাড়পত্র দেয় সে সব পণ্যের তালিকা জনসম্মুখে প্রকাশ করা এবং BSTI কর্তৃপক্ষকে পণ্যের গুণগত মান পরিমাপক ফলাফল জনসম্মুখে প্রকাশ করা
৪) দেশের সকল স্বাস্থ্য কেন্দ্রে মেডিকেলে বর্জ্যের যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা । বর্তমানে পৃথিবীতে আধুনিক মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্লান্ট দিয়ে বর্জ্য পরিশোধন করা হচ্ছে যা বাংলাদেশও সুগঠিত ভাবে চালু করা
৫) কৃষিজাত পণ্য উৎপাদনে সার ও কীটনাশক এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি নিশ্চিত করা।
৬) প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় নিরাপদ খাদ্য বিষয়ক প্রচার প্রচারণা জোরদার করতে হবে।
৭) এছাড়াও আমাদের হাঁটাচলা সময় রাস্তাঘাটে যাতে গাড়ির কালো ধোয়া এবং বিষাক্ত সীসার ধোঁয়া যাতে নিবারণ করা যায় সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া। বাতাস লেডের উপস্থিতি সহনীয় মাত্রায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া । পাশাপাশি রাস্তা চলাচলের সময় মাস্ক ব্যবহার করা।
৮) ধূমপান নিষিদ্ধ করা, ধূমপান নিষিদ্ধ করলে স্বাস্থ্য খাতে ঝুঁকি অনেক কমে যাবে এবং মুখের ক্যান্সার, ফুসফুসের ক্যান্সার থেকে মানুষ রেহাই পাবে। চিকিৎসা ব্যায় অনেকাংশে কমে যাবে।
৯) গভীর নলকূপের পানিতে যদি আর্সেনিকের উপস্থিত থাকে সে পানি ব্যবহার না করে বিকল্প উৎসের সন্ধান করে পানি ব্যবহার করা।
সর্বোপরি দেশের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা তদারকির জন্য কমিটি গঠন করা এবং নিয়মিত বিরতিতে খাদ্যের মান ব্যবস্থাপনা ও ক্ষতিকারক উপাদান সম্পর্কে জনসম্মুখে অবহিত করা।





