জাতীয় রাজনীতি রাজনীতি

বাগেরহাট -২ আসনে বিএনপির শোচনীয় পরাজয়ের কারণ

উজ্জ্বল কুমার দাস, বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি।। 

দলের ভেতরে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থী।

​স্বপক্ষে যুক্তিঃ বাগেরহাট-২ আসনে বিএনপির দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী নেতা এবং সাবেক সংসদ সদস্য এম এ এইচ সেলিম (সিলভার সেলিম) দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন। এটি ব্যারিস্টার জাকিরের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। সেলিমের নিজস্ব একটি শক্তিশালী কর্মী বাহিনী ও ভোটব্যাংক থাকায় বিএনপির তৃণমূলের ভোট দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ধানের শীষের ফলাফলে।
জামায়াতে ইসলামীর সাথে ভোটের ভাগাভাগি।
​স্বপক্ষে যুক্তিঃ বিএনপি ও জামায়াতের ভোটারদের একাংশ একই ঘরানার হওয়ায় এবং জামায়াতের নিজস্ব একটি সুসংগঠিত ভোটব্যাংক থাকায়, ব্যারিস্টার জাকিরের সম্ভাব্য ভোট সেখানেও ভাগ হয়ে যায়। এটি একটি ত্রিমুখী লড়াইয়ের পরিবেশ তৈরি করেছিল যা শেষ পর্যন্ত তার পরাজয় ত্বরান্বিত করে।
সাংগঠনিক সমন্বয়ের অভাব
​স্বপক্ষে যুক্তিঃ ব্যারিস্টার জাকির হোসেন কেন্দ্রীয়ভাবে শক্তিশালী এবং পেশাজীবী হিসেবে সুপরিচিত হলেও, তৃণমূল পর্যায়ের অনেক নেতার সাথে তার সমন্বয়হীনতা লক্ষ্য করা গেছে। দীর্ঘ সময় এলাকার রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা নেতাদের উপেক্ষা করা হয়েছে এমন একটি ধারণা কর্মীদের একাংশের মধ্যে কাজ করেছে, ফলে নির্বাচনের দিন ভোটারদের কেন্দ্রে আনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উদ্দীপনার অভাব ছিল।
প্রতিপক্ষের শক্তিশালী অবস্থান ও প্রচারণা
​স্বপক্ষে যুক্তিঃ প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শিবিরের (বিশেষ করে যারা বিজয়ী হয়েছেন) সুসংগঠিত নির্বাচনী প্রচারণা এবং কেন্দ্রভিত্তিক শক্তিশালী অবস্থান ব্যারিস্টার জাকিরের জয়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সরকারি দলের প্রার্থীর উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রচারণা এবং শক্ত সাংগঠনিক ভিত্তি মোকাবিলা করার মতো পর্যাপ্ত রসদ ও কৌশলগত প্রস্তুতি জাকিরের শিবিরের কিছুটা কম ছিল বলে ধারণা করা হয়।
​★ নতুন ও তরুণ ভোটারদের আকর্ষণ করতে না পারা
​স্বপক্ষে যুক্তিঃ ব্যারিস্টার জাকির আধুনিক ও মাদকমুক্ত বাগেরহাটের যে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, তা অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ ভোটারদের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে। তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশকে নিজের পক্ষে টানার জন্য যে ধরনের ডিজিটাল বা গ্রাউন্ড-লেভেল ক্যাম্পেইন প্রয়োজন ছিল, তার অভাব ছিল।
লের ত্যাগী কর্মীদের প্রাধান্য না দেওয়া।

স্বপক্ষে যুক্তিঃ এতে করে নির্বাচনে দলের প্রতি সুবিধাবাদী নেতাদের দল, দলীয় প্রার্থী ও কর্মীর প্রতি কোনো দুর্বলতার জায়গা ছিল না। ফলে টাকা ছাড়া কেউ মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে আগ্রহী ছিল না। বরং নিজেদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে দ্বন্দ্ব হচ্ছিল। ত্যাগীরা ছিল একপেসে কোণঠাসা।
কমিটি গঠনে সঠিক নেতৃত্ব বাছাই করায় ব্যর্থতা।
স্বপক্ষে যুক্তিঃ জুলাই বিপ্লব সংগঠিত হওয়ার পরবর্তী সময়ে দলে যাদের পদ পজিশনে আনা হয়েছিল তাদের বড় অংশ ছিল বিএনপির নিষ্ক্রিয় কর্মী ও আওয়ামীলীগের সাথে লিওজ রাখা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। ফলে দলের প্রতি তাদের কোন দায়বদ্ধতা ছিল না। কোন কোন ইউনিটে আত্মীয় করনও ছিল প্রবল। গুটি কয়েক নিবেদিত যে কর্মী ছিল ছিল তারা ছিল কর্মী শূন্য অর্থনৈতিক ভাবে ভঙ্গুর।
জেলা-উপজেলা বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় শিক্ষিত,মেধাবী ও বুদ্ধিদীপ্ত ব্যক্তির অভাব।
স্বপক্ষে যুক্তিঃ একটি বৃহৎ দল পরিচালনার জন্য জেলা-উপজেলা বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় শিক্ষিত,মেধাবী ও বুদ্ধিদীপ্ত ব্যক্তির অভাব ছিল প্রকট। যে কারণে সাধারণ ভোটারদের আকর্ষণের জায়গা কম ছিল। দলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ঘিরে নেতারা একটি সিন্ডিকেট বলয় তৈরি করে ভুল অসত্য তথ্য পরিবেশন করে তাদের সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে দেওয়া হয়নি।
নির্বাচনে টাকার ছড়াছড়ি হয়েছে কিন্তু সুষম বন্টন হয়নি
স্বপক্ষে যুক্তিঃ যারা মাঠ পর্যায়ে পরিশ্রম করেছে তাদের প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সাপোর্ট দেওয়া হয়নি কিন্তু নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা ইচ্ছে মত উলুবনে মুক্তা ছড়িয়েছে। খাওয়া দাওয়া আর শোডাউন খরচ নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন কিন্তু মানুষের বাড়ি বাড়ি একের অধিকবার ভোট প্রার্থনা করেননি। এমনকি এলাকা পর্যায়ে গিয়ে মানুষকে ১ কাপ চাও ও খাওয়াননি। শুধু নিজেরা নিজেদের মধ্যে খরচ করেছেন।
সাংগঠনিক সমন্বয়হীনতা
​স্বপক্ষে যুক্তিঃ বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা নেতারা নির্বাচনের সময় তৃণমূল কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করতে পারেননি। নির্বাচনী প্রচারণায় অনেক সক্রিয় কর্মীকে নিষ্ক্রিয় থাকতে দেখা গেছে। মূলত মনোনয়ন নিয়ে অসন্তোষ এবং দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসনে তার নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতা পরাজয়ের পথ প্রশস্ত করেছে। অনেকে আবার বিএনপির সাথে থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছে।
উন্নয়ন কাজ ও সালিশ- বৈঠকের দিকে নেতাদের বেশি ঝুঁকে পরা।
স্বপক্ষে যুক্তিঃ সাধারণ মানুষের সাথে ভালো সম্পর্ক না রেখে বিভিন্ন বিতর্কিত ঘটনার সালিশ বৈঠকে জরিয়ে নেতারা ইমেজ সংকটে পরে এবং বিভিন্ন উন্নয়ন কাজে নেতাদের নগ্ন হস্তক্ষেপের কারণে দলের ভিতরের আর একটা গ্রুপ এই কর্মকান্ডের সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের দলের সাথে ট্যাগ লাগিয়ে বিএনপিকে কলঙ্কিত করে এবং কর্মীদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। তারপরেও যারা দলীয় পরিচয়ে অর্থ উপার্জন করেছে সেই অর্থের কোন অংশ নির্বাচনে জয়ের পিছনে খরচ করেননি।
আওয়ামী লীগের বিতর্কিত নেতাদের পুনঃবাসন করা।
স্বপক্ষে যুক্তিঃ আওয়ামী লীগের সাধারণ ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা না করে ১৭ বছর বিতর্কিত কাজের সাথে যুক্ত থাকা নেতাদের মাঠে উঠিয়ে সাধারণ কর্মীদের মন ভেঙে দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা কাজের গতি কমিয়ে দেওয়া হয়। অন্যদিকে সাধারণ নিরিহ আওয়ামী লীগ হয়রানির শিকার হয়। ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগের সিংহভাগ ভোট সতন্ত্র ও জামায়েত এর দিকে চলে যায়।
এছাড়াও বেশ কিছু ছোট ছোট বিষয় পরাজয়ের পিছনের অন্যতম কারণ ছিল। এর থেকে উত্তরণের জন্য পরবর্তীতেও এমন ঘটনা সৃষ্টি হতে পারে মাথায় রেখে ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনের দিকে এগোনো জরুরি। অন্যথায় জামায়াত এর কাছ থেকে আসন পুনরুদ্ধার করা কঠিন হবে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

রাজনীতি

সংস্কার করতে সময় যত বেশি যাবে, সমস্যা তত বেশি হবে: মির্জা ফখরুল

একটি সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে যেসব সংস্কার করা প্রয়োজন, তা দ্রুত করার তাগিদ দিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর
রাজনীতি

বানারীপাড়া পৌরসভায় নয়ন বেগমকে সভাপতি ও মাধবীকে সম্পাদক করে পৌর মহিলা দলের কমিটি গঠন

  • নভেম্বর ১৬, ২০২৪
বানারীপাড়া প্রতিনিধ। বরিশালের বানারীপাড়া পৌরসভায় নয়ন বেগমকে সভাপতি ও মাধবী খানমকে সাধারণ সম্পাদক করে পৌর মহিলা দলের কমিটি গঠন করা