আজ ১ লা ফেব্রুয়ারী রৌমারীর গর্ব অধ্যাপক ইমান আলীর জন্মশতবার্ষিকী

জহুরুল ইসলাম রৌমারী প্রতিনিধি:
আপনারা হয়তো অনেকেই জানেন আবার হয়তো অনেকেই জানেন না, আজ আমরা এমন একজন ব্যক্তি সম্পর্কে আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই বা পরিচয় করে দিতে চাই, তিনি আমাদের রৌমারীর মাটিতে জন্ম নেয়া, রৌমারীর রত্ন,রৌমারীর গর্ব শুধু রৌমারীর গর্ব নন তিনি গোটা বাংলাদেশের গর্ব। তিনি হলেন বুয়েটের গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক গণিতবিদ ও শিক্ষাবিদ মরহুম ইমান আলী। আজ ১ লা ফেব্রুয়ারী ২০২৬ অধ্যাপক ইমান আলীর জন্মশতবার্ষিকী। অধ্যাপক ইমান আলী ১৯২৬ সালের ১ লা ফেব্রুয়ারী পূর্ব পাখীউড়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ছিলেন মহর উদ্দিন মুন্সী। মহর উদ্দিন মুন্সীর ৬ সন্তানের মধ্যে ইমান আলী বড় সন্তান ছিলেন।

ইমান আলীর যে সময় জন্ম তখন এ দেশ ব্রিটিশদের অধীনে ছিলো তখন রৌমারীর জনপদ সীমান্তবর্তী ও নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন হওয়ায় এ এলাকা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত ও পিছিয়ে ছিলো। ইমান আলী ছোট বেলা থেকে পড়াশোনার প্রতি অনুরাগী ছিলেন ফলে ১০ বছর বয়সে পড়াশোনার উদ্দেশ্যে আসামের সুখচর ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হন, ৬ষ্ঠ শ্রেণীতেই তার অসাধারণ মেধা শক্তির পরিচয় দিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেন, পরে ধুবড়ী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৪৪ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন ( যা কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ছিলো,এখানেও তিনি সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্ত ছাত্র)। পরে ১৯৪৫ সালে গৌহাটি কলেজে ভর্তি হন কিন্তু সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ার পরেও তাকে বৃত্তি প্রদান না করে ২ য় হওয়া প্রাপ্ত ছাত্রকে কলেজ বৃত্তি প্রদান করেন আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় তিনি দেশে ফিরে এসে করোটিয়া সাদত কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হতে চান কিন্তু বিজ্ঞান বিভাগ চালু না থাকায় তিনি গণিত বিষয়ে ভর্তি হন, ১৯৪৭ সালে এ কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন ( এ কলেজটিও কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ছিলো). ঢাকা বোর্ডের মধ্যে ও পূর্ব বাংলার ছাত্রদের মধ্যে তিনি সর্বোচ্চ শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনকারী ছাত্র। পরে তিনি ১৯৪৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিষয়ে অনার্সে ভর্তি হন, ১৯৫০ সালের অনুষ্ঠিত অনার্স পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পান ইতোপূর্বে কেউ এতো নম্বর পাননি যার জন্য তিনি নীলকান্ত সরকার স্বর্ণপদক পুরস্কার পান। ১৯৫২ সালে ফলিত গণিতে এমএ পাশ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

১৯৫৩ সালে জগন্নাথ কলেজে লেকচারার পদে নিয়োগ পান এর আগে সবাই ছিলেন অন্য কলেজ থেকে ধারকৃত তিনিই প্রথম নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক। পরে ১৯৬২ সালের ২১ শে নভেম্বর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পান, এখানেও তিনি ঢাকার বাসিন্দা হিসেবে প্রথম নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক। ইমান আলী ১৯৬৬ সালে গবেষণার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতে গিয়ে ছিলেন কিন্তু ডায়াবেটিস ও শ্বেত রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে গবেষণা সমাপ্তি না করেই দেশে ফিরে আসেন। ১৯৮৬ সালে বুয়েট থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
তিনি তার প্রিয় শিক্ষার্থীদের জন্য কয়েক খানা বই লিখেছেন যা দেশ ও দেশের বাহিরে সমাদৃত। বইগুলোর নাম 1.Plane Trigonometry 2.) Intermediate Geometry. 3.Commercial Mathmetics. 4.)Matrics & Liner Transformation. 5).Tensor Analysis
উল্লেখ্য বিষয় এই যে, ইমান আলী ব্যক্তি জীবনে নিঃসন্তান ছিলেন বর্তমানে তার কোনো ওয়ারিশ নেই। ইমান আলীর গণিত বইয়ের জ্যামিতি ও ত্রিকোণমিতির অঙ্কনগুলো নিজ হাতে একেছেন মিসেস রহিমা ইমান। ইমান আলী তার সমস্ত বই মিসেস ইমানের নামে উৎসর্গ করে দিয়ে গিয়েছেন।
১৯৯৬ সালের ৯ ই সেপ্টেম্বর তার ঢাকার নিজ বাসগৃহ সাইন্স কর্ণার বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। পরে ইমান আলীর মরদেহ ঢাকা থেকে এনে তার গ্রামের বাড়ি পূর্ব পাখীউড়া বাবা মায়ের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত রয়েছেন।

পরিতাপের বিষয় এই যে, আমরা রৌমারী উপজেলাবাসী আমাদের এলাকার কৃতি সন্তান ও রত্নদের জীবন ও তাদের সংগ্রাম সম্পর্কে কিছুই জানে না ও কৃতিদের মূল্যায়ন করতে পারি না তাইতো দিনটি নিঃশব্দে কোনো কর্মসূচি ছাড়াই কেটে যাচ্ছে।





