পারমানবিক বিদ্যুৎ ও তেজস্ক্রিয়তা
কাজী ফারহান হায়দার
পারমাণবিক বিদ্যুৎ হলো- পরমাণুর কেন্দ্র বা নিউক্লিয়াস থেকে নির্গত শক্তিকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎ। নিউক্লিয় ফিশন প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ তাপ তৈরি করে যা দিয়ে টারবাইন পরিচালনা করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র মূলত একটি তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র যেখানে তাপের উৎস পারমাণবিক চুল্লি। তাপ ব্যবহার করে বাষ্প তৈরি করা হয় যা দিয়ে স্টিম টারবাইন চালনা করা হয় এবং জেনারেটরের সাথে সংযুক্ত করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। বিশ্বের 31 টি দেশে 416 টি পারমাণবিক বিদ্যুৎ চুল্লি চালু অবস্থায় এবং বিভিন্ন দেশে 50 টির অধিক নির্মাণাধীন রয়েছে।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করার জন্য যেহেতু নিউক্লিয় ফিশন প্রক্রিয়ায় তাপ উৎপাদিত হয় তাই এই বিষয়টি আমাদের জানা দরকার। নিউক্লিয় ফিশন বলতে “কোন নিউক্লিয়াসের দুটি সমান অংশে বিভক্ত হওয়াকে বুঝায় যা নিউক্লিয় বিভাজন বা ফিশন বলা হয়, এটি আবার দুই ধরনের –
১) স্বতঃস্ফূর্ত বিভাজন
২) আবিষ্ট বিভাজন
যখন কোন নিউক্লিয়াস স্বতঃস্ফূর্তভাবে দুটি প্রায় সমান অংশ বিভক্ত হয় তখন তাকে স্বতঃস্ফূর্ত বিভাজন বলে, এটি এক ধরনের তেজস্ক্রিয়তা। অপরদিকে যখন কোন কনা দ্বারা আঘাত করে নিউক্লিয়াসকে দ্বিখণ্ডিত করা হয় তাকে আবিষ্ট বিভাজন বলে যাকে নিউক্লিয় বিক্রিয়া বলা হয়।
নিউক্লিয় ফিশন প্রক্রিয়া নিয়ে বিজ্ঞানী নীলস বোর 1939 সালে তার তরল ফোঁটা মডেলের উপর ভিত্তি করে নিউক্লিয় ফিশন প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যা করেন। বিজ্ঞানী নীলস বোর তরল পদার্থের পৃষ্ঠটানের সাথে নিউক্লিয় শক্তির মিল খুজে পেয়েছিলেন। তরল পদার্থের পৃষ্ঠটানের ফলে একটি তরল ফোঁটা গোলাকার আকৃতি ধারণ করে। গোলাকার পৃষ্ঠতলের পরিমাণ কম হয়। বিভিন্ন আকারের তরল ফোঁটার সর্বোচ্চ পৃষ্ঠটানের পরিমাণ ফোঁটার পৃষ্ঠতলের সমানুপাতিক। অনুরুপভাবে নিউক্লিয়াস গোলাকার ধারণ করে এবং সর্বমোট নিউক্লিয় আকর্ষণ শক্তি। নিউক্লিয় অস্থিতিশীলতার জন্য প্রধানত স্থির তড়িৎ বিকর্ষণ শক্তি দায়ী। নিউক্লিয়াসের অবস্থিত প্রতিটি প্রোটন অপর প্রোটনকে কে বিকর্ষণ করে। নিউক্লিয়াসের অবস্থিত পরস্পর সংলগ্ন নিউক্লিয়াস সমূহের মধ্যে কার্যকর নিউক্লিয় আকর্ষণ শক্তি নিউক্লিয়াসের সুস্থিতির প্রধান উৎস। নিউক্লিয়াসের উপরিভাগে অবস্থিত নিউক্লিয়ন অন্য নিউক্লিয়ন দ্বারা চারিদিকে পরিবেষ্টিত থাকে না যার ফলে নিউক্লিয়াসের অভ্যন্তরে অবস্থিত অন্য নিউক্লিয়নের তুলনায় কম আকর্ষণ করে। পৃষ্ঠটানের কারণে তরল পদার্থের ফোঁটা গোলাকার হয় যদি এই ফোঁটায় অতিরিক্ত শক্তি সরবরাহ করা হয় তবে তা ফোঁটার অভ্যন্তরস্থিত অনুসমূহের গতিবেগ বাড়িয়ে দিবে ফলে ফোঁটাটি গোলাকার ও অন্যান্য আকৃতির মধ্যে তার আকৃতি বার বার বদলাবে। ফোঁটার আকৃতি বদল হলে তা পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসা প্রায় অসম্ভব, সাধারণত এই অবস্থায় ফোঁটাটি দুটি ফোঁটায় পরিণত হয়, নিউক্লিয়াসের কার্যকর দুই বিপরীতধর্মী শক্তির কারণে নিউক্লিয়াসের আকৃতি ও এভাবে পরিবর্তিত হয়। নিউক্লিয়াসের অস্থিতি অনুপাত বৃদ্ধির সাথে সাথে এই ধরনের পরিবর্তন বৃদ্ধি পায় এবং নিউক্লিয় ফিশন ঘটে। নিউক্লিয় ফিশন বা বিভাজন প্রক্রিয়ার একটি বিশেষ দিক হচ্ছে এতে প্রচুর শক্তি উৎপন্ন হয়। ফিশন প্রক্রিয়ায় প্রচুর শক্তি নির্গত হয় যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে সক্ষম বলে বিপুল পরিমাণে শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করতে পারে। যেমন 1 গ্রাম 235U (ইউরেনিয়াম) এর ফিশন হতে নির্গত শক্তির পরিমাণ 8.2 × 1017 আর্গ যা 2.3 × 1014 কিলোয়াট ঘন্টা বা 0.96 × 103 কিলোয়াট দিনের আলোর শক্তির সমান অর্থাৎ 1 মেগাওয়াট শক্তি সম্পন্ন কোন বিদুৎ কেন্দ্রে দৈনিক 1 গ্রাম ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে সমপরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে সমপরিমাণ শক্তি উৎপাদনে 3 টনের বেশি কয়লা বা 600 গ্যালন জ্বালানি তেলের প্রয়োজন হবে। নিউক্লিয় ফিশন প্রক্রিয়ায় অনিয়ন্ত্রিত শক্তি একত্রে বিস্ফোরণের জন্য ব্যবহার করা যায় যা পারমানবিক বোমায় ব্যবহৃত হয়, নিয়ন্ত্রিত বিভাজনের বা ফিশনের মাধ্যমে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালিত হয়। নিয়ন্ত্রিত নিউক্লিয় ফিশন প্রক্রিয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পারমাণবিক চুল্লি তৈরি করার প্রয়োজন পড়ে। আমাদের জানতে হবে পারমাণবিক চুল্লি কি এবং এটি কিভাবে কাজ করে।
যে যান্ত্রিক ব্যবহারের মাধ্যমে সুনিয়ন্ত্রিতভাবে নিউক্লিয় বিক্রিয়া চালানো যায় এটিকে পারমাণবিক চুল্লি বা নিউক্লিয় চুল্লি বলে, পারমাণবিক চুল্লির মূল উদ্দেশ্য হল শক্তির উৎপাদন। পারমাণবিক চুল্লির ভিত্তি হচ্ছে নিউক্লিয় বিভাজন বিক্রিয়া যাতে একটি বড় নিউক্লিয়াস একটি নিউট্রনের মাধ্যমে বিভাজিত হয়ে দুটি মাধ্যম নিউক্লিয়াস এবং কয়েকটি নিউট্রন তৈরির সাথে সাথে প্রচুর শক্তি নির্গত হয়। ধীর গতির নিউট্রন দ্বারা ইউয়েনিয়ামকে বিভাজিত করা হয়। প্রকৃতিতে ইউরেনিয়াম বেশী পাওয়া য়ায় বলে এটির ব্যবহার ও বহুল প্রচলিত। জ্বালানি হিসেবে ইউরেনিয়াম ব্যবহার করার জন্য চুল্লিতে ইউরেরিয়াম সমৃদ্ধকরণ করা হয়। যাতে ইউরেনিয়াম এর পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরনে কোন কোন ক্ষেত্রে জ্বালানিতে 2-5% ইউরেনিয়াম থাকে যা 10-20% এ উন্নীত করে, কোন কোন বিষেশ চুল্লিতে 90% পর্যন্ত সমৃদ্ধকরণ করে ব্যবহার করা হয়। প্রায় সব পারমানবিক চুল্লিতে জ্বালানি রূপে ইউরেনিয়াম ব্যবহার করা হয়। পারমানিক চুল্লিতে নিউক্লিয় ফিশনের সময় এবং ফিশন উৎপাদন থেকে প্রচুর পরিমানে নিউট্রন ও γ -রশ্মি নির্গত হয় যা মানব দেহ ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। এজন্য পারমানবিক চুল্লিতে প্রথম কয়েক ইঞ্চি ইস্পাত দ্বারা আবরিত করা হয় এর পর 10-15 ফুট পুরু উচ্চ ঘনত্ব বিশিষ্ট কংক্রিট দ্বারা সম্পূন্ন চুল্লি আবরিত করা হয়। কংক্রিটের কাজ হচ্ছে স্বাস্থ্যগত ক্ষতি রোধ করা অপর দিকে ইস্পাতের আবরন নিউট্রন γ-(গামা) রশ্মি থেকে উৎপন্ন তাপ হতে রক্ষা করা।
পারমানবিক চুল্লি ব্যবহার করে পারমানবিক শক্তির উৎপাদন খরচ অন্যান্য শক্তি হতে প্রাপ্ত শক্তির খরচের তুলনায় অনেক কম। পারমানবিক চুল্লিতে যে তেজস্ত্রিয় ফিশন উৎপাদন উৎপন্ন হয় তা পরিবেশ ও জন সাধারনের স্বাস্থ্যের জন্য খুবই মারাত্মক। ফিশন উৎপাদন ভালভাবে সংরক্ষন একটি ব্যয়বহুল এবং বিপজ্জনক প্রক্রিয়া। পারমানবিক চুল্লিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় যাতে কোনরূপ দূর্ঘটনা না ঘটে।
১৯৮৬ সালের ২৬ শে এপ্রিল রাশিয়ার চেরনোবিল এ চারটি চুল্লির একটিতে পর পর দুটি বিস্ফোরন ঘটে। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন যা বর্তমানে ইউক্রেন চেরনোবিল পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র- বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় ব্যাকআপ পাওয়ার কীভাবে কাজ করবে তা পরীক্ষা করতে গিয়ে ভুল পদক্ষেপে ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৪ নম্বার চুল্লিতে পর পর দুটি বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরনের ফলে চুল্লির মূল অংশ উম্মুক্ত হয়ে পড়ে এবং প্রচুর পরিমানে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ বায়ুমন্ডলে ছড়িয়ে পড়ে। দ্রুত বেলারুশ, রাশিয়া, পোলেন্ড, জার্মানিতে ছড়িয়ে পড়ে। বিস্ফোকরনের ফলে প্রাথমিক ভাবে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বিদ্যু কেন্দ্রের কর্মী, উদ্বারকর্মী মিলিয়ে ৩২জন নিহত হন। পরবর্তীকে লাখ লাখ মানুষ স্বাস্থ্য ঝুকিতে পড়ে যান। ২০১১ সালে একটি ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর সৃষ্ট 15 মিটার উচু সুনামি জাপানের ফুকুশিমা দাইচি অঞ্চলের তিনটি পারমানবিক চুল্লিয় বিদ্যুৎ সরবরাহ ও শীতলীকরন ব্যবস্থা অচল করে দেয়। যার ফলে ২০১১ সালের ১১ মার্চ একটি পারমানবিক দুর্ঘটনায় সূচনা হয়।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে দুর্ঘটনার হার তুলনামূলকভাবে কম হলেও এটির পরিণাম ভয়াবহ। একবার তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ছড়িয়ে পড়লে তা মাটি, পানি, বায়ুকে দীর্ঘ সময়ের জন্য বিষাক্ত করে তোলে। বাংলাদেশের বিদ্যুতের চাহিদা দিন দিন বেড়ে চলেছে। এ চাহিদার কথা মাথায় রেখে অনেক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ সমস্যা হয়তো একটা আপাত সমাধান দিতে পারবে। বাংলাদেশের অধিকাংশ বিদ্যুৎ কেন্দ্র তেল গ্যাসের মাধ্যমে তাপ উৎপাদন করা হয় যা পরবর্তীতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় ।
তেলভিত্তিক কেন্দ্র গুলোকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয় এতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়, গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে আমাদের নিজস্ব গ্যাস সম্পদ ব্যবহৃত হচ্ছে যা খুবই সীমিত পর্যায়ে যার মজুদ ও খুব বেশি নয়। তেল,গ্যাস, কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে প্রচুর কার্বন-ডাই-অক্সাইড (CO2) উৎপন্ন হয় যা প্রকৃতিকে দূষিত করে । অপরদিকে পারমাণবিক চুল্লিতে CO2 উৎপন্ন হয় না ।
পারমাণবিক চুল্লি পরিচালনা ব্যয়বহুল হলেও বিপুল পরিমাণে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হয়। তেল আমদানি করতে যে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয় তা দিয়ে অনায়াসে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন ও পরিচালনা সম্ভব। পারমাণবিক চুল্লির জ্বালানিও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করতে হয়। পারমাণবিক চুল্লিতে কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গত হয় না পরিবেশবান্ধব যেমন সত্য তেমনি এ ধরনের চুল্লিতে তীব্র রশ্মি বিকিরণকারি তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের সৃষ্টি হয়। যদি এসব উৎপাদ সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকে তবুও নিরাপত্তা সামান্য ত্রুটি মারাত্মক দুর্ঘটনা তৈরি করতে পারে। পারমাণবিক চুল্লির প্রধান সমস্যা হচ্ছে কোন অংশ বিকল হলে তা মেরামত বা তার অংশবিশেষ তৈরি করা সম্ভব হয় না, পারমাণবিক চুল্লির মেরামত জটিল প্রক্রিয়া। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে মূলত বিয়োজনশীল তেজস্ক্রিয় মৌল ইউরেনিয়াম ও থোরিয়ামের জ্বালানি দন্ড ব্যবহার করা হয়। প্রাকৃতিক ইউরেনিয়াম ( U-235) ও প্লুটোনিয়াম (238) কেবল স্বতঃস্ফূর্ত ফিশন দেখাতে পারে তাই পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহার উপযোগী অন্যান্য তেজস্ক্রিয় মৌল থোরিয়াম (232) ও প্লাটেনিয়াম (238) কৃত্রিম উপায়ে তেজস্ক্রিয় মৌলের আকরিক থেকে প্রক্রিয়াকরণ করা হয়। এজন্য নিউক্লিয়ার প্রক্রিয়াকরণ প্রযুক্তির প্রথম ধাপে তেজস্ক্রিয় মৌলকে খনি থেকে উত্তোলন করার পর ধৌত করে পরিশোধন করা হয় । পরবর্তী ধাপে গ্যাসীয় ব্যাপন বা অন্যান্য রাসায়নিক প্রক্রিয়ার সাহায্যে ইউরেনিয়াম ও থোরিয়ামের প্রয়োজনীয় উৎপাদন অন্যান্য তেজস্ক্রিয় মৌল থেকে পৃথক করা হয়। তেজস্ক্রিয় আকরিকের মাইনিং ও রিফাইনিং প্রক্রিয়ায় ব্যবহারিত পানি অধিক অর্ধায়ুযুক্ত এবং পানিতে দ্রাব্য তেজস্ক্রিয় মৌল কণা বা তরল আকারে উপস্থিত থাকে। এখান থেকে নির্গত পানি যদি নদী ,হৃদ, খাল ,বিল, সমুদ্রে পতিত হলে পানি তেজস্ক্রিয় পদার্থ দ্বারা দূষিত হয় ফলে তেজস্ক্রিয় পদার্থ নির্গত তেজস্ক্রিয় বিকিরণের প্রভাবে পানির সমগ্র বাস্তুতন্ত্র আক্রান্ত হয়। মাইনিং ও রিফাইনিং নির্গত পানিতে ইউরেনিয়াম ও থোরিয়াম এর অপত্য মৌল থোরিয়াম(230), রেডিয়াম (226), সিসা ( 210), ইত্যাদি উপস্থিত থাকে। তেজস্ক্রিয় পানির যেমন ক্ষতিকর তেমনি এতে বায়ুমণ্ডলও দূষিত হয় ।তেজস্ক্রিয় আকরিকের মাইনিং ,ওয়াশিং,রিফাইনিং ও সেপারেশন পর্যায়ে বহু তেজস্ক্রিয় গ্যাস যেমন রেডন,বোরন বায়ুমন্ডলে মিশে যা বিক্ষিপ্তভাবে বায়ুমন্ডলে ভেসে বেড়ায়।
পারমাণবিক চুল্লিতে রিয়েক্টরে জ্বালানি দন্ডের ইউরেনিয়াম নিউক্লিয়াসের সঙ্গে নিউট্রনের সংঘাত ঘটিয়ে প্রক্রিয়ার সূচনা করা হয়। ইউরোনিয়ামের নিউক্লিয়াস বিভাজিত হয়ে তেজস্ক্রিয় থোরিয়াম, ক্রিপ্টন নিউক্লিয়াস ও তিনটি নিউট্রন উৎপন্ন হয়। উদ্ভূত নিউট্রন পৃথক একটি ইউরেনিয়াম নিউক্লিয়াসের বিভাজনে সাহায্য করে ও চেইন বিক্রিয়ায় করে প্রথম নিউক্লিয় বিভাজনে সৃষ্ট পৃথক একটি নিউট্রন ইউরেনিয়াম নিউক্লিয়াসের দ্বারা শোষিত হয় ফলে ইউরেনিয়াম তেজস্ক্রিয়তা বৃদ্ধি পায় । তেজস্ক্রিয় ইউরেনিয়াম এর নিউক্লিয়াস বিটা-বিকিরনের মাধ্যমে নেপচুনিয়ামে পরিবর্তিত হয় । উৎপন্ন নেপচুনিয়াম পুনরায় তেজস্ক্রিয় বিটা রশ্মি বিকিরণ করে তেজস্ক্রিয় প্লুটোনিয়ামে রূপান্তরিত হয় । পারমাণবিক চুল্লির জ্বালানি রিএক্টরের জ্বালানী দন্ডে ইউরেনিয়ামের পরিমাণ কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উপজাত হিসেবে অধিক বিভাজনে সক্ষম প্লটেনিয়াম ও বেরিয়াম পাওয়া যায় । বেরিয়ামের অর্ধায়ু কম হওয়ায় বিটা বিকিরণের মাধ্যমে ল্যান্তেনিয়ামে পরিবর্তিত হয়। ল্যান্তেনিয়াম পুনরায় বিটা- বিকিরণের মাধ্যমে ফলে পৃথক মৌলের নিউক্লিয়াসে পরিবর্তিত হয়। জ্বালানি দন্ডের বেরিয়াম তেজস্ক্রিয় রশ্মি বিকিরণের ফলে বহু অন্তবর্তী তেজস্ক্রিয় মৌলের মাধ্যমে অবশেষে দীর্ঘ অর্ধায়ুযুক্ত পৃথক পৃথক তেজস্ক্রিয় মৌলে পরিণত হয়।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে যে জ্বালানি অবশেষ বা বর্জ্য পদার্থ নির্গত হয় তাতে প্লুটোনিয়াম, সিজিয়াম ও স্ট্রনসিয়ামের মত মারাত্মক তেজস্ক্রিয় পদার্থ উপস্থিত থাকে। এই তেজস্ক্রিয় মৌল গুলি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। তাই নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট থেকে নিঃসৃত বর্জ্য পদার্থের সংরক্ষণ ও অপসারণ প্রক্রিয়ায় সর্তকতা অবলম্বন করা অত্যাবশ্যক। তেজস্ক্রিয় স্ট্রনসিয়াম ও সিজিয়াম পরিবেশে সংক্রমিত হলে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় হওয়ার শঙ্কা থাকে। এসব মৌল অতি সহজে প্রাণী তথা মানব শরীরে প্রবেশ করে মানব শরীরে কোষে নিয়ে রাসায়নিকভাবে সমধর্মী মৌলকে প্রতিস্থাপন করতে পারে। এই কারণে শরীরে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। প্লুটোনিয়ামের অর্ধায়ু 24000 বছর। পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের জ্বালানি রডকে এমন ভাবে সংরক্ষণ করা উচিত যাতে প্লুটোনিয়াম নিঃসৃত আলফা রশ্মির বিকিরণ না হয় ।
বাংলাদেশে পরমাণু শক্তির যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৬১ সালে, যখন তৎকালীন পাকিস্তান সরকার পাবনার রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য স্থান নির্বাচন করে। পরে স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে Bangladesh Atomic Energy Commission (BAEC) প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পরমাণু গবেষণা, চিকিৎসা, কৃষি ও শিল্পে তেজস্ক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করে। ২০২৬ সালে প্রায় ৬৫ বছরের পথচলার পর বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের কাতারে স্থান করে নিয়েছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ৩০ নভেম্বর ২০১৭ সালে নির্মাণ কাজ শুরু হয় রাশিয়ার চুল্লি সরবরাহকরণ প্রতিষ্ঠান রোসাটম এস্টেট এনার্জি করপোরেশনের সহযোগিতায় রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চুল্লিতে পারমাণবিক জ্বালানি ইউরেনিয়াম এর ব্যবহার ২৮ এপ্রিল ২০২৩-এ শুরু হয়। ফুয়েল লোডিং একটি সংবেদনশীল প্রক্রিয়া যারা সম্পন্ন করতে 40-45 দিন সময় লাগে। চুল্লি পাত্রে ইউরেনিয়াম জ্বালানি বসানো হলে তা থেকে তাপ তৈরি হবে সে তাপে পানি থেকে বাষ্প তৈরি হয়ে টারবাইন ঘুরবে আর সেখান থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হবে। ২০২৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর আকাশ পথে রাশিয়া থেকে ঢাকায় পৌঁছায় পারমাণবিক জ্বালানির প্রথম চালান। রূপপুরের প্রথম ইউনিটে একসঙ্গে 163 টি বান্ডেল ব্যবহার করার কথা। ২০২৩ সালে 164 টি বান্ডেল দেশে আনা হয়। একবার জ্বালানি বসালে ১৮ মাস বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব।
এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য পাঁচ স্তরে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে যেগুলো হলো,
প্রথমতঃ ফুয়েল পেলেট যা অতি উচ্চ তাপমাত্রায় তার জ্বালানি বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে পারে। ফুয়েল পেলেট সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি হয় ফলে তেজস্ক্রিয় ফিশন প্রোডাক্ট সমূহ পেলেটের ভেতরে অবস্থান করে।
দ্বিতীয়তঃ ফুয়েল পেলেট গুলো জিরকোনিয়াম অ্যালয়ের তৈরি ফুয়েল কোডিং দ্বারা আবৃত থাকে। কোন কারনে সামান্য পরিমাণ ফিশন প্রোডাক্ট ফুয়েল পেলেট থেকে বের হলে তা এই ক্লাডিং এ ভেদ করতে পারবে না।
তৃতীয়তঃ রি-একটর প্রেসার ভেসেল বিশেষ মান নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত সতর্কতার সাথে প্রেসার ভেসেল তৈরি করা হয় যা উচ্চ তেজস্ক্রিয় অবস্থায় ও দীর্ঘস্থায়ী হয়।
চতুর্থতঃ রেইন কোর্স কংক্রিট দিয়ে 1.2 মিটার পুরুত্বের প্রথম কনসেইনমেন্ট ভবন তৈরি করা যা যে কোন পরিস্থিতিতে তেজস্ক্রিয়তা পরিবেশে দাঁড়িয়ে পড়া থেকে বিরত থাকে ।
পঞ্চমতঃ নিরাপত্তা ব্যবস্থা অধিকতর জোরদার করার জন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ ভূমিকম্প জলোচ্ছ্বাস বন্যা রক্ষার হিসেবে দ্বিতীয় কনসেইনমেন্ট ভবন নির্মাণ করা।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জ্বালানির জন্য ইউরেনিয়াম পেলেট আনা হয় রাশিয়া থেকে যা সরবরাহ করে রোসাটম এনার্জি কর্পোরেশন, আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার তত্ত্বাবধানে পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো পরিচালিত হয়। বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও এর ব্যতিক্রম নয়। বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের পরে জ্বালানি দন্ড তৈরি খুবই সতর্কতার সাথে করতে হয়। রাশিয়ার রোসাটমের সরবরাহকৃত পেলেট বাংলাদেশে বিমানে করে আনতে হয় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থায়। সবচেয়ে ঝুঁকির বিষয় হচ্ছে ইউরেনিয়াম পেলেট গুলো সড়কপথে রূপপুরে নেওয়া হয়।
বাংলাদেশের যেখানে দৈনন্দিন নিরাপত্তা সংকট বিদ্যমান সেখানে সড়কপথে ইউরেনিয়াম পেলেট নিয়ে যাওয়া অনেক ঝুঁকিপূর্ণ। যদিও নিরাপত্তা বাহিনীর সহযোগিতায় এই পেলেট গুলো রূপপুরে নেওয়া হয়। পারমাণবিক কেন্দ্রের নিরাপত্তা ও ফুয়েল পেলেট পরিবহন ও তেজস্ক্রিয়তা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ বিষয়ে করণীয় নিয়ে আলোচনা করা যাক—
১। রূপপুর পারমানবিক কেন্দ্রের বাহিরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের জন্য স্বশস্ত্রবাহিনী বিভাগের তত্ত্বাবাধনে বিশেষ নিরাপত্তা অঞ্চল গঠন করা। যেটি 50 বর্গমাইল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত করা দরকার।
২। পারমানবিক কেন্দ্রের ভিতরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা যাতে অনুমোদিত প্রশিক্ষিত ব্যক্তি ছাড়া কেউ কেন্দ্রে প্রবেশ করতে না পারে।
৩। পারমানবিক কেন্দ্রের চুল্লিতে ফুয়েল লোডিং এর নিরাপত্তা সময় দেশী-বিদেশী কর্মরত বিশেষজ্ঞদের বিশেষ সতর্কতা ব্যবস্থা পালন করা।
৪। রাশিয়ার তত্ত্বাবধানে যেহেতু পারমানবিক কেন্দ্রটি পরিচালিত হচ্ছে তাই রাশিয়ার সহযোগিতায় আমাদের দেশের বিজ্ঞানী ও কর্মকর্তাদের উন্নততর প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করা।
৫। আন্তর্জাতিক আনবিক শক্তি সংস্থার সাথে নিবিড় ভাবে যোগাযোগ রাখে যাতে কেন্দ্রের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, ফুয়েল লোডিং, তেজস্ক্রিয়তা বিষয়ে সংস্থাটির কোনরূপ অভিযোগ না থাকে। পাশাপাশি IAEA এর পরিদর্শন Team কে আমন্ত্রন জানানো শান্তিপূর্ন পারমানবিক চুল্লি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়াটি অবহিত করার জন্য।
৬। পারমানবিক জ্বালানি ইউরেনিয়াম পেলেট সড়ক পথে পরিবহন ঝুকিপূর্ন তাই রূপপুরের কাছাকাছি পদ্মা নদীর তীরে একটি সামরিক এয়ারপোর্ট অথবা বিমান ঘাটি নির্মান করা যাতে রাশিয়ার জ্বালানি বহন করা বিমান সরাসরি রূপপুরে পৌছানো যায়।
৭) পারমাণবিক কেন্দ্রের 50 বর্গমাইল এলাকার মধ্যে যাতে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়তে না পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। 50 বর্গমাইল এলাকার জলাশয়, নদী, খাল বিল, পুকুর তেজস্ক্রিয় পদার্থের উপস্থিতি আছে কিনা নিয়মিত পরীক্ষা করা। পাশাপাশি বায়ুমন্ডলে তেজস্ক্রিয় পদার্থের উপস্থিতি আছে কিনা তা নিয়মিত পরীক্ষা করা।
৮) পারমাণবিক কেন্দ্রের চুল্লির রক্ষণাবেক্ষণ কাজ সতর্কতার সহিত করা যাতে চুল্লিতে কোন ধরনের ত্রুটি দেখা দিলে দ্রুততার সাথে চুল্লির নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
৯) পারমাণবিক কেন্দ্রের বাহিরে সার্বক্ষণিক মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখা, ফায়ার সার্ভিস ইউনিট এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য বিশেষায়িত থানা প্রতিষ্ঠা করা।
১০) বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনারের তত্তাবধানে অথবা মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন করা যাতে প্রতি ঘন্টার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হয়। মনিটরিং সেল পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চুল্লির নিরাপত্তা, ফুয়েল লোডিং, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণ, ইউরেনিয়াম পরিবহন ও তেজস্ক্রিয়তা বিষয়গুলো গুরুত্ব সহকারে পর্যালোচনা করে দ্রুততার সাথে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।





